কাজী এনায়েত উল্লাহ
প্রকাশ : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:২১ পিএম
আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:৩৩ এএম
অনলাইন সংস্করণ

নীরব আত্মসমর্পণ থেকে দায়িত্বশীল নাগরিকত্ব: বাংলাদেশের জন্য নতুন রাজনৈতিক পথচিন্তা

কাজী এনায়েত উল্লাহ। ছবি : সংগৃহীত
কাজী এনায়েত উল্লাহ। ছবি : সংগৃহীত

রাজনীতি থেকে পালিয়ে মুক্তি নেই। কিন্তু রাজনীতিকে যদি নৈতিকতা, দক্ষতা ও নাগরিক দায়িত্বের জায়গায় ফিরিয়ে আনা যায়, তবে পরিবর্তন সম্ভব। এই উপলব্ধির ওপর দাঁড়িয়েই একটি নতুন রাজনৈতিক মডেলের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়— যে মডেল কোনো কল্পনাপ্রসূত ইউটোপিয়া নয়, বরং ধীর, বাস্তব এবং নাগরিক চেতনায় গড়ে ওঠা এক নতুন পথ।

এখানে রাজনীতি কোনো অলৌকিক বিপ্লবের মাধ্যমে বদলে যাবে না; বরং প্রতিদিনের দায়িত্বশীল অংশগ্রহণ, নৈতিক সিদ্ধান্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক শুদ্ধতার মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে রূপান্তর ঘটবে। এই পথচলার অন্তর্নিহিত বিশ্বাস একটাই— ভবিষ্যতের রাজনীতি সবচেয়ে চতুরদের হাতে নয়, বরং সবচেয়ে দায়িত্বশীলদের হাতেই ন্যস্ত হওয়া উচিত।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটকে সাধারণত ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘাত কিংবা দলীয় প্রতিযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে দেখা হয়। কিন্তু এই দৃশ্যমান সমস্যাগুলোর নিচে লুকিয়ে আছে আরও গভীর এক সংকট— রাজনীতির প্রতি মানুষের দীর্ঘদিনের জমে ওঠা অনাস্থা। সাধারণ মানুষের চোখে রাজনীতি আজ দুর্নীতি, সহিংসতা, দলাদলি ও নৈতিক পতনের সমার্থক।

এ ধারণা শুধু আবেগের ফল নয়; এটি দীর্ঘ অভিজ্ঞতার সঞ্চিত প্রতিক্রিয়া। এর সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি হলো, সমাজের সবচেয়ে শিক্ষিত, দক্ষ ও নৈতিক অংশটি সচেতনভাবেই রাজনীতি থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেয়। তারা রাজনীতিকে ‘নোংরা’ মনে করে দূরত্ব বজায় রাখে, যেন রাজনীতি এড়িয়ে চললেই ব্যক্তিগত সততা রক্ষা পাবে।

কিন্তু এই দূরে থাকা কোনো নিরপেক্ষ অবস্থান নয়। এটি এক ধরনের নীরব আত্মসমর্পণ। কারণ রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ালেও রাজনীতির সিদ্ধান্ত, নীতি ও ক্ষমতার প্রভাব থেকে কেউ মুক্ত থাকতে পারে না। যে মানুষটি রাজনীতি অপছন্দ করেন, তিনিও কর দেন, আইন মানেন, রাষ্ট্রীয় সেবার ওপর নির্ভর করেন এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল ভোগ করেন। অর্থাৎ তিনি রাজনীতির ভেতরেই বাস করেন, শুধু সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারটি অন্যদের হাতে ছেড়ে দেন। এই বাস্তবতা বুঝতে না পারাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি মৌলিক সংকট।

রাজনীতি আসলে কোনো পেশা নয়; এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব। এই ধারণাটি নতুন নয়। প্লেটো বহু আগেই সতর্ক করেছিলেন— “যদি ভালো মানুষ রাজনীতি না করে, তবে খারাপ মানুষের শাসন মেনে নিতে হয়।” বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই উক্তি আজ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। যারা নিজেদের ‘অরাজনৈতিক’ বলে দাবি করেন, তারাও ভোট দেন, আইন মানেন এবং রাষ্ট্রের কাঠামোর অংশ হয়ে থাকেন। ফলে প্রশ্নটি কখনোই রাজনীতি করব কি না— এটি নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, আমরা কী ধরনের রাজনীতি মেনে নিচ্ছি এবং ভবিষ্যতে কী ধরনের রাজনীতি গড়ে তুলতে চাই।

