

নতুন বছরের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করেছে তথাকথিত ‘ডনরো ডকট্রিন’। এটি ১৮২৩ সালের সাম্রাজ্যবাদী মনরো ডকট্রিনের নতুন সংস্করণ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ নীতির মূল লক্ষ্য একটিই—বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সম্পদ, বিশেষ করে তেলের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলা, প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে অপহরণের পর থেকেই এ শব্দটি আলোচনায় আসে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এটি পশ্চিম গোলার্ধকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাববলয় তৈরির নীতি। বাস্তবে এটি তিন মহাদেশজুড়ে বিস্তৃত একটি বৈশ্বিক প্রস্তাববিস্তারকারী প্রকল্প, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী নীতিরই ধারাবাহিকতা।
তিন মহাদেশে তেল-রাজনীতি ও সামরিক আগ্রাসন: ২০১৪ সাল থেকে সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের তেলসমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোতে মার্কিন সেনারা অবস্থান করছে। আইএসবিরোধী যুদ্ধের অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে তেল উত্তোলন, বিক্রি এবং লাভ নিজেদের হাতে রেখে চলেছে। গত ১৩ ডিসেম্বর মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার ঘটনার পর আবারও সিরিয়ায় বিমান হামলা চালানো হয়।
নাইজেরিয়ায় ‘খ্রিষ্টান রক্ষা’র নামে বোমাবর্ষণ: আফ্রিকার সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদক দেশ নাইজেরিয়ায় ট্রাম্প প্রশাসন বড়দিনে বিমান হামলা চালায়। দাবি করা হয়, খ্রিষ্টানদের রক্ষার জন্য এ হামলা। বাস্তবে বিশ্লেষকদের মতে, এটি নাইজেরিয়ার বিপুল তেল সম্পদের ওপর প্রভাব বিস্তারের একটি কৌশল।
ইরানে বিক্ষোভে উসকানি ও যুদ্ধের হুমকি: ইরানে চলমান অর্থনৈতিক সংকট ও বিক্ষোভ কেন্দ্র করে ট্রাম্প প্রকাশ্যে প্রতিবাদকারীদের উৎসাহ দেন। এর মধ্যে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠেছে। ইরানের বিরুদ্ধে আরও ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ এবং সামরিক হামলার হুমকি দিয়ে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করা হয়েছে।
ভেনেজুয়েলা ও গ্রিনল্যান্ডে তেলের জন্য নতুন লক্ষ্য : বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেল মজুতের দেশ ভেনেজুয়েলা। সেখানে মার্কিন হামলা ও মাদুরোকে অপসারণের পর ট্রাম্প ঘোষণা দেন যুক্তরাষ্ট্র দেশটি ‘পরিচালনা’ করবে। অন্যদিকে, তেল ও খনিজসমৃদ্ধ গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকিও দিয়েছেন তিনি, যা আন্তর্জাতিক আইনে নজিরবিহীন।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি, তেলের জন্য অভ্যুত্থান: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে তেলনির্ভর দেশগুলোতে মার্কিন হস্তক্ষেপ নতুন কিছু নয়।
১৯৪৯ সালে সিরিয়ায় তেল পাইপলাইন (ট্যাপলাইন) নির্মাণে বাধা দেওয়ায় গণতান্ত্রিক সরকার উৎখাত, ১৯৫৩ সালে ইরানে তেল জাতীয়করণের কারণে প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেককে সিআইএ-মিআই৬ যৌথ অভ্যুত্থানে অপসারণ এবং ব্রাজিল, চিলি, পেরু, গায়ানাসহ বহু দেশে খনিজ ও তেলের জন্য মার্কিন সমর্থিত সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানো হয়েছে।
ডনরো নীতির মূল উদ্দেশ্য কী: বিশ্লেষকদের মতে, ডনরো নীতির দুটি প্রধান লক্ষ্য—বিশ্ব তেলের দাম ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ এবং ডলারের আধিপত্য বজায় রেখে চীনের অর্থনীতিকে চাপে রাখা। ‘ডনরো ডকট্রিন’ আসলে কোনো নতুন নীতি নয়—এটি যুক্তরাষ্ট্রের শতবর্ষ পুরোনো সাম্রাজ্যবাদী তেল-রাজনীতির আধুনিক রূপ।
মন্তব্য করুন