

অভয় নগর এখন আর ফাঁকা নয়। দিনভর মানুষের ভিড়, দোকানের হাঁকডাক, ভূমি অফিসে দলিলের ব্যস্ততা। কিন্তু সন্ধ্যা নামলেই এই অফিসটা যেন আলাদা হয়ে যায়। সিঁড়ির মুখে ঝুলে থাকা ভারী লোহার তালা— সব সময় বন্ধ। তবুও অফিসের কর্মচারীরা ফিসফিস করে বলে— তালার ওপাশে যেন কেউ থাকে…
সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার— উপরের তলায় এখন আর কাঠের পাটাতন নেই। সব তুলে ফেলা হয়েছে বহু বছর আগে। তবুও মাঝেমধ্যে রাতে শব্দ হয়— মড়… মড়… মড়… মড়…
একদিন বিকেলে নতুন ভূমি কর্মকর্তা রফিক পুরোনো নথি গোছাতে বসেন। স্টোররুমে রাখা হলদে একটি রেজিস্টার বারবার চোখে পড়ে। কভারে লেখা— ‘পরিত্যক্ত সম্পত্তি— ১৯১৯’ পাতা উল্টাতেই একটি নামের ওপর তার চোখ আটকে যায়— মোহন কুমার (যতিমোহন) মৃত্যুর কারণ : অনির্ধারিত দেহ হস্তান্তর : হয়নি নিচের দিকে ছোট অক্ষরে লেখা আরেকটি লাইন— ‘স্ত্রী আগে মৃত্যু বরণ করেছেন’
রফিক সাহেব খেয়াল করলেন, পাতার কোণায় দুটি আঙুলের ছাপ, মাত্র যেন কেউ ভেজা হাতে ধরে রেখেছিল ফাইলটা। সেই সন্ধ্যায় অফিস প্রায় ফাঁকা।
হঠাৎ ওপর থেকে ভারী কিছু দোলার শব্দ আসে। রফিক সাহেব তাকিয়ে দেখেন— তালাটা নড়ছে না, কিন্তু তার ভেতর থেকে আসছে দুজন মানুষের খুব ক্ষীণ ফিসফিস— ‘এখনো সময় হয়নি…’ ‘আরও… আরও… আরও… ক্ষীণ কান্নার আওয়াজ….” সে বুঝতে পারে না কেন, কিন্তু তার মনে হয়— এই বাড়িতে কেউ কাউকে ডাকছে ….। কেউ শুধু অপেক্ষা করছে।
২.
সেদিন কাজ করতে করতে কখন যে সন্ধ্যা নেমে গেছে, রফিক টেরই পায়নি। হঠাৎ— বিদ্যুৎ চলে যায়। পুরো অফিস অন্ধকার। মোবাইলের আলোও জ্বলছে না, চার্জ শেষ হয়ে গেল হঠাৎই। স্টোররুম থেকে একটা মোমবাতি এনে জ্বালায় রফিক। আবছা হলুদ আলোয় চারপাশ আরও অচেনা লাগে। ঠিক তখনই উপরের দিক থেকে আজগুবি শব্দ শুরু হয়। কাঠের ঘষাঘষি, রশির দোল, আর খুব ক্ষীণ— ফিসফিসানি। অজান্তেই রফিক সাহেব ধীরে ধীরে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যান। সিঁড়ির নিচে দাঁড়িয়েই সে টের পায়— নিচে অন্ধকার হলেও উপরের তলায় আলো-আঁধারের একটা ছায়া নড়ছে। মোমবাতির আলো সেখানে পৌঁছায় না, তবুও সে দেখতে পাচ্ছে।
দ্বিতীয় তলায় দুটি ছায়া। দুজন মানুষ— পাশাপাশি, গলায় রশি, দুলছে তাদের শরীর। রশির সঙ্গে মর্মর... মর্মর... শব্দ।
সবচেয়ে ভয়ংকর— দুজনের হাত পরস্পরের দিকে বাড়ানো। একবার কাছে আসে, ঠিক ছোঁয়ার আগমুহূর্তে— আবার সরে যায়। বারবার। বারবার। বারবার। ফিসফিস করে কথা— ‘এবার হবে?’ ‘না… এখনো না…’
ভালোবাসার কথা, কিন্তু দুজন দুজনকে ছুঁতে পারছে না। হঠাৎ একটি ছায়া ধীরে ধীরে রফিক সাহেবের দিকে মুখ ঘোরায় নাটকীয়ভাবে… অপ্রত্যশিত দ্রুত গতিতে। ঠিক তখনই মোমবাতির শিখা নিভে যায়… ভয়ংকর দুটো হাসির আওয়াজ মিলে যায় উন্মুক্ত হল ঘরে।
পরদিন সকালে কর্মচারীরা রফিক সাহেবকে সিঁড়ির নিচে অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। জ্ঞান ফেরার পর, তিনি শুধু একটাই কথা বলেন— ‘ওরা রাগ করে না… ওরা শুধু অপেক্ষা করে…’
এরপর থেকে উপরের তলা পুরোপুরি বন্ধ। তবুও রাতে যারা মন দিয়ে শোনে, তারা বলেন— খালি পায়ের শব্দ, রশির মর্মর, আর দুজন মানুষের ফিসফিস— যাদের হাত কোনোদিন ছোঁয়া হয়নি।
কয়েকদিন পর অফিস পরিষ্কারের সময় এক কর্মচারী পুরোনো স্টোররুমে একটা মোমবাতির গোড়া খুঁজে পায়। মোমবাতির গায়ে আঙুলের ছাপ। দুটি না- ৪টি। আর মোমের ওপর কেউ যেন নখ দিয়ে খুব ছোট করে লিখে গেছে— ‘এইবার খুব কাছাকাছি ছিলাম।’ সেই রাত থেকেই যারা দেরি করে বাড়ি ফেরে, তারা বলে— এখন আর দুজনের ফিসফিস শোনা যায় না। শোনা যায় শুধু একজনের দীর্ঘশ্বাস। আর মাঝে মধ্যে— দ্বিতীয় তলার জানালায় ছায়া দেখে অনেকেই কিন্তু… দূর থেকে… কেউ জানে না— অপেক্ষা শেষ হয়েছে, নাকি গল্পটা এখনো পুরো বলা বাকি! কোনটা? আমরাও জানি না...