

চট্টগ্রাম নগর যেন ফিরে গেছে তার পুরোনো ছন্দে—লোকজ ঐতিহ্য, বাণিজ্য আর জনসমাগমের এক বিরল মেলবন্ধনে। আন্দরকিল্লা থেকে ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দান পর্যন্ত বিস্তৃত সড়কজুড়ে বসেছে শতবর্ষী জব্বারের বলীখেলা উপলক্ষে বৈশাখী মেলা। খরতপ্ত বৈশাখের রোদ উপেক্ষা করে হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখর এখন পুরো এলাকা।
শত বছর ধরে মেলায় এখনো সমান কদর হাতপাখা আর ফুলের ঝাড়ুর। নগরের মানুষ সারাবছর অপেক্ষায় থাকে এ মেলার জন্য। এখান থেকেই পুরো বছরের জন্য ফুলের ঝাড়ু কিনে রাখেন তারা।
আন্দরকিল্লা জামে মসজিদের সামনে ঝাড়ুর স্তূপের পাশে বসে হাঁক দিচ্ছেন মো. আলম। রাঙ্গুনিয়ার শান্তির হাট এলাকা থেকে ফুলের ঝাড়ু নিয়ে এসেছেন তিনি।
দুপুরের তপ্ত রোদে ঘাম ঝরছে, তবু তার কণ্ঠে ক্লান্তি নেই। প্রায় ১৫ বছর ধরে এই মেলায় একই জায়গায় বসে ঝাড়ু বিক্রি করছেন এই ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, এই জিনিসের কদর কখনো কমে না। সারাবছরই এটা লাগে। আল্লাহর রহমতে এই এক মেলাতেই সারাবছরের বিক্রি করি।
তার দোকানের সামনেই দেখা গেল ক্রেতাদের ভিড়, দরদাম আর বিক্রির ব্যস্ততায় থামার সুযোগ নেই। আতুড়ার ডিপো এলাকায় বাসিন্দা নাসিমা আক্তার ঝাড়ু কিনে বলেন, প্রতিবছর এখান থেকেই এক বছরের ঝাড়ু কিনে নিয়ে যাই।
আড়াই কিলোমিটারজুড়ে জনস্রোত
লালদীঘি মাঠকে কেন্দ্র করে আন্দরকিল্লা, কোতোয়ালি, আছদগঞ্জ, নন্দনকানন পর্যন্ত প্রায় আড়াই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই মেলা। যান চলাচল বন্ধ রেখে সড়ক ও ফুটপাতজুড়ে বসেছে পাঁচ শতাধিক দোকান।
দা, ছুরি, বঁটি থেকে শুরু করে শীতলপাটি, আসবাবপত্র, মাটির তৈজসপত্র, খেলনা, গাছের চারা—কী নেই এই মেলায়! মাটির কলসি, ফুলের টব, কিংবা শিশুদের খেলনায় ক্রেতাদের ভিড় সবচেয়ে বেশি। ভোলার মৃৎশিল্পী মো. সুমন জানান, সাত বছর ধরে তিনি এখানে আসছেন, তবে এবারের ক্রেতা সমাগম আগের চেয়ে বেশি।
মেলার বড় আকর্ষণ মাটির তৈরি জিনিসপত্রের দোকানে ক্রেতাদের ভিড় লক্ষণীয়। মাটির তৈরি কলসি, ফুলের টব, সরা, বাসন, সাজের হাঁড়ি, মাটির ব্যাংক, শিশুদের বিভিন্ন খেলনা সামগ্রী নানা ধরনের তৈজসপত্র যে যার প্রয়োজনমত কিনতে ব্যস্ত।
আবার অনেকেই ভিড় জমিয়েছেন মাটির ফলকে আঁচড় কেটে তৈরি রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, লালন ফকিরের প্রতিকৃতির দোকানে।
ভোলার মৃৎ শিল্পালয় থেকে মো. সুমন মেলায় মাটির জিনিসপত্র নিয়ে এসেছেন। তিনি জানান, এবারসহ ৭ বছর ধরে মেলায় আসছেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র অমিত দে পরিবার নিয়ে মেলায় ঘুরতে এসেছেন। প্রতিবছর মেলা থেকে মাটির তৈরি শো-পিস কিনেন। তিনি বলেন, মেলার শুরুর দিকে দাম বেশি থাকলেও ব্যতিক্রমী জিনিসপত্র পাওয়া যায়।
সিলেট থেকে শীতল পাটি নিয়ে এসেছেন উত্তম কুমার দেবনাথ। সর্বনিম্ন ২৫০০ টাকা শুরু করে ৫০০০ টাকা মূল্যের শীতল পাটি এনেছেন। মেলার প্রথম দিন থেকে অন্যান্য বছরের তুলনায় ক্রেতার সমাগম বেশি বিধায় গত কয়েক বছরের লোকসান এবার কমিয়ে আনার ব্যাপারে আশাবাদী উত্তম কুমার।
