আলাউদ্দিন আরিফ
প্রকাশ : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৭:৫০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

অনেক কিছুই হারিয়ে পেয়েছেন বাংলাদেশ

অনেক কিছুই হারিয়ে পেয়েছেন বাংলাদেশ

রাজনীতির কণ্টকাকীর্ণ পথে হাঁটতে গিয়ে জীবনে অনেক কিছুই হারাতে হয়েছে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে। আততায়ীর হাতে বাবা জিয়াউর রহমান শহীদ হওয়ার পর হয়েছেন এতিম। পিতৃস্নেহ বঞ্চিত তারেকের জীবনে পথচলা কখনই মসৃণ ছিল না। রাজনৈতিক জিঘাংসার শিকার হয়ে বঞ্চিত হয়েছেন মায়ের স্নেহের পরশ থেকে। হারিয়েছেন একমাত্র ভাইকে। জীবনের বড় একটা সময় কাটিয়েছেন একরকম নির্বাসনে। এত কিছু হারিয়ে তিনি পেয়েছেন বাংলাদেশ। পেয়েছেন বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা। দেশের ১৮ কোটি মানুষ এখন তাকে স্বাগত জানাতে উদগ্রীব। সবার একটাই প্রত্যাশা, তিনি কখন দেশে ফিরবেন।

১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়া দম্পতির ঘরে জন্ম তারেক রহমানের। তার জন্মের পর থেকেই বাবা জিয়াউর রহমান ছিলেন দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তি আন্দোলনের অগ্রসৈনিক। জিয়াউর রহমান যখন ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, তখন তারেক রহমান মাত্র সাত বছরের শিশু। বাবা মুক্তিযোদ্ধা ও সেক্টর কমান্ডার হওয়ার কারণে শিশুকালেই বাবার সান্নিধ্য কমই পেয়েছেন তারেক রহমান। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সপরিবারে বন্দি করা হয় ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে। ৩ থেকে ৭ নভেম্বরের ভোর পর্যন্ত জিয়া পরিবার ও তারেক রহমানের জন্য ছিল ভয়ানক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি। ওই সময় যে কোনো পরিস্থিতিতে প্রাণহানি ঘটতে পারত জিয়া পরিবারের। শিশু বয়সেই তারেক রহমান উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন সেদিনের ভয়াবহতা। শিশুকাল থেকে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন রাজনীতির নানা চড়াই-উতরাই। দেখেছেন নানা পরিস্থিতি।

তারেক রহমানের জীবনে এক ভয়ানক দিন আসে ১৯৮১ সালের ৩০ মে। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে নির্মমভাবে শহীদ হন মহান স্বাধীনতার ঘোষক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তারেক রহমান তখন কিশোর। শেরেবাংলা নগরে অর্ধকোটি মানুষের সঙ্গে বাবার লাশের পাশে একজন তারেক রহমানকে দেখা গেছে শোকে স্তব্ধ অবস্থায়। ওইসময় দেশের অন্যতম বৃহত্তম জানাজা হয়েছিল স্বাধীনতার ঘোষক, একজন সফল রাষ্ট্রপতির। বাবার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার নেপথ্যে নেতৃত্বের যে সুদক্ষতা এবং দেশপ্রেম একাকার হয়েছিল ছেলে হিসেবে তারেক রহমানের। এসব পরিস্থিতি ধীরে ধীরে তাকে রাজনৈতিকভাবে করে তোলে দক্ষ।

বাবা জিয়াউর রহমান শহীদ হওয়ার পর দেশের এক ভয়াবহ ক্রান্তিকালে রাজনীতিতে নাম লেখান তারেক রহমানের মা গৃহবধূ খালেদা জিয়া। তিনি যেমন দেশকে সন্তানের মতো আগলে রাখেন, তেমনি পরিবারকেও আঁকড়ে রাখেন অকৃত্রিম ভালোবাসায়। খালেদা জিয়া রাজনীতিতে নেমে দফায় দফায় বিপদে পড়েছেন। খালেদা জিয়া, তারেক রহমানসহ পরিবারের সব সদস্যকে উচ্ছেদ করা হয়েছে স্বামী সন্তানের স্মৃতিবিজড়িত চার দশকের বসতভিটা থেকে। শুধু রাজনৈতিক কারণে তারেক ও খালেদা জিয়ার চার দশকের বাসস্থান ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের শহীদ মইনুল সড়কের বাড়িটিও ছাড়তে হয়েছে। অথচ ওই বাড়িটি ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে জিয়াউর রহমান পরিবার নিয়ে শহীদ মইনুল সড়কের ৬ নম্বর ওই বাড়িতে ওঠেন। পরে সেনাপ্রধান, উপসামরিক আইন প্রশাসক এবং রাষ্ট্রপতি হয়েও ওই বাড়িটিতেই সপরিবারে অবস্থান করেছিলেন জিয়াউর রহমান। ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি শহীদ হওয়ার পর একই বছরের ১২ জুন তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তার সেনানিবাসের ওই বাড়িটি তারেক রহমানের মা খালেদা জিয়ার নামে বরাদ্দ দেন। ইজারা দলিলের মাধ্যমে তাকে সরকারি ওই সম্পত্তি দেওয়া হয়। ওই বাড়িতে পরিবার নিয়ে বাস করছিলেন খালেদা জিয়া। তারেকের মা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও ক্যান্টনমেন্টের ওই বাড়িতেই থাকতেন তারা। কখনো গণভবনে যাননি।

২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী জরুরি অবস্থা জারির মাধ্যমে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় বসে ওই বছরের ৩ সেপ্টেম্বর ভোরে সেনানিবাসের বাড়ি থেকে খালেদা জিয়া, দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রায় দেড় বছর কারাভোগ করে জামিনে মুক্তি পান কোকো। ২০০৮ সালের ১৮ জুলাই নির্মম নির্যাতনে আহত কোকো চিকিৎসার জন্য সপরিবারে থাইল্যান্ড যান। চিকিৎসা শেষে মালয়েশিয়া চলে যান এবং সেখানেই সপরিবারে বসবাস করেন। ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৪৫ বছর বয়সে কুয়ালালামপুরে ইন্তেকাল করেন। আওয়ামী সরকারের রোষানলে পড়ে ভাইকে হারান তারেক রহমান।

২০০৭ সালের ৭ মার্চ কথিত দুর্নীতি মামলার আসামি হিসেবে তারেক রহমানকে তার ঢাকা ক্যান্টনমেন্টস্থ মইনুল রোডের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের কয়েকদিন পর আদালতে হাজির করা হলে তারেক রহমানের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়।

তারেক রহমানের আইনজীবীরা বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের সময়ে তারেক রহমানের ওপর মারাত্মক শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। আদালতের নির্দেশে চিকিৎসকের একটি দল পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর আদালতকে জানায় যে, তারেক রহমানের ওপর শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ ছিল যুক্তিযুক্ত। এ পর্যায়ে আদালত রিমান্ডে নেওয়ার আদেশ শিথিল করে তা কমিয়ে এক দিন ধার্য করেন ও জিজ্ঞাসাবাদকারীদের সাবধানতা অবলম্বনেরও আদেশ দেন। ২০০৭ সালের ২৫ আগস্ট খবর ছড়িয়ে পড়ে যে, তারেক রহমান তার হাসপাতাল কক্ষে পা পিছলে পড়ে গিয়ে আহত হয়েছেন। কারাবন্দি অবস্থায় তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থাকে ব্যবহার করে সিরিজ মামলা হতে থাকে। তার বিরুদ্ধে সারা দেশে ৮৪টি মামলা দেওয়া হয়। ২০০৮ সালের আগস্টে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মামলাগুলো আদালতে গতি পায়। প্রায় ১৮ মাস কারাবন্দি থেকে ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর সব মামলায় তারেক রহমান জামিন পান। জমিন পেয়ে ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর বিশেষ কারাগার থেকে বেগম খালেদা জিয়া মুক্তি পাওয়ার পর তিনি বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে পুত্র তারেককে দেখতে যান। ওইদিন রাতেই তারেক রহমান উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যের উদ্দেশে রওনা হন। এর পর থেকেই তিনি লন্ডনেই অবস্থান করছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় একজন কর্মকর্তার করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৩ সালের মে মাসে ঢাকার একটি আদালত তারেক রহমানকে ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেপ্তারের পরোয়ানা জারি করে।