এই জায়গা থেকেই নতুন রাজনৈতিক মডেলের প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। এই মডেল রাজনীতিকে ক্ষমতার খেলা হিসেবে দেখে না; বরং দেখে সমস্যা সমাধানের একটি প্রাতিষ্ঠানিক বিজ্ঞান হিসেবে। এখানে রাজনীতি মানে কৌশলী চাল নয়, বরং নৈতিক সিদ্ধান্তের ধারাবাহিক প্রয়োগ। নেতৃত্ব এখানে আধিপত্যের প্রতীক নয়, বরং দায়িত্বের ভার। জনপ্রিয়তা নয়, বরং জবাবদিহিই এখানে ক্ষমতার বৈধতা নির্ধারণ করে। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে রাজনীতি আর ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণের মাধ্যম থাকে না; এটি হয়ে ওঠে নাগরিক জীবনের সম্প্রসারিত দায়িত্ব।

এই মডেল বিশ্বাস করে, রাজনীতির সংস্কার বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া যায় না। এটি গড়ে ওঠে নাগরিক চেতনার ভেতর থেকে। যখন সাধারণ মানুষ রাজনীতিকে নিজের বিষয় হিসেবে ভাবতে শুরু করে, যখন দক্ষ পেশাজীবীরা নৈতিক দ্বিধা কাটিয়ে অংশগ্রহণে আগ্রহী হন, তখনই রাজনীতির চরিত্র বদলাতে শুরু করে। এখানে পরিবর্তন আসে ধীরে, কিন্তু গভীরে। কারণ এই পরিবর্তন কোনো ব্যক্তি বা দলের ওপর নির্ভরশীল নয়; এটি নির্ভর করে প্রাতিষ্ঠানিক নৈতিকতার ওপর।

বাংলাদেশের জন্য এই পথ কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। কারণ অনাস্থার গভীরতার মধ্যেই পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মানুষ আজ রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে চায়, কারণ তারা ভালো রাজনীতি দেখেনি। কিন্তু ভালো রাজনীতি দেখা না যাওয়ার অর্থ এই নয় যে, ভালো রাজনীতি অসম্ভব। বরং এর অর্থ হলো— ভালো রাজনীতির কাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি। এই নতুন মডেল সেই শূন্যস্থান পূরণের একটি প্রচেষ্টা।

শেষ পর্যন্ত রাজনীতি তখনই মানবিক হয়ে ওঠে, যখন তা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত থাকে এবং নৈতিকতার প্রশ্নে আপস না করে। এই প্রবন্ধে আলোচিত মডেল সেই সম্ভাবনারই কাঠামোগত রূপ। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়— রাজনীতি থেকে পালিয়ে নয়, বরং রাজনীতিকে দায়িত্বশীল নাগরিকত্বের জায়গায় ফিরিয়ে এনেই সত্যিকারের মুক্তি সম্ভব।

লেখক: মহাসচিব, অল ইউরোপিয়ান বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন (আয়েবা), ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের স্বতন্ত্র প্রার্থী, ঢাকা-১৭

[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। দৈনিক কালবেলার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, দৈনিক কালবেলা কর্তৃপক্ষের নয়। ]
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি চুক্তির খবরে কমেছে তেলের দাম

শীর্ষে ওঠার লড়াইয়ে তিউনিশিয়ার বিপক্ষে এগিয়ে সুইডেন

পুষ্টিগুণে ভরপুর দেশি ফল ডেউয়া

শেষ মুহূর্তে গোল, জয় দিয়েই আফ্রিকান চ্যাম্পিয়নদের বিশ্বকাপ মিশন শুরু

যে দলগুলোর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি গোল খেয়েছে আর্জেন্টিনা

আরব সাগরে আটকে পড়া ১৪ ভারতীয় নাবিককে উদ্ধার করল যুক্তরাষ্ট্র

নতুন ইউনিয়ন পেল শিবগঞ্জ উপজেলা

এইচএসসি ২০২৬ / নকলমুক্ত পরীক্ষা নিশ্চিতে কেন্দ্রে চলবে কড়া নজরদারি

অটোরিকশার চাকায় ওড়না পেঁচিয়ে প্রাণ গেল শিক্ষিকার

নতুন ইরান চুক্তি জেসিপিওএর চেয়ে বেশি ভালো হবে না : ওবামা

১০

স্ত্রীকে গলা টিপে হত্যাচেষ্টা, পাষণ্ড স্বামী গ্রেপ্তার

১১

সিলেটে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ, শনাক্ত ২৭

১২

বেনজীরকে দেশে পাঠানোর বিষয়ে বাংলাদেশকে চিঠি দিল আমিরাত

১৩

 শান্তি চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান, ১৯ জুন সুইজারল্যান্ডে স্বাক্ষর

১৪

সোমবার রাজধানীর যেসব এলাকায় মার্কেট বন্ধ

১৫

দিল্লির বিমানবন্দর থেকে ফেরত আসছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা

১৬

কী ঘটেছিল ইতিহাসের এই দিনে

১৭

দেশে ব্যাপক ঝড়-বৃষ্টির শঙ্কা, নদীবন্দরেও সতর্কতা

১৮

আজকের নামাজের সময়সূচি

১৯

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতাকে স্বাগত জানালেন এরদোয়ান

২০
X