শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
সাইদুল ইসলাম ও আবুল হাসনাত, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ০৩ জুন ২০২৬, ০৭:০৫ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

উদ্বোধনের আগেই বিপিসির ৫০ কোটির ভবনে ফাটল !

বিপিসির সদর দপ্তর ভবন। ছবি : কালবেলা
বিপিসির সদর দপ্তর ভবন। ছবি : কালবেলা

দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ভাড়া ভবনে কার্যক্রম পরিচালনার পর অবশেষে নিজস্ব সদর দপ্তরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)। দেশের জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ ও সরবরাহ কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু চট্টগ্রামে রাষ্ট্রায়ত্ত এই প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ভবন নির্মাণকে ঘিরে কর্মকর্তা-কর্মচারী থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট মহলের মধ্যে ছিল ব্যাপক আগ্রহ ও প্রত্যাশা।

কিন্তু ৫০ কোটিরও বেশি টাকা ব্যয়ে নির্মিত নতুন সদর দপ্তর ভবনটি উদ্বোধনের আগেই এর বিভিন্ন অংশে দৃশ্যমান ফাঁক ও ফাটল সদৃশ চিহ্ন দেখা যাওয়ায় নির্মাণমান, তদারকি এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

নগরীর জামালখান এলাকার জয় পাহাড়ে নির্মিত পাঁচতলা স্টিল স্ট্রাকচার ভবনটির অধিকাংশ কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। রং, পাইপ ফিটিং, বৈদ্যুতিক সংযোগসহ সমাপ্তি পর্যায়ের কাজও প্রায় শেষ। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই ভবনটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালুর প্রস্তুতি চলছিল। এমন সময় ভবনের বিভিন্ন দেয়াল ও সংযোগস্থলে দৃশ্যমান ফাঁক এবং ফাটল সদৃশ চিহ্ন চোখে পড়ে।

প্রতিবেদকের মঙ্গলবার ও বুধবারের সরেজমিন পরিদর্শনের চেষ্টা করা হলেও ভবনটিতে প্রবেশের অনুমতি মেলেনি। গেটে দায়িত্বরত নিরাপত্তাকর্মীরা জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ভেতরে প্রবেশ করা যাবে না। পরে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা একে অপরের কাছে বিষয়টি জানতে বললেও কোনো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে গেটের বাইরে থেকে ধারণ করা ভিডিও ফুটেজ ও ছবিতে ভবনের কয়েকটি স্থানে শ্রমিকদের প্লাস্টার ও রংয়ের কাজ করতে দেখা যায়।

নির্মাণকাজে নিয়োজিত কয়েকজন শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ভবনের কয়েকটি দেয়াল ও প্লাস্টারকৃত অংশে চিড় ও ফাঁক দেখা যাওয়ায় সেখানে পুনরায় প্লাস্টার ও রংয়ের কাজ করা হচ্ছে। তবে এসব চিহ্ন ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তার জন্য কোনো ঝুঁকি তৈরি করছে কি না, সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত নন।

ভবনের কয়েকটি অংশে দ্রুত রং ও প্লাস্টারের কাজ করা হচ্ছে, ফলে আপাতদৃষ্টিতে দেয়ালগুলো চকচকে ও নতুন রূপ ধারণ করেছে। তবে এটি স্থায়ী সমাধান কি না, তা নিয়ে স্থানীয়ভাবে প্রশ্ন রয়েছে

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিপিসির কয়েকজন কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, ভবন নির্মাণে কনসালটেন্ট নিয়োগ, প্রকৌশল তদারকি এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঠিকাদার নির্বাচন করা হয়েছিল। তারপরও উদ্বোধনের আগেই ভবনের বিভিন্ন অংশে দৃশ্যমান ফাঁক দেখা যাওয়ার বিষয়টি তাদের কাছেও অস্বস্তির। তাদের মতে, নির্মাণকাজের বিভিন্ন ধাপে প্রয়োজনীয় তদারকি ও গুণগত মান নিশ্চিতকরণ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে এ বিষয়ে তারা প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

জানা যায়, দেশের জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনের একমাত্র নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিপিসির সদর দপ্তর স্বাধীনতার পর ঢাকায় থাকলেও প্রশাসনিক ও কার্যক্রমগত কারণে ১৯৯০ সালে তা চট্টগ্রামে স্থানান্তর করা হয়। কারণ দেশের প্রায় সব জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ এবং বিতরণ কার্যক্রম চট্টগ্রামকে ঘিরেই পরিচালিত হয়। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে আগ্রাবাদ এবং পরে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের ভবনে ভাড়া নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি।

বিপিসির নিজস্ব জমি থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন সময়ে সদর দপ্তর নির্মাণের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি। একপর্যায়ে বাকলিয়া এলাকায় বৃহৎ প্রকল্পের পরিকল্পনা নেওয়া হলেও সেটি বাস্তবায়ন হয়নি। পরে জয় পাহাড় এলাকায় নিজস্ব অর্থায়নে নতুন সদর দপ্তর নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নির্মাণকাজের দায়িত্ব পায় ইউনাইটেড কর্পোরেশন।

তবে নির্মাণকাজের শুরু থেকেই প্রকল্পটি বিতর্কমুক্ত ছিল না। ভবন নির্মাণের সময় পাহাড় কাটার অভিযোগ ওঠে বিপিসির বিরুদ্ধে। পরে পরিবেশ অধিদপ্তরের তদন্তে পাহাড় কাটার সত্যতা পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটিকে ৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৯ হাজার ৬০০ ঘনফুট পাহাড় কাটার প্রমাণ পাওয়া যায়। শুনানি শেষে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের আওতায় ওই জরিমানা আরোপ করা হয়।

ফাটল সদৃশ চিহ্নের বিষয়ে জানতে চাইলে বিপিসির উপ-মহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) প্রকৌশলী মো. আপেল মামুন কালবেলাকে বলেন, স্টিল স্ট্রাকচারের পুরো বিল্ডিংয়ে কাঠামোগত ফাটল ধরার সুযোগ নেই। স্টিল ও কংক্রিটের সংযোগস্থলে কিছু জায়গায় প্লাস্টারের গ্যাপ তৈরি হয়েছিল, যা পুটিংয়ের মাধ্যমে সমাধান করা হয়েছে। এটিকে কাঠামোগত ফাটল বলা যাবে না, এটি মূলত প্লাস্টারের গ্যাপ।

তিনি আরও বলেন, বিপিসিকে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় স্থানান্তরের পক্ষে একটি মহল কাজ করছে। তারা এসব বিষয় নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করছে। আমাদের অফিসের সামনে আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্ট সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের বাড়ি রয়েছে, সেখানে এই প্রকল্প হোক সেটা তারা চাচ্ছে না। নেগেটিভভাবে বিষয়গুলো তুলে ধরলে সেটি প্রভাবিত করার চেষ্টা হয়।

চট্টগ্রামের কয়েকজন ব্যবসায়ী ও জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বলেন, দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু চট্টগ্রাম হওয়ায় বিপিসির নিজস্ব সদর দপ্তর নির্মাণ ছিল দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা। তাদের মতে, রাষ্ট্রীয় অর্থে নির্মিত এমন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠলে তা কারিগরি পরীক্ষার মাধ্যমে স্বচ্ছভাবে জনসমক্ষে তুলে ধরা উচিত। এতে একদিকে জনমনে থাকা সংশয় দূর হবে, অন্যদিকে প্রকল্পের মান নিয়েও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।

দেশের জ্বালানি খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিপিসির নতুন সদর দপ্তরকে ঘিরে দীর্ঘদিনের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, উদ্বোধনের আগেই দৃশ্যমান ফাঁক ও ফাটল সদৃশ চিহ্নের বিষয়টি সেই প্রকল্পকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো কমপ্লেক্সে ফের আগুন

উপজেলা স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের পথে সরকার

বিএনপি আবারও আওয়ামী লীগের ফাঁদে পড়েছে : নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী

পুলিশের উপস্থিতিতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ-যুবলীগের মিছিল

রাত ১টার মধ্যে ঝড় হতে পারে যেসব অঞ্চলে

আল্লাহর রহমতে বড় দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেয়েছি: নৌ প্রতিমন্ত্রী

কৌশলগত অংশীদারত্ব-বাণিজ্য সম্প্রসারণে সম্মত বাংলাদেশ-তুরস্ক

দুধে মজাদার স্বাদ: ঘরোয়া ও ঐতিহ্যবাহী কিছু জনপ্রিয় খাবার

বিশ্বকাপের আগে বর্ষসেরার পুরস্কার জিতলেন ইয়ামাল

নির্বাচনের পরও ভারত দ্বিচারী ভূমিকা অব্যাহত রেখেছে: সাইফুল হক

১০

জেলেনস্কির বৈঠকের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন পুতিন

১১

সান মারিনো ম্যাচের একাদশে নেই শমিত

১২

ইউএনওর অভিযানে হামলার ঘটনায় ছাত্রদল নেতা বহিষ্কার

১৩

অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে : জয়সওয়াল

১৪

ভারতে ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার ক্লার্ক

১৫

আর্জেন্টিনা শিবিরে বড় সুখবর, দলে যোগ দিলেন মেসি

১৬

দুই হাজারের বেশি বন্দিকে ক্ষমা করলেন মোজতবা খামেনি

১৭

বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ‘গোপন অস্ত্র’ হতে পারেন থিয়াগো

১৮

আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল মিলেমিশে একাকার

১৯

ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানে ভূখণ্ড ব্যবহারের অভিযোগ, জবাব দিল আজারবাইজান

২০
X