

তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে লড়াইটা বেশ ভালোই জমিয়েছিল বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ে। কিন্তু শেষের ব্যাটিং ধসে ১৩ রানে হেরে গেছে বাংলাদেশ। এক ম্যাচ হাতে রেখেই সিরিজ জিতে গেল জিম্বাবুয়ে। হারারে স্পোর্টস ক্লাব মাঠে টসে জিতে এদিনও আগে বোলিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ। বোলিংয়ে নেমে বাংলাদেশকে দ্রুত উইকেট এনে দিয়েছেন পেসার তাসকিন আহমেদ। প্রথম ওভারেই ওপেনার ব্রায়ান বেনেটকে ফিরিয়ে দেন তাসকিন। ৫ বল খেলেও রানের খাতা খোলার আগেই সাজঘরে ফিরে যান বেনেট।
তিনে নামা ইনোসেন্ট কাইয়াও বেশিক্ষণ টেকেননি। ৭ বলে ৪ রান করে দলের ৮ রানের মাথাতে বিদায় নেন তিনি। তাকে ফিরিয়েছেন সেই তাসকিন। গতিতারকা তাসকিন আহমেদের জোড়া আঘাতে দারুণ শুরু পায় বাংলাদেশ, শুরুতেই ব্যাকফুটে চলে যায় জিম্বাবুয়ে।
এরপর কিছুটা লড়াই চালিয়েছেন বেন কারান এবং চারে নামা ক্রেইগ আরভিন। এক প্রান্ত আগলে রেখে খেলে গেছেন কারান। আরভিন ভালো শুরু পেলেও ইনিংস লম্বা করতে পারেননি। দলের ৩২ রানের মাথাতে ২০ বলে ৯ রান করা আরভিনকে ফেরান নাহিদ রানা। ৩য় উইকেট হারায় জিম্বাবুয়ে। তবে কারানকে ঠেকানো যাচ্ছিল না। উইকেটের চারপাশে দারুণ সব শটে রান বের করেছেন বেন কারান। দারুণ কার্যকরী ব্যাটিংয়ে ছুটেছেন ফিফটির দিকে। পাঁচে নেমে ওয়েসলি মাধেভেরেও ছিলেন সাবলীল। যদি ইনিংস লম্বা করতে পারেননি তিনি। ৩০ বলে ১৫ রান করে দলের ৬৬ রানের মাথাতে বিদায় নিয়েছেন মাধেভেরে। তাকে ফিরিয়েছেন বাংলাদেশের অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ।
মাধেভেরের বিদায়ের পর ক্রিজে আসেন সিকান্দার রাজা। কারানের সাথে জুটিটা দারুণ জমে যায় রাজার। দুজনের সাবলীল ব্যাটিংয়ে এগোতে থাকে জিম্বাবুয়ের ইনিংস। ফিফটি ছুঁয়ে ফেলেন বেন কারান। রাজাও ছুটেছেন ফিফটির দিকেই। দুজনের কার্যকরী ব্যাটিংয়ে শুরুর বিপদ সামাল দেয় জিম্বাবুয়ে। কিছুটা দিশা ফিরে পায়।
ফিফটির পরেও ছুটে চলেছেন বেন কারান। বাংলাদেশের বোলারদের সামলেছেন বুদ্ধিদীপ্ত ব্যাটিংয়ে। রাজা ফিফটির পথে থাকলেও এর আগেই বিদায় নিয়েছেন। ৫৩ বলে ৩৩ রানের ইনিংস খেলে দলের ১৩৪ রানের মাথাতে বিদায় নিয়েছেন রাজা। ভেঙেছে কারান এবং সিকান্দার রাজার ৬৮ রানের জুটি। রাজাকেও ফিরিয়েছেন টাইগার অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ।