এছাড়াও ব্যস্ত সময় পার করছেন চুড়ি ফিতা, রঙিন সুতা, হাতের কাঁকন, নাকের নোলক, মাটির ব্যাংক, খেলনা, ঢোল, বাঁশি, বাঁশ ও বেতের নানা তৈজসপত্র, কাঠের পুতুল, নকশিকাঁথা, খাঁচার পাখির ব্যবসায়ীরা।
সবসময়ের মত এবারও বেতের তৈরি জিনিসপত্রের বেশ চাহিদা আছে। নরসিংদী থেকে বেতের সামগ্রী নিয়ে এসেছেন ফিরোজ মিয়া। তিনি জানান, প্রায় ১৫ লক্ষ টাকার ১২ রকমের বেতের তৈরি জিনিস এনেছেন। মেলায় ৪টি দোকান দিয়েছেন ফিরোজ মিয়া।
সিনেমা প্যালেসের পুরো অংশ জুড়ে বিভিন্ন আসবাবপত্রের দোকান প্রতিবারের মত এবারও বসেছে। আসবাবপত্রের দোকানে শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন ডিজাইনের খাট, আনলা, চেয়ার ইত্যাদি।
হাতপাখার কদর গরমের বাজারে
ফুলের ঝাড়ুর পাশাপাশি হাতপাখার কদর সমান থাকে এ মেলায়। এবার তীব্র গরম আর লোডশেডিংয়ের কারণে হাতপাখার চাহিদা হয়েছে আকাশছোঁয়া। চন্দনাইশ, রাঙ্গুনিয়া, রাঙামাটি, রংপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা বিক্রেতারা জানান, মাসের পর মাস ধরে এই মেলার জন্য প্রস্তুতি নেন তারা।
ফেরি করে হাতপাখা বিক্রি করা বিক্রেতা শাহজাহান ওমর বলেন, সাত-আট মাস আগে থেকেই পুরো গ্রাম মিলে পাখা বানানো শুরু হয়। ২০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত দাম পড়ে একজোড়া হাতপাখার। সবাই চায় তালপাতার হাতপাখা।
বাঁশখালীর বাসিন্দা আবদুর রহমান বলেন, এই গরমে দিনে ৫-৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না, পাখা ছাড়া উপায় নেই।
রংপুর থেকে আগত পাখা বিক্রেতা মো. আবিদ। প্রতি পিস তালপাতা হাতপাখার দাম ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। প্লাস্টিক ও কাপড়ের হাতপাখার দাম যথাক্রমে ৬০ থেকে ১০০ টাকা।
লোকজ শিল্প ও খাদ্যপণ্যে জমজমাট
মেলার আরেক বড় আকর্ষণ ঐতিহ্যবাহী খাবার। মুড়ি, নাড়ু, লাড্ডু, মোয়া—এসবের দোকানে ভিড় লেগেই আছে। পটিয়ার মিলন দাশ জানান, মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে পাঠানোর জন্য প্রতিবছর এখান থেকেই কিনি।
আয়োজক কমিটির সাধারণ সম্পাদক শওকত আনোয়ার বাদল জানান, এবার এসএসসি পরীক্ষার কারণে মেলা একদিন কমানো হয়েছে। তাই মেলায় অন্যবারের তুলনায় ভিড় বেশি। তাছাড়া এবার বন্ধের দিন হওয়াতে মানুষের আগ্রহ বেশি।
ইতিহাসের ধারাবাহিকতা
১৯০৯ সালে ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগর ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে তরুণদের শারীরিকভাবে প্রস্তুত করতে এই বলীখেলার সূচনা করেন। সেই ঐতিহ্য এখন ১১৭ বছরে পা দিয়েছে।
নিরাপত্তায় কঠোর ব্যবস্থা
মেলা ও বলীখেলা ঘিরে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সিসিটিভি ক্যামেরা, ড্রোন নজরদারি, ওয়াচ টাওয়ার, সোয়াট ও বোম ডিসপোজাল ইউনিট মোতায়েন রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে মেডিক্যাল টিম ও ফায়ার সার্ভিসের প্রস্তুতি।