

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ, সার্বভৌমত্ব এবং সুশাসনের প্রশ্ন
ডিজিটাল বিশ্ব আকাশে ভাসে না। এটি সমুদ্রের তলদেশে বিছানো ফাইবার অপটিক কেবলের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আন্তর্জাতিক ডাটার প্রায় পঁচানব্বই শতাংশ এই কেবলপথে প্রবাহিত হয়। ব্যাংকিং লেনদেন, শেয়ারবাজার, সামরিক যোগাযোগ, কূটনৈতিক বার্তা, ক্লাউড কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈশ্বিক বাণিজ্য, সবকিছু এই নীরব কিন্তু কৌশলগত অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল।
সুইডেনসহ ইউরোপের উন্নত প্রযুক্তি পরিবেশ বহুদিন ধরেই নিরাপদ নেটওয়ার্ক অবকাঠামো উন্নয়নে নেতৃত্ব দিচ্ছে। সুইডিশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান Ericsson বৈশ্বিক টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ইউরোপ থেকে এশিয়া পর্যন্ত নতুন প্রজন্মের সাবমেরিন কেবল স্থাপন এখন কেবল প্রযুক্তিগত উদ্যোগ নয়, বরং অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক পুনর্গঠনের অংশ।
প্রশ্ন হলো, স্যাটেলাইট যুগে কেন সমুদ্রতলের কেবল এত গুরুত্বপূর্ণ?
স্যাটেলাইট পৃথিবীর কক্ষপথে অবস্থান করে, ফলে সিগন্যাল যাতায়াতে বিলম্ব ঘটে। উচ্চগতির আর্থিক লেনদেন বা তাৎক্ষণিক ডাটা প্রক্রিয়াকরণে এই বিলম্ব গ্রহণযোগ্য নয়। সমুদ্রতলের ফাইবার অপটিক কেবল আলোর মাধ্যমে ডাটা পরিবহন করে এবং অত্যন্ত কম ল্যাটেন্সি নিশ্চিত করে। একটি আধুনিক কেবল ব্যবস্থা কয়েক টেরাবিট থেকে শত টেরাবিট প্রতি সেকেন্ড পর্যন্ত ডাটা পরিবহন করতে সক্ষম। দীর্ঘমেয়াদে এটি অধিক স্থিতিশীল এবং ব্যয়সাশ্রয়ী।
এটি প্রযুক্তির প্রশ্ন নয়, এটি কৌশলগত সক্ষমতার প্রশ্ন।
বৈশ্বিক বিনিয়োগ ও ডাটা শক্তির রাজনীতি
একটি বড় আন্তঃমহাদেশীয় সাবমেরিন কেবল প্রকল্পের ব্যয় তিনশো মিলিয়ন থেকে দেড় বিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। খরচের মধ্যে থাকে সমুদ্র জরিপ, গভীর সমুদ্র প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং উচ্চক্ষমতার ডাটা পরিবহন অবকাঠামো।
বিশ্বের বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই কেবল বিনিয়োগ করছে। কারণ ডাটা এখন সম্পদ, প্রভাব এবং নিরাপত্তার উৎস। যে রাষ্ট্র বা জোট ডাটা প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে, তারা অর্থনৈতিক প্রবাহও প্রভাবিত করতে পারে।
ডাটা এখন তেলের বিকল্প নয়। ডাটাই নতুন শক্তি।
বাংলাদেশের অবস্থান : সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সাবমেরিন নেটওয়ার্কের অংশ। Bangladesh Submarine Cable Company Limited এর মাধ্যমে দেশটি যুক্ত রয়েছে SEA-ME-WE-5 এবং SEA-ME-WE-6 কেবল ব্যবস্থার সঙ্গে। কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক ল্যান্ডিং স্টেশন রয়েছে।
এটি কেবল সংযোগ নয়, একটি কৌশলগত সুযোগ।
অন্যদিকে বাংলাদেশের নিজস্ব স্যাটেলাইট Bangabandhu Satellite-1 মূলত সম্প্রচার ও নির্দিষ্ট যোগাযোগ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক উচ্চগতির ডাটা ট্রানজিটে সাবমেরিন কেবলই প্রধান অবকাঠামো।
অতএব স্যাটেলাইট ও সাবমেরিন কেবল পরস্পরের বিকল্প নয়, বরং পরিপূরক।
অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও ডিজিটাল রূপান্তর