তবে কারানকে থামানো যাচ্ছিল না এতকিছুর পরেও। এক প্রান্ত আগলে রেখে দারুণ কার্যকরী ব্যাটিংয়ে ছুঁয়েছেন বেন কারান। চলে যান সেঞ্চুরির খুব কাছেও। রাজার বিদায়ের পর ক্রিজে নামা ক্লাইভ মাদান্দেকে ফিরিয়েছেন রিশাদ হোসেন। ১৩ বলে ৪ রান করে বিদায় নেন মাদান্দে। ১৪৮ রানের মাথাতে ৬ষ্ঠ উইকেট হারিয়েছে জিম্বাবুয়ে।
৭ম উইকেট জুটিতে কারানের সাথে যোগ দেন ব্র্যাড ইভান্স। কিছুটা চালিয়ে খেলেছেন ইভান্স। কারানও সময়ের সাথে সাথে রানের গতি বাড়িয়েছেন। কৌশলী ব্যাটিংয়ে তিন অঙ্কের ম্যাজিক ফিগার ছুঁয়ে ফেলেন বেন কারান। ওয়ানডে ক্যারিয়ারে এটি কারানের দ্বিতীয় সেঞ্চুরি।
শেষ দিকে কারান এবং ইভান্সের ব্যাটে চড়েই ছুটেছে জিম্বাবুয়ের ইনিংস। পার করেছে ২০০ রানও। টাইগার বোলাররা কিছুটা বিবর্ণ ছিলেন। সেই ফায়দা লুটে রান বের করেছে জিম্বাবুয়ে। শেষ দিকে রানের গতি বাড়িয়েছেন ইভান্স। ধুমধাড়াক্কা ব্যাটিংয়ে রান বের করেছেন তিনি। শেষ ওভারে ছুঁয়ে ফেলেন ফিফটিও।
তাসকিনের করা শেষ ওভার থেকে ২২ রান নিয়েছেন ইভান্স। নির্ধারিত ২০ ওভারের খেলা শেষে ৬ উইকেট হারিয়ে ২৪৭ রানের পুঁজি দাঁড় করায় জিম্বাবুয়ে। ৩৮ বলে ৫৮ রান করে ইভান্স টিকে ছিলেন। ১৩৫ বলে ১১১ রান করে অপরাজিত ছিলেন বেন কারান। বাংলাদেশের হয়ে ২টি করে উইকেট শিকার করেছেন তাসকিন আহমেদ এবং মেহেদী হাসান মিরাজ। ১টি করে উইকেট নেন নাহিদ রানা এবং রিশাদ হোসেন।
জবাব দিতে নেমে শুরুটা অত ভালোভাবে করতে পারেনি বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। দুই ওপেনার সৌম্য সরকার এবং তানজিদ হাসান তামিমের ওপেনিং জুটিতে রান এসেছে কেবল ১৩। ৫ বলে ১০ রান করে সাজঘরে ফিরে যান সৌম্য। তিনে নেমে তানজিদের সাথে যোগ দিয়েছেন নাজমুল হোসেন শান্ত।
কিছুটা চালিয়ে খেলেছেন তানজিদ। শান্ত এগিয়েছেন দেখেশুনে। কার্যকরী ব্যাটিংয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছেন দুজন। এক প্রান্ত আগলে রেখে খেলে গিয়েছেন তানজিদ। শান্তও শুরুটা ভালোই করেছিলেন। তবে ইনিংস লম্বা করতে পারেননি। প্রথম পাওয়ারপ্লের মধ্যেই আরেক উইকেট হারিয়ে ফেলে বাংলাদেশ। ১৬ বলে ৯ রান করে দলের ৩৮ রানের মাথাতে বিদায় নেন নাজমুল হোসেন শান্ত।
চারে নেমেছেন তাওহিদ হৃদয়, যোগ দেন তানজিদ হাসান তামিমের সাথে। দুজনে মিলে শক্ত হাতে ধরেছেন দলের হাল। কার্যকরী ব্যাটিংয়ে দলের বোর্ডে রান তুলেছেন। বুদ্ধিদীপ্ত এবং কৌশলী ব্যাটিংয়ে এগিয়েছেন হৃদয়-তানজিদ। সুযোগ বুঝে বাউন্ডারি হাঁকিয়েছেন। সাথে বের করেছেন সিঙ্গেলও। তাতে দলের রানের চাকাও ছিল সচল। উইকেটের চারপাশে দারুণ সব শটে রান বের করেছেন হৃদয়-তানজিদ।
সময়ের সাথে সাথে ক্রিজে পোক্ত হয়েছে তানজিদ-হৃদয়ের জুটি। ফিফটির দিকে ছুটেছেন তানজিদ। হৃদয়ও সাবধানী ব্যাটিংয়ে রান বাড়িয়েছেন। ফিফটি ছুঁয়েছেন তানজিদ। তবে ফিফটির পর বেশি একটা আগাতে পারেননি। দলীয় ১২২ রানের মাথাতে ৭০ বলে ৫৭ রানের ঝলমলে ইনিংস খেলে সাজঘরে ফিরে যান তানজিদ হাসান তামিম।
এরপর হৃদয়ের সাথে যোগ দিয়েছেন নুরুল হাসান সোহান। দুজনের সাবলীল ব্যাটিংয়ে এগিয়েছে বাংলাদেশের ইনিংস। শুরু থেকে দেখেশুনে এগিয়েছেন সোহান। সুযোগ বুঝে বের করেছেন বাউন্ডারি। স্ট্রাইক রোটেট করেছেন সিঙ্গেল নিয়ে। আরেক প্রান্তে হৃদয়ও সেট হয়ে যান। তুলে নেন দারুণ এক ফিফটিও।
ফিফটির পর বেশি একটা আগাতে পারেননি তাওহিদ হৃদয়। দলের ১৬৯ রানের মাথাতে ৯০ বলে ৬০ রানের দারুণ এক ইনিংস খেলে সাজঘরে ফিরে যান হৃদয়। পরের ওভারেই ফিরেছেন ছয়ে নামা মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত। ৯ বলে ৭ রান করে সাজঘরে ফিরে যান মোসাদ্দেক।
এরপর সোহানের সাথে যোগ দিয়েছেন অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ। কার্যকরী ব্যাটিংয়ে দলকে জয়ের পথে টেনেছেন দুজন। ব্যাট হাতে সাবলীল ছিলেন মিরাজ-সোহান। সুযোগ বুঝে বাউন্ডারি বের করেছেন। সিঙ্গেল-ডাবল বের করে রানের চাকা সচলও রেখেছেন। ভালো খেলতে থাকা সোহান ফিফটির পথেই ছিলেন। তবে থেমেছেন ফিফটির আগে। ৪১ বলে ৩৮ রান করে সাজঘরে ফিরে যান সোহান। উড়িয়ে মারতে গিয়ে ধরা পড়েছেন বাউন্ডারিতে।
সোহানের বিদায়ে চাপে পড়ে যায় বাংলাদেশ। মিরাজের সাথে যোগ দেন রিশাদ হোসেন। ১৫ বলে ৮ রানের ইনিংস খেলা রিশাদ থেমেছেন দলের ২১৯ রানের মাথাতে। পরের ওভারেই ফিরেছেন তাসকিন আহমেদ। ২ বল খেলে রানের খাতা খোলার আগেই বিদায় নেন তাসকিন। চাপ আরও বেড়েছে বাংলাদেশের ওপর। তবে একই ওভারে শরিফুল ইসলামের মারা চারে চাপ কিছুটা কমেছে।
শেষ ৩ ওভারে বাংলাদেশের দরকার ছিল ১৭ রান, হাতে ২ উইকেট। ব্র্যাড ইভান্সের করা ৪৮তম ওভার থেকে ৩ রান নিয়েছে বাংলাদেশ, হারিয়ে ফেলে ১ উইকেট। ৪ বলে ৬ রান করে সাজঘরে ফিরে যান শরিফুল ইসলাম। ২ ওভার থেকে বাংলাদেশের লাগত ১৪ রান। তবে ৪৯তম ওভারের প্রথম বলেই আউট হয়েছেন মিরাজ। ২৩৪ রান করেই থেমেছে বাংলাদেশ। ১৩ রানে জয়লাভ করে জিম্বাবুয়ে।
জিম্বাবুয়ের হয়ে ৩ উইকেট শিকার করেছেন রিচার্ড এনগারাভা। ২টি করে উইকেট তোলেন ব্লেসিং মুজারাবানি এবং ব্র্যাড ইভান্স। ১টি করে উইকেট নেন সিকান্দার রাজা, ব্রায়ান বেনেট এবং ওয়েসলি মাধেভেরে। দারুণ এই জয়ের ফলে এক ম্যাচ হাতে রেখেই ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে গিয়ে সিরিজ জয় নিশ্চিত করলো জিম্বাবুয়ে।