

সুখ বা আনন্দ মানুষের জীবনের এক চিরন্তন অন্বেষণ। শৈশবের সেই নিষ্কলুষ হাসি থেকে শুরু করে বার্ধক্যের প্রশান্তি; জীবনের প্রতিটি পর্যায়েই আমরা সুখ খুঁজে ফিরি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, জীবনের কোন বয়সে মানুষ আসলে সবচেয়ে বেশি সুখী থাকে? মনোবিজ্ঞানীদের মতে, বয়স এবং সুখের মধ্যে একটি অদ্ভুত ও চমকপ্রদ সম্পর্ক রয়েছে, যাকে গবেষকরা ‘ইউ-শেপড ফাংশন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের জীবনের সুখের গ্রাফটি ইংরেজি বর্ণ ‘U’-এর মতো। অর্থাৎ, মানুষ সাধারণত তার তারুণ্যের শুরুতে এবং শেষ বয়সে সবচেয়ে বেশি সুখী থাকে, আর মধ্যবয়সে সুখের মাত্রা থাকে সবচেয়ে নিচে।
তারুণ্যের সতেজতা ও বর্তমানের চ্যালেঞ্জ
সাধারণত তারুণ্যকে একটি দুশ্চিন্তামুক্ত এবং সুখের সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তরুণরা শারীরিকভাবে সুস্থ থাকে এবং ভবিষ্যতের প্রতি তাদের এক ধরনের সহজাত আশাবাদ কাজ করে। তবে বর্তমান সময়ে এই চিত্রে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব, একাকীত্ব, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে অনেক অঞ্চলের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মানসিক উদ্বেগ ও বিষণ্ণতা বাড়ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ইন্টারনেটে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশি সময় কাটান, তাদের মধ্যে একাকীত্ব এবং হতাশা বেশি দেখা দিচ্ছে।
মধ্যবয়সের বিষণ্ণতা বা ‘মিডল-এজড ব্লুজ’
গবেষণা অনুযায়ী, মানুষ সাধারণত ৫০ বছর বয়সের আশেপাশে সবচেয়ে কম সুখী বোধ করে। একে বলা হয় ‘মিডল-এজড ব্লুজ’। মজার বিষয় হলো, এই সময়ে মানুষের জীবনযাত্রার খুব একটা বড় পরিবর্তন হয় না; বরং জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়। সামাজিক মর্যাদা রক্ষার লড়াই এবং শারীরিক সক্ষমতা কিছুটা কমে যাওয়া এই সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
বার্ধক্যে ফিরে আসা সুখের দিন
অবাক করার মতো তথ্য হলো, ৫০ বছরের পর থেকে মানুষের জীবন নিয়ে সন্তুষ্টি আবার বাড়তে শুরু করে। বয়স্ক ব্যক্তিরা সাধারণত তাদের আবেগকে আরও ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। তারা অতীতের ভুল বা না পাওয়ার বেদনা নিয়ে কম অনুশোচনা করেন এবং নেতিবাচক আবেগগুলোকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেন। এছাড়া, তারা অন্যের মতামত বা সামাজিক প্রতিযোগিতাকে আগের মতো গুরুত্ব দেন না, যা তাদের মানসিক প্রশান্তি দেয়।
ভৌগোলিক ও সামাজিক প্রভাব
সুখী হওয়ার বিষয়টি কেবল বয়সের ওপর নয়, বরং পারিপার্শ্বিক পরিবেশের ওপরও নির্ভর করে। যেমন ফিনল্যান্ডের মানুষ বিশ্বের অন্যতম সুখী জাতি। আবার ইতালি বা জাপানের ওকিনাওয়ার মতো জায়গায় বয়স্করা অনেক বেশি সুখী, কারণ সেখানে বয়স্ক ব্যক্তিরা সমাজের মূল ধারার সাথে যুক্ত থাকেন এবং পরিবারের সবার সাথে মিলেমিশে থাকেন।
শেষ কথা
সুখ কোনো গন্তব্য নয়, বরং একটি পথচলা। বয়সের সাথে সাথে আমাদের সুখের উৎস বদলায়। তারুণ্যের উচ্ছ্বাস যেমন আনন্দদায়ক, তেমনই বার্ধক্যের পরিণত মানসিকতা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা জীবনকে আরও অর্থবহ করে তোলে। তাই বয়স যাই হোক না কেন, জীবনকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করাই সুখী হওয়ার মূল চাবিকাঠি।
তথ্যসূত্র: সাইকোলজি টুডে