

রাজধানীর পল্লবীতে মেয়ে রামিসাকে ধর্ষণের পর নৃশংস হত্যা মামলায় আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন বাবা আব্দুল মান্নান মোল্লা। সাক্ষ্যে শিশু রামিসাকে কীভাবে দরজা ভেঙে লাশ খুঁজে পান, ওইসময় কী করেছিলেন ও কী কী দেখেছিলেন তা জানান তিনি।
আদালতে মান্নান মোল্লা জানান, স্ত্রীর ফোন পেয়ে ৩০ মিনিটের ভেতর বাসায় আসেন। এসে দেখেন অনেক মানুষ দরজার সামনে জড়ো। দরজা না খোলায় হাতুড়ি নিয়ে আসেন। এরপর লক তালা ভাঙার পর দেখেন ভেতরে আসামি স্বপ্না। বাথরুমে পড়ে আছে রক্ত।
দরজা ভাঙার পর আসামি স্বপ্নাকে তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ে কোথায়?’ কিন্তু তখন চুপ ছিলেন স্বপ্না। পরে বাথরুমে রামিসার খণ্ডিত মাথা দেখতে পান।
মঙ্গলবার (২ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে এ সাক্ষ্য দেন তিনি।
এদিন প্রথমে রামিসার বাবা সাক্ষ্য দেন। দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে রামিসার মা পারভীন আক্তার সাক্ষ্য দেন। বেলা ১১টা ৩ মিনিটের দিকে পারভীনের সাক্ষ্য শুরু হয়। এ সময় আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না বেগমকে কাঠগড়ায় হাজির করা হয়।
সাক্ষ্যগ্রহণে রামিসার বাবা আব্দুল মান্নান মোল্লা আদালতে বলেন, ‘আমি সকাল সাড়ে ৯টা নাগাদ অফিসে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হই। এরপর বনানীর কাকলীতে অফিসে যাই। অফিসে যাবার পর ১০টা ১৫ মিনিটের দিকে আমার স্ত্রী পারভীন আক্তার আমাকে ফোন করেন। ফোন পেয়ে বাসায় যাই ৩০ মিনিটের ভেতর।’
‘এসে দেখি আমার বাসার বিল্ডিংয়ের মেইন গেটের সামনে অনেক লোক জড়ো। এরপর আমি দৌড় দিয়ে তিন তালায় আমার ফ্ল্যাটের সামনে যাই। সেখানেও দেখি অনেক লোক জড়ো হয়ে আছে। তখন আমার স্ত্রী বলেন, সোহেলদের ফ্ল্যাটের মধ্যে আমাদের মেয়ে রামিসাকে আটকে রেখেছে। সেখানে রাজু, আমার স্ত্রীসহ অনেকে ছিল। রাজু তালা ভাঙার চেষ্টা করছিল,’ বলেন তিনি।
আব্দুল মান্নান আরও বলেন, ‘আমার স্ত্রী অনেকক্ষণ ডাকাডাকি করলেও দরজা খোলেনি। তাই আমি নিচে দৌড়ে তাড়াতাড়ি গিয়ে একটা হাতুড়ি নিয়ে আসি। এরপর আমি দরজার বোল্ড লক ভাঙার চেষ্টা করি। একপর্যায়ে বোল্ড লক ভাঙা হয়। সে লকের ছিদ্র দিয়ে স্বপ্নাকে দেখি। টয়লেটের রুমের ভিতর দেখি অনেক রক্ত। তখন দরজা ভাঙার পর সোহেল-স্বপ্নার কমনরুমের দরজা বন্ধ পাই। স্বপ্নাকে বলি আমার মেয়ে কোথায়? কিন্তু স্বপ্না কিছু বলে না। চুপ ছিল। পরে টয়লেটে বালতির মধ্যে মেয়ের খণ্ডিত মাথা দেখি। তার দেহ খোঁজার জন্য দুই রুমে থাকা দমদরজাও ভেঙে ফেলা হয়। সেখানেও নেই। এরপর সোহেলদের রুমের ভেতর স্টিলের খাটের নিচে মাথাবিহীন আমার মেয়ে রামিসার মরদেহ দেখতে পাই। তারপর পুলিশ এসে মরদেহ উদ্ধার করে। আমি থানায় মামলা করি।’
সাক্ষ্য শেষে আব্দুল মান্নানকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী মূসা কালিমূল্যাহ। এরপর বেলা ১১টার দিকে তার জেরা শেষ হয়। এরপর ক্যামেরা ট্রায়ালের মাধ্যমে রামিসার বড় বোনের সাক্ষ্যগ্রহণ করেন আদালত। এদিন আদালতে মামলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীরা সাক্ষ্য দিবেন বলে জানা গেছে। এদের মধ্যে রয়েছেন— ম্যাজিস্ট্রেট, চিকিৎসক, আলামত সংগ্রহকারী কর্মকর্তা এবং স্থানীয় প্রতিবেশীরা।
এদিকে সকাল পৌনে ৯টায় মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানাকে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগার কেরানীগঞ্জ থেকে এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কাশিমপুর কারাগার থেকে আদালতে আনা হয়েছে। এ সময় তাদের ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। সাক্ষ্যগ্রহণ চলাকালে তাদের এজলাসে নেওয়া হয়।
এর আগে গত ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীর একটি বাসা থেকে আট বছরের শিশু রামিসার খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ফ্ল্যাটটিতে বসবাসকারী সোহেল রানা ও তার স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয়। আদালতের কাছে ধর্ষণ ও হত্যার দায় স্বীকার করে সোহেল।
তদন্ত শেষে মামলার চার্জশিটে প্রধান আসামি সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে, মাদকে আসক্ত থাকতেন সোহেল। ঘটনার দিন শিশু রামিসাকে বাথরুমে টেনে নিয়ে ধর্ষণ করে সোহেল। রামিসা চিৎকার করে কান্নাকাটি করায় ও পরিবারকে জানানোর কথা বললে ক্ষিপ্ত হয়ে মাথা ও হাত কেটে হত্যা করে সোহেল। এ ছাড়া লাশ গুম করতে ও পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করে তার স্ত্রী স্বপ্না।