

ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আপত্তিকর পোস্ট শেয়ার করার অভিযোগে আজিজুল হক (৩৫) নামের এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) রাত দেড়টার দিকে উপজেলার ঝনকা বাজার থেকে আজিজুল হককে আটক করে পুলিশ। পরদিন শুক্রবার তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এদিকে গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়া, মামলার ধরন এবং বাদীর ভূমিকা ঘিরে এলাকায় নানা প্রশ্ন ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অজ্ঞাত এক নারীর পাশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছবি বসিয়ে সেটি ‘তারেক রহমান ব্লগ’ নামের একটি আইডি থেকে ফেসবুকে পোস্ট করা হয়েছিল। ২৬ মার্চ আজিজুল হকের আইডি থেকে পোস্টটি শেয়ার করা হয়। সেটি মুক্তাগাছা বিএনপি নেতাকর্মীদের নজরে আসে এবং আলোচনা শুরু হয়। এক পর্যায়ে এদিন রাতে আজিজুল হককে আটক করে পুলিশ। পরদিন শুক্রবার মুক্তাগাছা থানায় সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ও সন্ত্রাস দমন আইনে একটি মামলা করেন কাশিমপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক মো. ফজলু। এই মামলায় একমাত্র আসামি করা হয় আজিজুল হককে। পরে তাকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হয়। আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ফেসবুকের একটি পেজে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট আজিজুল হক তার ব্যক্তিগত আইডি থেকে শেয়ার করেন। বিষয়টি স্থানীয়দের নজরে এলে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। মামলার বাদীকে নিয়েও নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
৩০ মার্চ সরেজমিনে কথা হয় মামলার বাদী ফজলুর সঙ্গে। তার দাবি, তিনি মামলা সম্পর্কে কিছুই জানেন না এবং থানায় যাননি। নিরক্ষর হওয়ায় কোনো কাগজে স্বাক্ষরও করেননি। তবে ৬ এপ্রিল আবার মামলার বাদীর সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি ভিন্ন বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, পুলিশ তাকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে নিষেধ করেছে এবং তিনি নিজেই থানায় উপস্থিত হয়ে মামলা করেছেন। যদিও তিনি নিরক্ষর, তবুও নিজের নাম লিখতে পারেন।
তবে স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের চাপের মুখেই দ্রুত গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে। অবশ্য পুলিশ-এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। আজিজুল হক বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন এবং মামলাটি তদন্তাধীন। তবে গ্রেপ্তার প্রক্রিয়া, মামলার ধরন এবং বাদীর ভূমিকা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন এখনো কাটেনি।
আজিজুল হকের চাচাতো ভাই কাশিমপুর ইউনিয়ন জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক ফয়জুর রহমান বলেন, গ্রেপ্তার হওয়ার আগে আজিজুলের সঙ্গে এ ব্যাপারে আমার কথা হয়েছে। তিনি আমাকে বলেছেন, ওই দিন তার কাছ থেকে ফোনে কথা বলার নাম করে একজন ফোনটি কিছু সময়ের জন্য নিয়েছিলেন। আজিজুল লেখাপড়া জানেন না, ফেসবুকও চালাতে পারেন না। এর মধ্যে এই ঘটনা ঘটেছে। আজিজুল নিজে ওই পোস্ট শেয়ার করেননি বলে আমাকে বলেছেন।
মুক্তাগাছা উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আবদুল্লাহ মুহাম্মদ মোজাহিদ বলেন, আজিজুল হক তাদের সমর্থক হলেও তিনি কোনো সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত নন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তাকে হয়রানি করা হচ্ছে। একটি পোস্ট শেয়ার করার ঘটনায় সন্ত্রাস দমন আইনে মামলা করা অযৌক্তিক।
কাশিমপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এনামুল হক এনাম বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ পোস্ট সামাজিকভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই এ ধরনের ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ময়মনসিংহ মহানগর সম্পাদক আলী ইউসুফ বলেন, আমরা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই ধরনের ঘটনায় বহু মানুষকে গ্রেপ্তার হতে দেখেছি। তখন আমরা এর প্রতিবাদও করেছি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নিজেই নিজের ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন শেয়ার করে কার্টুনিস্টদের প্রতি কার্টুন আঁকার আহ্বান জানিয়েছেন। অনেক কিছুতেই আমরা তাকে সহনশীল আচরণ করতে দেখছি। তাহলে এক্ষেত্রে কেন এত দ্রুত তাকে গ্রেপ্তার করা হলো? আর যে অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে, তাতে তাকে জেলে পাঠাতে হবে কেন? অতি উৎসাহী হয়ে কেউ এই ধরনের কাজ করে থাকলে এখনই তাদের থামাতে হবে। বিষয়টি সরকারের খতিয়ে দেখা উচিত।
মুক্তাগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. লুৎফুর রহমান বলেন, পোস্টটি ভাইরাল হওয়ার পর স্থানীয়রা পুলিশকে অবহিত করে। যাচাই-বাছাই শেষে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে মনে হওয়ায় তাকে আটক করা হয়। এ ঘটনায় কোনো ধরনের চাপ বা মব পরিস্থিতি ছিল না।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) আসাদুজ্জামান শাকিল বলেন, বাদীর উপস্থিতি ছাড়া মামলা গ্রহণের সুযোগ নেই। তার জানা মতে, বাদী উপস্থিত হয়েই মামলা করেছেন। পরবর্তী সময়ে কোনো চাপের কাছে তিনি অস্বীকার করে থাকতে পারেন।
এ বিষয়ে ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, আপত্তিকর পোস্ট শেয়ারের অভিযোগে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরে সংক্ষুব্ধ পক্ষ মামলা করেছে এবং বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে।