

সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যেতে থাকে কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের দীর্ঘভূমি গ্রামের চেনা দৃশ্য। দিনের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে এলে গ্রামের আকাশ মেতে ওঠে শত শত সাদা বক ও পানকৌড়ির ওড়াউড়িতে।
মুহূর্তের মধ্যেই গাছের ডালগুলো সাদা-কালো পাখির ভিড়ে ঢেকে যায়। তাদের একযোগে ডানা ঝাপটানো আর কলতানে সন্ধ্যার নীরবতা ভেঙে তৈরি হয় এক অনন্য প্রাকৃতিক আবহ, যা দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করেন পাখিপ্রেমী, স্থানীয় বাসিন্দা ও আশপাশের এলাকার মানুষ।
ওই গ্রামের হায়দার আলী, জাকির মুন্সি ও খাঁ বাড়ির আশপাশে থাকা তেঁতুল, কড়ই, রেইনট্রি, বাঁশঝাড়সহ বড় বড় গাছগুলোই এখন এসব পাখির নিরাপদ আবাসস্থল। দিনের অধিকাংশ সময় গাছগুলো স্বাভাবিক থাকলেও খাবারের খোঁজে দূর-দূরান্ত যাওয়া বক ও পানকৌড়িগুলো শেষ বিকেলের দিকে ঝাঁকে ঝাঁকে ফিরে এসে সেখানে আশ্রয় নেয়। অল্প সময়ের মধ্যেই পুরো এলাকা পরিণত হয় পাখির এক বিশাল মিলনমেলায়।
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, কয়েক বছর ধরে একই সময়ে এ দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। সাধারণত জুন মাসের শুরুতে বাকিগুলো এখানে এসে বাসা বাঁধে, দুবার প্রজনন কার্য সম্পন্ন করে এবং অক্টোবরের শেষ দিকে আবারও অন্যত্র চলে যায়। তাদের ধারণা, নিরাপদ পরিবেশ, পুরোনো বড় গাছ এবং আশপাশ পর্যাপ্ত খাদ্যের উৎস থাকায় প্রতিবছর একই জায়গায় ফিরে আসে এসব অতিথি পাখি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বিকেলের দিকে বিভিন্ন বাড়ির আশপাশে ও পুকুরপাড় ঘেঁষা বড় গাছগুলোতে একের পর এক পাখি উড়ে এসে বসছে। কোথাও মা পাখি ছানার মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে, কোথাও আবার ডাল বদল করে একে অপরের সঙ্গে খুনসুটিতে মেতে উঠেছে। গাছের প্রতিটি ডাল, এমনকি পাতার ফাঁকেও বসে আছে অসংখ্য বক ও পানকৌড়ি। তাদের ডানার ঝাপটায় আর সম্মিলিত কলকাকলিতে পুরো পরিবেশ হয়ে উঠেছে প্রাণবন্ত। প্রকৃতির এমন চোখ ও হৃদয় জুড়ানো দৃশ্য যে কাউকেই আকৃষ্ট করবে।
স্থানীয়রা জানান, প্রতিদিনের এই প্রাকৃতিক আয়োজন উপভোগ করতে বিকেলের পর থেকেই সেখানে জড়ো হন বিভিন্ন বয়সের মানুষ। অনেকে মোবাইল ফোনে ছবি ও ভিডিও ধারণ করেন। কেউ কেউ আবার নিরিবিলি দাঁড়িয়ে উপভোগ করেন পাখিদের কোলাহল। পাখি প্রেমীদের কাছে জায়গাটি ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে উঠছে একটি আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থানে।
স্থানীয় বাসিন্দারা আরও জানান, এসব পাখিদের ঘিরে তাদের মধ্যে আলাদা এক দায়িত্ববোধও তৈরি হয়েছে। কেউ যাতে পাখিগুলোকে বিরক্ত না করে কিংবা শিকারিরা যেন পাখিদের কোনো ক্ষতি করতে না পারে, সে বিষয়ে তারা সতর্ক নজর রাখছেন। তাদের বিশ্বাস, নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতেও প্রতি মৌসুমে বক ও পানকৌড়ির মিলনমেলার এই অপূর্ব সমাবেশ দীর্ঘভূমি গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
পাখিপ্রেমী মাঈনুদ্দিন সরকার বলেন, প্রতিদিন বিকেলে এত বিপুলসংখ্যক বক ও পানকৌড়িকে একসঙ্গে ফিরে আসতে দেখা সত্যিই অসাধারণ অভিজ্ঞতা। প্রকৃতির এমন মনোহর দৃশ্য খুব বেশি জায়গায় দেখা যায় না। এসব আবাসস্থল সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এমন সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবে।
স্থানীয় বাসিন্দা বাদশা মিয়া বলেন, কয়েক বছর ধরে নির্দিষ্ট সময়ে পাখিগুলো এখানে আসে, আবার নির্দিষ্ট সময়ে ফিরেও যায়। সারাদিন খাবারের সন্ধানে বাইরে থাকলেও বিকেলে সব পাখি আবার গাছে ফিরে আসে। আমরা চেষ্টা করি কেউ যেন তাদের বিরক্ত না করে বা শিকার করতে না পারে সে দিকে নজর রাখতে।
স্থানীয় বাসিন্দা আতিক মুন্সি বলেন, আগে শুধু আমরা দেখতাম, এখন আশপাশের অনেক মানুষ বিকেলে এই দৃশ্য দেখতে আসেন। বিকেলে পাখিগুলো ফিরে আসার পর পুরো এলাকা যেন অন্যরকম প্রাণ ফিরে পায়। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব। তাই পাখিগুলোর প্রহরী হিসেবেও আমরা কাজ করি।
স্থানীয় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. আমির হোসেন বলেন, শিশুদের প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে এমন পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বক ও পানকৌড়ির এ নিরাপদ আবাস আমাদের জন্য গর্বের বিষয়। পাখিদের বিরক্ত না করে সবাই মিলে এটি রক্ষা করতে হবে।
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ শেখ হাসিবুর রেজা কালবেলাকে বলেন, বক ও পানকৌড়ির মতো বন্য পাখি আমাদের জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের নিরাপদ আবাস সংরক্ষণ করা যেমন জরুরি, তেমনি মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে। পাখিদের অযথা স্পর্শ করা বা বিরক্ত করা উচিত নয়। তাদের স্বাভাবিক পরিবেশ অক্ষুণ্ন রেখে দূর থেকে সৌন্দর্য উপভোগ করাই উত্তম।
তিনি আরও বলেন, একই সঙ্গে এলাকাটি পরিচ্ছন্ন রাখা এবং পাখির বিষ্ঠা জমে থাকলে যথাযথভাবে পরিষ্কার করার মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকিও এড়ানো সম্ভব। প্রকৃতি ও জনস্বাস্থ্যের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখেই আমাদের এই প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করতে হবে।