কালবেলা ডেস্ক
প্রকাশ : ০২ মার্চ ২০২৬, ০১:৩৫ পিএম
আপডেট : ০২ মার্চ ২০২৬, ০৫:০৫ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যেসব অস্ত্র ব্যবহার করছে ইরান

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যেসব অস্ত্র ব্যবহার করছে ইরান

শনিবার ইরানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিহত হওয়ার পর তেহরান দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করে।

ইরান বলেছে, তারা ইসরায়েল এবং বিভিন্ন আরব দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে প্রতিশোধমূলক হামলা চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রতিশোধ নিতে ইরান যেসব অস্ত্র ব্যবহার করেছে বা তাদের হাতে কী কী অস্ত্র আছে, তা নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন করেছে কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম আল জাজিরা।

ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র

এ যুদ্ধে ইরানের অন্যতম হাতিয়ার হলো ক্ষেপণাস্ত্র। প্রতিরক্ষা-বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বৃহৎ ও সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় ক্ষেপণাস্ত্রের বহর রয়েছে ইরানের হাতে। এর মধ্যে ব্যালিস্টিক এবং ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের বহর এমনভাবে তৈরি যে, তাদের অত্যাধুনিক বিমানবাহিনী না থাকলেও দূর লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা রয়েছে। ইরানি কর্মকর্তারা ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে তাদের প্রতিরোধব্যবস্থার মূল স্তম্ভ হিসেবে উপস্থাপন করেন। এর একটি কারণ দেশটির দুর্বল বিমানবাহিনী। ইরানের বিমানবাহিনীর হাতে থাকা যুদ্ধবিমানগুলো বেশ পুরোনো।

পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা বাড়াচ্ছে এবং ভবিষ্যতে দেশটির পারমাণবিক সক্ষমতায় সহায়ক হয়ে উঠতে পারে। যদিও তেহরান এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

ইরানের একটি দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দুই থেকে আড়াই হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সক্ষম। এর অর্থ, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে এবং তার বাইরেও পৌঁছাতে সক্ষম।

স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র

ইরানের হাতে স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যেগুলো ১৫০ থেকে ৮০০ কিলোমিটার পর্যন্ত উড়ে গিয়ে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।

শত্রুর ওপর শুরুতেই দ্রুত আঘাত হানতে স্বল্পপাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো দারুণ কার্যকর। এগুলোর নকশাই করা হয়েছে কাছের সামরিক নিশানায় আঘাত করার এবং দ্রুত আঞ্চলিক হামলা চালাতে।

ইরানের স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ফাতেহ সিরিজের ক্ষেপণাস্ত্র জলফাগর, কিয়াম-১ ও পুরোনো শাহাব-১/২।

সংকটকালে স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে বড় অস্ত্র হয়ে ওঠে। কারণ, এগুলো দিয়ে একযোগে হামলা চালানো যায়। এ ছাড়া প্রতিপক্ষ সতর্ক হওয়ার সময় কম পায়, ফলে সেগুলো আগাম প্রতিহত হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

মাঝারিপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র

ইরানের মাঝারিপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো দেড় থেকে দুই হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে শাহাব-৩, এমাদ, ঘাদর-১, খোররামশাহর সিরিজ এবং সেজিল। পাশাপাশি আধুনিক নকশায় তৈরি খেইবার শেকান এবং হজ কাসেম ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে।

ইরানের মাঝারিপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইসরায়েল, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মার্কিন অবকাঠামোতে আঘাত হানতে সক্ষম।

ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র

ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র অপেক্ষাকৃত কম উচ্চতা দিয়ে উড়ে যায়। ফলে সেগুলো রাডার থেকে নিজেদের আড়াল করার ক্ষমতা রাখে। এ সুবিধার কারণে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিপক্ষের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষত যখন এগুলো ড্রোন বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে একযোগে ছোড়া হয়, তখন আকাশ সুরক্ষাব্যবস্থা অতিরিক্ত চাপে পড়ে যায়। ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের নকশা মূলত আকাশ সুরক্ষাব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতেই করা হয়েছে।

প্রতিপক্ষের জাহাজ এবং স্থলভাগে স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে সক্ষম ইরান। এই ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে রয়েছে সুমার, ইয়াআলি, কুদস সিরিজ, হোভেইজেহ, পাভেহ ও রা’আদ।

সুমার ক্ষেপণাস্ত্র আড়াই হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যে আঘাত হানতে পারে।

ড্রোন

ইরানের হাতে থাকা আরেকটি বড় অস্ত্র ড্রোন। এটি ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় ধীরগতির, কিন্তু দামে সস্তা এবং একবারে অনেকগুলোকে উৎক্ষেপণ করা যায়। একমুখী আক্রমণাত্মক ড্রোন ঢেউয়ের মতো আঘাত হানতে ব্যবহার করা যায়।

একটার পর একটা ড্রোন যখন আসতে থাকে, তখন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে।

এ ছাড়া ড্রোন হামলার মাধ্যমে বিমানবন্দর, বন্দর ও জ্বালানি স্থাপনাগুলোকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সতর্ক অবস্থায় রাখা যায়। ক্ষেপণাস্ত্রের বেলায় যেটা সম্ভব নয়। বিশ্লেষকদের মতে, যদি যুদ্ধ গভীর হয়, তবে ড্রোন ব্যবহার করে হামলার কৌশল আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র শহর

যুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সংঘর্ষে মূল প্রশ্ন হলো; ইরান কতক্ষণ পর্যন্ত আঘাত সহ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যেতে সক্ষম।

