

ইরানে অর্থনৈতিক সংকট থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দেশটির ৩১টি প্রদেশের ২৭টিতেই ছড়িয়ে পড়েছে। টানা ১০ দিনের সহিংস বিক্ষোভে অন্তত ৩৬ জন নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এ আন্দোলনে প্রকাশ্য সমর্থন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এ জন্য একে বহির্বিশ্বের ইন্ধন হিসেবে দেখছে তেহরান। এর মধ্যে ইসরায়েলের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির দায়ে একজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে বলে দেশটির সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে ইরানের সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আমির হাতামি সতর্ক করে বলেছেন, বাইরের শক্তির হুমকি ইরান মেনে নেবে না এবং প্রয়োজনে তার জবাব দেবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে সমর্থন দেওয়ার প্রেক্ষাপটে তিনি এ মন্তব্য করেন।
হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে ৩৪ বিক্ষোভকারী এবং দুজন নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
ইরানি কর্তৃপক্ষ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিহতের মোট সংখ্যা প্রকাশ করেনি, তবে তিন নিরাপত্তা কর্মী নিহতের তথ্য জানিয়েছে। বিবিসি পারসিয়ান এখন পর্যন্ত ২০ জনের মৃত্যু ও পরিচয় নিশ্চিত করেছে।
এইচআরএএনএ আরও জানায়, বিক্ষোভ চলাকালে ৬০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন এবং ২ হাজার ৭৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ইরানের আধাসরকারি গণমাধ্যম জানায়, পশ্চিমাঞ্চলীয় ইলাম প্রদেশের মালেকশাহিতে ‘দাঙ্গাবাজদের’ গুলিতে এক পুলিশ সদস্য নিহত হন। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ওই এলাকায় ব্যাপক বিক্ষোভ ও নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমন অভিযান চলছে।
এর আগে, তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় নিরাপত্তা বাহিনীকে টিয়ার গ্যাস ছুড়তে দেখা যায়। বিক্ষোভকারীরা ইরানের ধর্মীয় শাসকদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছিল।
মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রার মূল্য হঠাৎ কমে যাওয়ায় গত ২৮ ডিসেম্বর ব্যবসায়ীরা তেহরানের রাস্তায় নেমে এলে এই বিক্ষোভ শুরু হয়।
গত এক বছরে রিয়ালের মূল্য ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে এবং মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা, পাশাপাশি দুর্নীতি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনা অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে তুলেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দ্রুত এই বিক্ষোভে যোগ দেন এবং তা অন্যান্য শহরেও ছড়িয়ে পড়ে।
গত শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে মার্কিন হস্তক্ষেপের হুমকি দেন এবং বলেন, ‘আমরা অভিযান চালাতে প্রস্তুত।’
পরদিন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বলেন, ‘দাঙ্গাবাজদের উচিত শিক্ষা দেওয়া দরকার’ এবং তিনি ‘শত্রুর কাছে নতি স্বীকার না করার’ অঙ্গীকার করেন।
এদিকে, ইরানে ইসরায়েলের হয়ে কাজ করার দায়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ব্যক্তির নাম আলি আরদেস্তানি বলেও বুধবার রয়টার্স তাদের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
ইসরায়েলের সঙ্গে কয়েক দশকের ছায়াযুদ্ধে আটকে পড়া ইরান ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সঙ্গে যোগসাজশ এবং ইরানে মোসাদের কার্যক্রমে সহযোগিতার দায়ে অসংখ্য মানুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম মিজানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘দেশের সংবেদনশীল তথ্য সরবরাহ করে মোসাদের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধে আলি আরদেস্তানিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, সুপ্রিম কোর্টের অনুমোদন ও সব আইনি প্রক্রিয়া শেষে তা কার্যকর করা হয়েছে।’
এর মধ্যে ইরানের সেনাপ্রধান জেনারেল হাতামি বলেন, ইরানি জাতির বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক বক্তব্যের তীব্রতা বৃদ্ধি ইরান হুমকি হিসেবে দেখছে এবং এর ধারাবাহিকতা কোনো জবাব ছাড়া সহ্য করা হবে না।
তিনি আরও বলেন, শত্রু যদি কোনো ভুল করে, তাহলে ইরানের প্রতিক্রিয়া গত জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে হওয়া ১২ দিনের যুদ্ধের চেয়েও কঠোর হবে।
মন্তব্য করুন