

ডেঙ্গুর কারণে দেশে প্রতি বছর প্রায় ৪-৫ হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন যশোর-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. মোসলেহ উদ্দীন ফরিদ।
সোমবার (২০ জুলাই) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে ‘ডেঙ্গু জ্বর বিষয়ক সচেতনতামূলক সায়েন্টিফিক সেমিনারে’ ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তিনি এ দাবি করেন।
ডেঙ্গুর ক্রমবর্ধমান প্রাদুর্ভাব রোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম (এনডিএফ) এ সেমিনারের আয়োজন করে।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডেঙ্গুর ফলে দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ও পেশাগত ক্ষতি তুলে ধরেন ডা. মোসলেহ উদ্দীন। তিনি বলেন, “ডেঙ্গুর ক্ষয়ক্ষতি শুধু চিকিৎসার খরচেই সীমাবদ্ধ নয়। আক্রান্ত ব্যক্তিরা সুস্থ হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় ধরে ‘ফ্যাটিগ’ বা চরম শারীরিক দুর্বলতায় ভোগেন। এর ফলে ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশোনার ক্ষতি হয় এবং কর্মক্ষম মানুষ দীর্ঘ সময় কাজ বা ব্যবসা-বাণিজ্যে যোগ দিতে পারেন না, যা জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।”
ডেঙ্গুর আর্থিক ক্ষতি তুলে ধরে তিনি বলেন, “দেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৫০০ মানুষ মারা যায় এবং ১ লক্ষাধিক মানুষ আক্রান্ত হয়। কিন্তু এ ১ লাখের হিসাবটি প্রকৃত চিত্রের ক্ষুদ্র অংশ বা ‘টিপ অফ দ্য আইসবার্গ’, কারণ দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ এখনো অনিবন্ধিত ও অপ্রাতিষ্ঠানিক স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছ থেকে চিকিৎসা নেন, যাদের তথ্য সরকারি রেকর্ডে আসে না।”
ডা. মোসলেহ উদ্দীন জানান, ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা মূলত দিনের বেলায় কামড়ায়। তাই কেবল মশারি দিয়ে ডেঙ্গু ঠেকানো সম্ভব নয়। তার মতে, ডেঙ্গু দমনের প্রধান কৌশল হওয়া উচিত লার্ভা নিধন এবং এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস করা।
স্বাস্থ্য খাতের সীমাবদ্ধতা নিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকারের কাছে অর্থের অভাব নেই। গত বছর স্বাস্থ্য খাতের ৩৫ হাজার কোটি টাকা বাজেটের মধ্যে ১৪ হাজার কোটি টাকাই ফেরত গেছে।’
সমস্যাটি মূলত সঠিক ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়ের। এ সমন্বয়হীনতা দূর করতে তিনি অবিলম্বে সংসদীয় স্বাস্থ্য কমিটি কার্যকর করার ওপর জোর দেন তিনি। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আরও কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে তিনি সংসদীয় স্বাস্থ্য কমিটিকে সক্রিয় করার ওপর জোর দেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য মারজিয়া বেগম গুজব ও অপচিকিৎসা থেকে বিরত থেকে বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক সচেতনতা গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গু একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে অধিকাংশ রোগীই সুস্থ হয়ে ওঠেন।’
সেমিনারে কী-নোট স্পিকার হিসেবে বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. জাহাঙ্গীর-উল আলম (সোহেল)। তিনি বলেন, ‘জ্বর দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ এবং অপ্রয়োজনীয় ওষুধ সেবন থেকে বিরত থাকা জরুরি।’
এনডিএফের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হোসেনের সঞ্চালনায় সেমিনারে আরও প্যানেল আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন বিসিএস হেলথ ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোস্তাফিজুর রহমান, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মাহবুব ইসলাম মজুমদার এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আব্দুল্লাহ সাঈদ খান।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ডেঙ্গু এখন আর কেবল মৌসুমি সমস্যা নয়, এটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। তাই হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসার পাশাপাশি কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদারের বিকল্প নেই।’