তেহরান দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির কয়েকটি অংশকে শক্তিশালী করতে কাজ করেছে। তারা দেশজুড়ে ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ, লুকানো ঘাঁটি এবং সুরক্ষিত উৎক্ষেপণকেন্দ্র তৈরি করেছে। এই নেটওয়ার্কের কারণে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ সক্ষমতাকে দ্রুত দুর্বল করা কঠিন হবে।

হরমুজ প্রণালিতে আনুষ্ঠানিকভাবে অবরোধ ছাড়াই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি সম্ভব

ইরানের প্রতিরক্ষা যুদ্ধ কেবল ভূমিতেই সীমাবদ্ধ নয়; উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালি ইরানের কৌশলগত যুদ্ধে এক বড় হাতিয়ার। নৌপথে বিশ্ববাণিজ্যের একটি বড় অংশ, বিশেষ করে তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে তেহরান চাইলে দ্রুত বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।

জাহাজ-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, জলজ মাইন, ড্রোন এবং দ্রুত আক্রমণে সক্ষম নৌযান পাঠিয়ে ইরান উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে নৌবাহিনী ও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা করে পারে।

এ ছাড়া ইরান নিজেদের হাইপারসনিক সিস্টেম হিসেবে পরিচিত কিছু প্রযুক্তি, যেমন ফাত্তাহ সিরিজ প্রদর্শন করেছে, যা খুব উচ্চগতিতে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম বলে দাবি করা হয়েছে; যদিও সেগুলোর কার্যক্রম সম্পর্কিত তথ্য স্বাধীনভাবে তেমন একটা পাওয়া যায় না।

হরমুজ প্রণালি আনুষ্ঠানিকভাবে অবরোধ ছাড়াও ইরান বৈশ্বিক বাজারে প্রভাব ফেলতে সক্ষম। ইরানের বিপ্লবী গার্ডের নামে যদি রেডিও সতর্কবার্তা দেওয়া হয়, তাহলেই তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে হরমুজ প্রণালির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে, এতে খরচ বাড়বে। পাশাপাশি যুদ্ধের ঝুঁকিবিমার খরচ বাড়াবে। সব মিলিয়ে পণ্য পরিবহনের খরচ অনেক বেড়ে যাবে।

বিপ্লবী গার্ড বলেছে, তারা তিনটি মার্কিন ও ব্রিটিশ তেলের ট্যাংকারে হামলা করেছে।

তেহরানের বার্তা

ইরানি কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল যদি ইরানের ভূখণ্ডে আক্রমণ করে, তা একটি সীমিত অভিযান হিসেবে নয়, বরং বিস্তৃত যুদ্ধের সূচনা হিসেবে গণ্য করা হবে। খামেনিকে হত্যার পর থেকে এ বার্তা আরও কঠোর হয়ে গেছে।

ইরানের বিপ্লবী গার্ড আরও প্রতিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং ইরান একবারে বড় আঘাতের পরিবর্তে ধারাবাহিকভাবে অভিযান পরিচালনার সংকেত দিচ্ছে। ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন বাহিনীও এ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
ঘটনাপ্রবাহ: ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলা
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

খাল নিয়ে আ.লীগ, বিএনপি ও জামায়াতের সংঘর্ষ

আর্জেন্টিনা সমর্থকদের জন্য ফ্রি চিকিৎসা ও বিশেষ ছাড় ঘোষণা চিকিৎসকের

ইসরায়েলি বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে আল-আকসায় জুমার নামাজে মুসল্লিদের ঢল

অস্ট্রেলিয়া সিরিজে জাতীয় দলে ফিরছেন সালাউদ্দিন

ঈশ্বরদীর লিচুর জন্য হিমাগার স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে : বাণিজ্যমন্ত্রী

কেন্দ্রীয় যুবদলকে স্বাগত জানিয়ে সাতক্ষীরায় জেলা যুবদলের র‍্যালি

চলতি মাসেই ভারতীয় হাইকমিশনারের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন দীনেশ ত্রিবেদী

বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৬ / সবুজ পরিবেশ, নিরাপদ কৃষি ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশই আমাদের প্রত্যাশা

প্রধানমন্ত্রীর লাল টেলিফোনের তার চুরি, ৫ দিনের রিমান্ডে দুই আসামি

বাংলাদেশে ১৫ বছর পর ওয়ানডে খেলতে এলো অস্ট্রেলিয়া

১০

সীমান্তবর্তী এলাকায় টহল ও নজরদারি জোরদার

১১

ব্রাজিলের বিখ্যাত ভবিষ্যৎদ্রষ্টার মতে এবার বিশ্বকাপ জিতবে পর্তুগাল

১২

দৌলতদিয়ার বাস ডুবির ঘটনায় দুটি তদন্ত কমিটি গঠন : নৌ প্রতিমন্ত্রী

১৩

আর্জেন্টিনার সামনে সেই পুরোনো অভিশাপ

১৪

তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থীদের পাশে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় : উপাচার্য 

১৫

বিশ্বকাপে ভুভুজেলা নিষিদ্ধ করল ফিফা, কঠোর হচ্ছে স্টেডিয়াম প্রবেশনীতি

১৬

ভেঙে গেল জার্মানীর বিশ্বকাপজয়ী তারকার দুই দশকের সংসার

১৭

আম খাওয়ার পর ভুলেও খাবেন না এই ৫ খাবার

১৮

অবশেষে ‘অলৌকিক’ সেই গাছ নিয়ে রহস্যের অবসান

১৯

অস্ত্র নামাবে না হামাস, সামরিক অস্ত্রভাণ্ডারের সিদ্ধান্তও আলোচনা ছাড়া নয়

২০
X