

কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে নিজের বাড়ি বিক্রি করে বিশ্বভ্রমণে বেরিয়ে পড়া যুক্তরাজ্যের ৬২ বছর বয়সী নারী লিন স্টিফেনসন এখন পর্যন্ত বিশ্বের ১৭৯টি দেশ ভ্রমণ করেছেন। তার লক্ষ্য ১৯৫টি দেশ সম্পূর্ণ করা। স্যুটকেস হাতে একা এই দীর্ঘ যাত্রায় তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং বহু গন্তব্যে, যেখানে অভিজ্ঞতা হয়েছে বিস্ময়, বিপদ এবং মানুষের আন্তরিকতার অনন্য গল্প।
২০২২ সালে নটিংহ্যামশায়ারের কার্লটনে নিজের বাড়ি ১ লাখ ৭৫ হাজার পাউন্ডে বিক্রি করেন লিন স্টিফেনসন। মর্টগেজ পরিশোধের পর হাতে থাকা অর্থ নিয়ে তিনি শুরু করেন টানা বিশ্বভ্রমণ। আগে থেকেই ভ্রমণের প্রতি গভীর ভালোবাসা থাকলেও কোভিড লকডাউনের অভিজ্ঞতাই তাকে পূর্ণকালীন ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নিতে অনুপ্রাণিত করে।
লিন জানান, লকডাউনের সময় পুরো পৃথিবী একসঙ্গে থেমে যাওয়ার বাস্তবতা তাকে নাড়িয়ে দেয়। সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি ঝুঁকি নিয়ে বেরিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নেন। তার মতে, জীবনের নিরাপত্তার চেয়ে অভিজ্ঞতাই তখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছিল।
ভ্রমণের দীর্ঘ পথচলায় তিনি নেপাল, ভুটান, থাইল্যান্ড, ইরাক, আফগানিস্তান, দক্ষিণ কোরিয়া, পাকিস্তান, সৌদি আরবসহ বহু দেশ ঘুরেছেন। সম্প্রতি তিনি প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র নাউরু ভ্রমণের পর ১৭৯ দেশের মাইলফলক স্পর্শ করেন।
লিন বলেন, পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি জায়গাতেই মানুষের সৌজন্য ও আতিথেয়তা তাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে। তার মতে, সংবাদমাধ্যমে নেতিবাচক খবরের ভিড়ে পৃথিবীকে অনেক সময় ভুলভাবে দেখা হয়, কিন্তু বাস্তবে এটি অধিকাংশই সদয় ও অতিথিপরায়ণ মানুষের বাসস্থান।
তিনি আরও বলেন, ভ্রমণ তাকে মানুষের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে দিয়েছে। তার ভাষায়, তিনি আর ইংল্যান্ডকে একমাত্র ঘর হিসেবে দেখেন না; বরং পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গাই এখন তার কাছে ঘরের মতো মনে হয়।
ভ্রমণকালে ইরান তার সবচেয়ে প্রিয় দেশ হয়ে ওঠে বলে জানান লিন। সেখানে নারীদের উচ্চশিক্ষা, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং মানুষের আন্তরিকতা তাকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। একইসঙ্গে আফগানিস্তান সফরকেও তিনি ভিন্ন অভিজ্ঞতা হিসেবে উল্লেখ করেন, যেখানে নিরাপত্তা পরিস্থিতি কঠিন হলেও মানুষের আচরণ ছিল উষ্ণ ও সহযোগিতাপূর্ণ।
তবে তার ভ্রমণজীবন সবসময় নিরাপদ ছিল না। কুক আইল্যান্ডসে এক দুর্ঘটনায় পাহাড়ি পথ থেকে নদীতে পড়ে যান তিনি। প্রায় তিন ঘণ্টা পথ হারিয়ে বিপদের মুখে পড়লেও শেষ পর্যন্ত নিজেই নিরাপদ স্থানে ফিরে আসেন। এ ধরনের অভিজ্ঞতাকে তিনি ভ্রমণের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখেন।
লিনের মতে, একা ভ্রমণ মানেই নিঃসঙ্গতা নয়। বরং এটি আত্ম-অন্বেষণের সুযোগ এবং বিশ্বের নানা প্রান্তে নতুন মানুষের সঙ্গে বন্ধন গড়ার পথ। বর্তমানে বিভিন্ন দেশে তার বহু বন্ধু তৈরি হয়েছে বলেও জানান তিনি।
বর্তমানে তার ভ্রমণ তালিকায় এখনও ১৬টি দেশ বাকি রয়েছে। এর মধ্যে উত্তর কোরিয়া খুললে সেখানে যাওয়ার ইচ্ছাও রয়েছে তার। তিনি আশা করছেন, আগামী বছরের মধ্যেই বিশ্বের সব দেশ ভ্রমণের লক্ষ্য পূরণ করতে পারবেন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে লিন জানান, অস্ট্রেলিয়া থেকে পূর্ব তিমুর, ব্রুনাই এবং বাংলাদেশ হয়ে এশিয়ার বাকি দেশগুলো ঘুরে দেখার পরিকল্পনা রয়েছে তার। এরপর আফ্রিকার কিছু দেশও তার তালিকায় রয়েছে।
বিশ্বভ্রমণের এই দীর্ঘ যাত্রা শেষে তিনি বলেন, ভ্রমণই তার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা—যেখানে মানুষ, সংস্কৃতি ও প্রকৃতির বৈচিত্র্য তাকে প্রতিনিয়ত নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে।