

যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে নতুন একটি তেল চুক্তিকে কেন্দ্র করে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এ চুক্তির ফলে একদিকে যেমন বৈশ্বিক তেলের দাম কমেছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘ধমক ও দাদাগিরির রাজনীতি’ করার অভিযোগ তুলেছে চীন।
গতকাল বুধবার বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ১ শতাংশ কমে যায়। এর পেছনে কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে, ভেনেজুয়েলার বিপুল পরিমাণ তেল আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন করে সরবরাহের সম্ভাবনা।
চুক্তির মূল বিষয় কী: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন জানিয়েছে, তারা ভেনেজুয়েলাকে রাজি করিয়েছে, যাতে দেশটি চীনের পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তেল বাণিজ্য করে। এই চুক্তির আওতায় ভেনেজুয়েলা প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা তেল যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাতে পারে। ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রথম ধাপে ভেনেজুয়েলায় আটকে থাকা প্রায় ৫ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল (২০০ কোটি ডলার মূল্যমান) পরিশোধন করে বাজারে বিক্রি করবে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ‘এই তেল বাজারদরে বিক্রি করা হবে এবং সেই অর্থ আমার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, যাতে তা ভেনেজুয়েলার জনগণ ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে ব্যবহার করা যায়।’ তবে ভেনেজুয়েলার পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তি নিশ্চিত করা হয়নি।
চীন কেন ক্ষুব্ধ: এই চুক্তির ফলে ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানিতে চীনের বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। কারণ চীন ছিল ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা। নতুন পরিস্থিতিতে চীনের জন্য নির্ধারিত তেলের চালান অন্যদিকে সরিয়ে নিতে পারে কারাকাস।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং এক সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের কড়া সমালোচনা করে বলেন, “ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য শক্তি প্রয়োগ এবং ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির নামে দেশটির তেলসম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ দাবি করা নিছক দাদাগিরি।”
তিনি আরও বলেন, এসব পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে, ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করছে এবং দেশটির জনগণের অধিকারকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
গত সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী আকস্মিক অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে নিউইয়র্কে নিয়ে যায়। এই অভিযান চলাকালে অনেক মানুষ নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।
ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তাদের অন্তত ২৩ জন সদস্য নিহত হয়েছেন। কিউবা দাবি করেছে, তাদের ৩২ জন সামরিক ও গোয়েন্দা সদস্য মারা গেছেন। মার্কিন গণমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোট প্রাণহানির সংখ্যা প্রায় ৭৫ জন হতে পারে।
৬৩ বছর বয়সী মাদুরো নিউইয়র্কের একটি আদালতে মাদক পাচারের অভিযোগে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কৌশল: মাদুরোকে সরিয়ে দেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র আপাতত তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের সঙ্গে কাজ করতে চায় বলে ইঙ্গিত দিয়েছে। অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা এবং মাদুরোর ‘অপহরণ’-এর নিন্দার মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করছেন।
ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, তাদের প্রধান লক্ষ্য এখন ভেনেজুয়েলার তেল খাত পুনরুজ্জীবিত করা। গণতান্ত্রিক নির্বাচন বা রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি আপাতত অগ্রাধিকার নয়।
বিরোধী দল ও ভবিষ্যৎ রাজনীতি: ভেনেজুয়েলার বিরোধী দলের নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো, যিনি গত বছর নোবেল শান্তি পুরস্কার পান, আপাতত ট্রাম্পের বিরোধিতা করছেন না। তিনি বরং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলে ভেনেজুয়েলাকে ‘আমেরিকার জ্বালানি কেন্দ্র’ বানানোর পক্ষে মত দিয়েছেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র সতর্ক করে দিয়েছে—মাদুরোর ঘনিষ্ঠ মন্ত্রী ও সামরিক নেতারা সহযোগিতা না করলে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ: চীন, রাশিয়া, কিউবা, ইরানসহ কয়েকটি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে। অনেক মার্কিন মিত্র দেশও একজন ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপ্রধানকে সরাসরি গ্রেপ্তার করার ঘটনাকে বিপজ্জনক নজির হিসেবে দেখছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলার তেলকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের এই আগ্রাসী নীতি শুধু লাতিন আমেরিকা নয়, বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যকেও নতুন করে নাড়িয়ে দিয়েছে।
মন্তব্য করুন