২০১৮ সালের ২৪ এপ্রিল বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রথমবারের মতো স্বীকার করেন যে, ২০১২ সালে তারেক রহমান ব্রিটেনে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন এবং এক বছরের মধ্যেই সেটি গৃহীত হয়েছে। লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়েই দিন কেটেছে তারেক রহমানের। দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসনে জীবন কাটিয়ে দেশে ফিরছেন তারেক রহমান। এ সময়ে তিনি শক্ত হাতে রাজনীতির নেতৃত্বে দিয়েছেন। বাবার প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের বগুড়া জেলা কমিটর সদস্য হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে সংগঠনে যোগ দেওয়ার আগে থেকেই তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন।[ ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তারেক তার মা খালেদা জিয়ার হয়ে সারা দেশের নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেন। ২০০১ সালের নির্বাচনেও তারেক রহমান বেগম জিয়ার প্রচার কার্যক্রমের পাশাপাশি পৃথক পরিকল্পনায় দেশব্যাপী নির্বাচনী প্রচার চালান। মূলত ২০০১ সালের নির্বাচনী প্রচারে তার অংশগ্রহণের মাধ্যমে রাজনীতিতে তারেক রহমান সক্রিয় হয়ে ওঠেন। এরপর দলের বিভিন্ন পদে থেকে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রামিসা হত্যা মামলা / রায় ঘোষণার সময় কাঠগড়ায় দোয়া পড়ছিলেন সোহেল

সরকারে আসার ঝুঁকি এতটা ভয়াবহ হবে ভাবিনি: ফারুকী

৫ কার্যদিবসে মামলার রায় একটি ‘মাইলফলক’: রাষ্ট্রপক্ষ

দেশে ফিরেছেন ৩৭৪৩৫ হাজি

দক্ষিণ লেবাননে দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত

চার বছরেও শেষ হয়নি সড়কের কাজ, দুর্ভোগে এলাকাবাসী

রামিসা হত্যা মামলা / ৩ মাসের মধ্যে এ বিচার প্রক্রিয়া শেষ করা সম্ভব: আইনমন্ত্রী

গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে এবার আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর পালা : প্রধানমন্ত্রী

কফিনবন্দি হয়ে ফিরলেন লেবাননে নিহত সাতক্ষীরার দুই প্রবাসী

৬ কার্যদিবসের মধ্যে রামিসা হত্যা মামলার বিচার সম্পন্ন, ইতিহাসে প্রথম: আইনমন্ত্রী

১০

যুক্তরাষ্ট্রে দুই বন্দুকধারীর মধ্যে গোলাগুলি, গুলিবিদ্ধ ১২

১১

হাইকোর্টে নথি পৌঁছলে দ্রুত শুনানির উদ্যোগ নেয়া হবে: অ্যাটর্নি জেনারেল 

১২

রামিসা হত্যা মামলা : আদালতের রায়কে স্বাগত জানাল জনতা

১৩

নদীর চরে পড়ে ছিল জেলের মরদেহ 

১৪

সিলেট সীমান্তজুড়ে বিজিবির টহল জোরদার

১৫

রায়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ সেই শিশুর বাবার, দ্রুত কার্যকরের দাবি

১৬

ইসরায়েলি হামলায় লেবাননের জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা নিহত

১৭

মধ্যস্থতার বার্তা নিয়ে তেহরানে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১৮

নতুন বাজেটে পে-স্কেল নিয়ে বড় ধামাকা

১৯

পল্লবীতে শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলা / বড় অঙ্কের জরিমানাও দিতে হবে সোহেল-স্বপ্নাকে

২০
X