উন্নত আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ তথ্যপ্রযুক্তি খাত, আউটসোর্সিং শিল্প, ফিনটেক ও ডিজিটাল বাণিজ্য সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখতে পারে। স্থিতিশীল সংযোগ থাকলে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ডাটা সেন্টার স্থাপনে আগ্রহী হয়। এটি উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে।
রেমিট্যান্সনির্ভর অর্থনীতির জন্য নিরাপদ ও দ্রুত আর্থিক লেনদেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাবমেরিন কেবল সেই অবকাঠামোগত ভিত্তি শক্তিশালী করে।
কিন্তু আন্তর্জাতিক সংযোগ থাকলেই উন্নয়ন নিশ্চিত হয় না। শেষ মাইল সংযোগ, গ্রামীণ ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি এবং নীতিগত সংস্কার অপরিহার্য।
দুর্নীতি হ্রাস : প্রযুক্তির সুযোগ ও সতর্কবার্তা
ডিজিটাল সরকারি সেবা সরাসরি লেনদেন কমায়। ই-টেন্ডার প্রক্রিয়া স্বচ্ছতা বাড়ায়। ডিজিটাল পেমেন্ট ট্রেসযোগ্যতা নিশ্চিত করে।
কিন্তু প্রযুক্তি নিজে সুশাসন সৃষ্টি করে না।
স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, মুক্ত গণমাধ্যম, তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন না থাকলে ডিজিটাল অবকাঠামোও কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হতে পারে। অতএব প্রযুক্তি একটি সুযোগ। সুশাসন সেটিকে শক্তিতে রূপান্তর করে।
জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব
সাবমেরিন কেবল জাতীয় নিরাপত্তার অংশ। একাধিক রুট, বিকল্প সংযোগ এবং রিডানডেন্সি নিশ্চিত করা জরুরি। একক নির্ভরতা কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করে। ডাটা কোথায় সংরক্ষিত হচ্ছে, কে নিয়ন্ত্রণ করছে, সাইবার নিরাপত্তা কতটা সুরক্ষিত—এসব প্রশ্ন এখন অর্থনৈতিক প্রশ্নের সমান গুরুত্বপূর্ণ। ডাটা সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা ভবিষ্যতের রাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে উঠবে।
সামনে পথ
বাংলাদেশকে তিনটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রথমত, বহুমুখী আন্তর্জাতিক ডাটা সংযোগ ও বিকল্প রুট নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা ও ডাটা সুরক্ষা কাঠামো গঠন। তৃতীয়ত, ডিজিটাল রূপান্তরকে সুশাসনের সঙ্গে যুক্ত করা। ডিজিটাল অবকাঠামো কেবল অর্থনৈতিক মহাসড়ক নয়। এটি রাষ্ট্রক্ষমতা, নাগরিক অধিকার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্ভাবনার ভিত্তি।
সমুদ্রতলের ফাইবার কেবল অদৃশ্য। কিন্তু এর প্রভাব দৃশ্যমান। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে বৈশ্বিক ডাটা মহাসড়কে যুক্ত হয়েছে। এখন প্রশ্ন, দেশ কি কেবল ব্যবহারকারী থাকবে, নাকি কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করে আঞ্চলিক ডাটা হাবে পরিণত হবে? ডিজিটাল অবকাঠামো সুযোগ দেয়। সার্বভৌম নীতি, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি সেই সুযোগকে জনকল্যাণে রূপান্তর করে। ভবিষ্যতের প্রশ্ন এখনই করা জরুরি। কারণ ডাটা প্রবাহ যেখানে যায়, শক্তির ভারসাম্য সেদিকেই সরে যায়।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, প্রাক্তন পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন