

নব্বই দশকের নিভৃতচারী কবি ও কথাশিল্পী মৃধা আলাউদ্দিনের জন্মদিন ছিল ২ ফেব্রুয়ারি। সময় স্বল্পতার জন্য গত শুক্রবার ৩০ জানুয়ারি কবির কাব্যকৃতি ও সাহিত্যকর্মের ওপর বিশেষ আলোচনা সভার আয়োজন করে কেরানীগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী সাহিত্য সংগঠন ‘কেরানীগঞ্জ সাহিত্য পরিষদ’।
অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য পাঠ করেন কবি-চিন্তক পলিয়ার ওয়াহিদ। আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন— কবি নকবি মুকশী, কবি-ছড়াশিল্পী রেদওয়ানুল হক, ইমরুল কায়েস প্রমুখ। অনুষ্ঠানে কবির কবিতা আবৃত্তি করেন আহসান সোহাগ ও ফাহিম ফয়সাল।
মৃধা আলাউদ্দিন ছন্দ সচেতন নাগরিক এবং একই সঙ্গে তিনি গ্রামীণ কবি। তার কবিতায় উঠে এসেছে দেশ ও সমাজের কুসংস্কার, নীতিহীন-বিপ্রতীব সময়ের ছবি, নোংরা রাজনীতি। একই সঙ্গে নিপুণ কারিগর বাবুই পাখির মতো মৃধা তার কবিতায় প্রেম, দ্রোহ ও ভালোবাসার গান গেয়েছেন।
জন্মদিন অনুষ্ঠানে কবি মৃধা আলাউদ্দিন সম্পর্কে বক্তব্য রাখতে গিয়ে কবি পলিয়ার ওয়াহিদ বলেন, চিত্রকল্পময়তা কবির ভাষায় দৃশ্যপট জীবন্ত হয়ে ওঠে। যেমন— ‘বেহায়া বাতাস’, ‘মথিত সঙ্গম’, ‘নীল ভূমি’ বা ‘হাতির দাঁত’। কবি মৃধা তার কবিতায় বিমূর্ত বিষয়কে মূর্ত করে তোলেন। যেমন— ‘কালিক মেশানো ন্যায্যমূল্যের বাতাস’। এখানে ‘বাতাস’ একটি সাধারণ শব্দ হলেও এর সাথে ‘কালিক’ ও ‘ন্যায্যমূল্য’ যোগ করে তিনি এক ধরনের পুঁজিবাদী বা দূষিত নাগরিক যন্ত্রণাকে তুলে ধরেছেন।
কবি পলিয়ার ওয়াহিদ আরও বলেন, কবি মৃধা একই সঙ্গে কথাশিল্পী ও প্রাবন্ধিক। তিনি নব্বই দশকের নিভৃতচারী কবিদের অন্যতম। তার কাব্যবোধ, ভাবনা ও কবিতার চিত্রকল্প মানুষের বিবেককে নাড়া দেবে বলেই আমি বিশ্বাস করি। কবির ম্যাজিক রিয়েলিজম ঘরানার কবিতাগুলো আমাদের বোধকে জাগ্রত করে। আশা জাগায়- সামনের শীতে মানুষ রৌদ্র হবে। প্রজাপতি হয়ে গ্যাছে কোনো কোনো মাছ। দেশের জাতীয় দৈনিক, লিটলম্যাগ ও ওয়েব ম্যাগাজিনগুলোয় নিয়মিত তার লেখাগুলো পাঠ করে বর্তমানে আমরা কিছুটা হলেও নিজেদের শানিত করতে পারি।
কবি নকীব মুকশী নিজের কবিতা ‘জন্মদিন’- এর পঙতিমালা থেকে উচ্চারণ করে বলেন- পাখিরা বয়সের দিকে তাকায় না/ তাকায় ডানার সক্ষমতার দিকে/ ডানাই তার— আয়ু... আর কবি বেঁচে থাকে কোরকে, বিপুল অরণ্যসৌকর্যে; আকাশ, বাতাস আর সাগরের উদারের নিচে কবি বেঁচে থাকে...। নকীব মুকশী তার মূল বক্তব্যে বলেন- মৃধা আলাউদ্দিনের কবিতা প্রধানত আধুনিক উত্তর-রোমান্টিক ঘরানার। তবে একে পুরোপুরি রোমান্টিক বলা যাবে না, কারণ এখানে প্রেমের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে মানুষের অস্তিত্বের সংকট ও প্রকৃতির সাথে তার আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা সম্পর্ক। তাঁর আঙ্গিক গদ্যছন্দের আশ্রয়ে থাকলেও পঙ্ক্তি বিন্যাসে এক ধরনের অভ্যন্তরীণ দোলা বা রিদম রয়েছে। তিনি ছোট ছোট চিত্রকল্পের মাধ্যমে বড় কোনো ভাবাবেগকে ফুটিয়ে তোলেন।
নকীব মুকশী আরও বলেন- কবির ভাষা অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। কবি একইসাথে তৎসম (সংস্কৃত), তদ্ভব এবং আধুনিক নাগরিক শব্দের এক চমৎকার সংমিশ্রণ ঘটান তার কবিতা ও কাব্য ভাবনায়...
কবি রেদওয়ারুল হক বলেন, বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে কবির সাথে আমার পরিচয়। কবির কবিকার বোধ, বর্ণনাশৈলী এবং তার পারিবারিক টানাপড়েন আমাকে ভাবায়— কবি মৃধা আলাউদ্দিনের কবিতা পড়ে আমি ভাবনার শৈলীচূড়ায় উঠে যাই। বোধ করি এক নতুন অহঙ্কার।
কবি রেদওয়ারুল হক আরও বলেন, কবির কবিতায় নাটকীয়তা আছে। ‘দ্য লাস্ট কিস’ বা ‘এসো আমরা চলে যাই’— এমন আহ্বানগুলোতে তিনি সরাসরি পাঠককে বা তার উদ্দিষ্ট চরিত্রকে সম্বোধন করেন, যা কবিতার সাথে এক ধরনের সরাসরি সংযোগ তৈরি করে। কবির দর্শনের মূলে রয়েছে প্রকৃতিবাদ এবং মানবতাবাদ।
বক্তারা বলেন— মৃধা একজন ছন্দ সচেতন নাগরিক-বৈশ্বিক কবি। তার কবিতায় উঠে এসেছে সমাজের কুসংস্কার, নীতিহীন-বিপ্রতীব সময়ের ছবি, নোংরা রাজনীতি এবং একই সঙ্গে নিপুণ কারিগরের মতো মৃধা তার কবিতায় প্রেম, দ্রোহ ও ভালোবাসার গান গেয়েছেন। সমাজ বিনির্মাণের গাথা কবিকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দান করেছে। কবির দোঁহাগুচ্ছ পাঠকের মনোযোগ কাড়তে সক্ষম হয়েছে। সমালোচনা সাহিত্যে কবি তার নিজস্ব জায়গা তৈরি করে নিয়েছেন।
কবি ইমরুল কায়েশ বলেন, কবি মৃধা আলাউদ্দিনের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রৌদ্দুরে যায় মন’ পাঠে আমি দোঁহাকাব্য সম্পর্কে অবগত হয়েছি। আমি জানতে পেরেছি শুঁড়িখানা। শুঁড়িখানার নীল গেলাসে যেখন দেখি তোর ছবি/ তখন থেকেই আদিরসে কাব্য লিখি- এই শহরে আমিই কবি ...
কবির অন্য কাব্যগ্রন্থগুলো মধ্যে আছে— সামনের শীতে মানুষ রৌদ্র হবে, প্রজাপতি হয়ে গ্যাছে কোনো মাছ, জঙধরা পিনালকোড (গল্পগ্রন্থ), চড়ুইয়ের চিড়িপ চিড়িপ শব্দ (কিশোর কবিতা), শুঁড়িখানার নরম দেহ (দোঁহা কাব্যগ্রন্থ), অল্পকিছু বিষ প্রয়োজন (দোঁহা কাব্যগ্রন্থ), আল মাহমুদ ও অন্যান্য সন্দর্ভ প্রভৃতি।
কবির কবিতা এক ভিন্ন সুর ও জগতে নিয়ে যায়। এক নিঃশ্বাসে পড়া যায় কবির কবিতা। … মৃধা আলাউদ্দিনের কবিতা আমাদের সংগ্রহকে সমৃদ্ধ করবে বলেই আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।
আলোচনা অনুষ্ঠান, কেক কাটা শেষে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সবশেষে কাব্যসন্ধ্যায় নৈশভোজের আয়োজন ছিল।
কবি নিজেও দর্শক-শ্রোতাদের তার গুচ্ছ কবিতা পাঠ করে শোনান।
মন্তব্য করুন