

দুনিয়াদারি বুঝবার মতো জ্ঞান হয়নি তখনো আমার সবকিছু নিয়ে জেদ করে বসতাম আব্বু আম্মুর সাথে। কানে শুনতাম ঠিকই, কিন্তু আক্ষরিক অর্থে বুঝতাম না দারিদ্র্য কি জিনিস, নিম্ন-মধ্যবিত্ত বলতে কি বুঝায়।
বুঝতাম না, কেন চাঁদ রাতের ভোরের জায়নামাজটা আম্মুর চোখের অশ্রুতে প্রতিবার ভিজে যেতো, কেন আম্মু দু'হাত তুলে অঝোর ধারায় কেঁদেই চলতো আর বলতো, আমার কিছু লাগবেনা মওলা, কিন্তু আমাদের নিষ্পাপ তিনটি সন্তানের জন্য যেন অন্তত নতুন জামা কিনে দিতে পারে আজ ওদের বাবা, সেই হ্যায়সিয়তটুকু দাও। আগামীকাল ঈদের দিনে অন্তত যেন দুটো ভালো-মন্দ খাবার মুখে তুলে দিতে পারি ওদের, মাবুদ সেই সামর্থ্যটুকু দাও আমাদের।
আম্মুর গলা ধরে আসা সেই চাপা কান্নার আওয়াজে অনেক সময় ঘুম ভেঙে যেতো আমার, ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতাম আমি আম্মুর দিকে কিন্তু তবুও বুঝতে পারতাম না কিছুই, শুধু বুঝতাম আমাদের চাওয়া যাবেনা কিছুই এমন ভান ধরতে হবে যেন আমাদের সবই তো আছে, নতুন আর কোন জামা কেন লাগবে।
নিম্ন-মধ্যবিত্ত হলে কোন কিছু চাওয়া যায় না তাদের কোন শখ-আহ্লাদ থাকতে নেই নতুন কিছু পেলে খুব ভালো, আলহামদুলিল্লাহ।
আবার না পেলেও আলহামদুলিল্লাহ বলে খুব ভালো থাকাতে হবে, এসব নিয়ে কোন রকম হাঁইচাঁই চিৎকার চেঁচামেচি থাকা প্রযোজ্য নয় নিম্ন-মধ্যবিত্তদের।
এই সমাজে মধ্যবিত্তদের কাছে যা কিছু প্রয়োজন, তার অনেক কিছুই নিম্ন-মধ্যবিত্তদের কাছে নিষ্প্রয়োজন। আর উচ্চবিত্তদের প্রয়োজনগুলি তো রীতিমতো নিম্ন-মধ্যবিত্তদের কাছে পুরোপুরি আদিখ্যেতা।
এমনকি অতি প্রয়োজনীয় কোন কিছু না পেয়ে বা না খেয়ে লজ্জায় মরে গেলে যাবো, তবু কারো দুয়ারে হাত পাতা যাবেনা কোনভাবেই, মুখ ফুটে কারো কাছেই প্রকাশ করা যাবেনা নিজেদের এই দুরাবস্থার কথা। আমাদের জন্য একটিই আশার বাণী রয়েছে- ইনশাআল্লাহ একদিন আমাদেরও হবে। আল্লাহ চাহেন তো একদিন আমরাও....
কী করে কী করতো জানা নেই, তবে আব্বু হয়তো ঠিকই বাজার করে ফেলতো, আমাদের ভাইদের জন্য জামাকাপড়ও কিনে ফেলতো, আর তখন আম্মু আমাদেরকে ও সেগুলিকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে ডুকরে কেঁদে উঠতো।
শ্রাবণের নদী হয়ে উঠতো যেন তার দু'চোখ তখন, আব্বু দূরে দাঁড়িয়ে থাকতো, তার দুচোখও তখন ছলাৎ ছলাৎ শব্দে ঢেউ তুলতো আচ্ছা, আমাদের খুশিতে ওরা কি এমন সুখ পেতো? কেন ওরা ওভাবে কেঁদে উঠতো?
আমাদের মুখে হাসি দেখে কেন তাদের চেহারায় বিশ্ব জয়ের অমন আনন্দ লেগে থাকতো? অথচ গেলো কয়েক বছরে আম্মু নিজের জন্য আব্বুকে কিছুই কিনতে দেয়নি, বোনেদের দেয়া পুরনো থ্রি-পিস আর শাড়ি দিয়ে চালিয়ে নিচ্ছে।
আব্বুটা প্রতি ঈদে একই সেলাই ও রিপু করা পাঞ্জাবি পরে নামাজে যাচ্ছে, প্রতি ঈদে বাড়ছে আব্বুর পাঞ্জাবিতে আম্মুর হাতের সুনিপুণ রিপুর সংখ্যা, তারপরও ওরা নিজেদেরকে কেন এভাবে আমাদের পেছনে তিলেতিলে শেষ করে দিচ্ছে।
সেসব দিন পেছনে ফেলে এখন আমরা বড় হয়েছি আজ আরেকটি ঈদের দিন এবং আজই আমার একটি ছেলে হয়েছে, বংশের প্রথম সন্তান।
এক জুনিয়র কলিগকে দিয়ে মণ পাঁচেক টাঙ্গাইল থেকে বিখ্যাত চমচম আনিয়েছি আব্বু আর আম্মু নিজ হাতে সেসব বিলি করছে বিভিন্ন প্রতিবেশী ও আত্মীস্বজনদের বাসায়, আনন্দে আর খুশিতে ওদের চেহারা লাল হয়ে উঠেছে অথচ আমি কাঁদছি, আমার দু'চোখ বেয়ে টপটপ করে অশ্রুর মোটা মোটা ফোঁটা ঝরতেই আছে আজ আমি কাঁদছি আমার ছেলে হবার খুশিতে না, কাঁদছি আব্বু-আম্মুর সেই নিঃস্বার্থ নির্মল আনন্দ দেখে।
মুখ ফুটে না বলতে দিলেও, এই নিম্ন-মধ্যবিত্ত অবস্থাটি আমাদের মধ্যে অদ্ভুত দৃঢ় এক বন্ধন রচনা করে দেয়, আমরা আমৃত্যু একে অপরের সাথে থাকি, কেউ কখনো ছেড়ে যেতে চাইলেই অতীতের সেই অভাবী দিনগুলি চোখের সামনে এসে আমাদের দিকে আঙুল তুলে প্রশ্ন ছুঁড়তে থাকে- কি রে! টাকা হলেই কি মানুষ এমন একা একা সুখ ভোগ করতে চায়?
ভোগে কি প্রকৃত সুখ থাকে নাকি ত্যাগেই সুখ? বিত্ত যদি মানুষকে একাকিত্ব দান করে, তাহলে তো নিম্ন-মধ্যবিত্তই ভালো যেখানে অভাব সকলকে একত্রে বেঁধে রাখে।।