

এক-দুই ঘণ্টার বৃষ্টিপাতেই ঢাকা তলিয়ে যাচ্ছে—এটা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। ঢাকায় মাঝারি বৃষ্টিপাত হলেও সেই পানি ধারণের ক্ষমতা এ শহরের নেই। এটি আসলে দীর্ঘদিনের নগরায়ণের নামে যে দুর্বৃত্তায়ন হয়েছে, তার অবসম্ভাবী পরিণতি। ঢাকার মতো শহরে মৌসুমে অনেক বৃষ্টিপাত ছাড়াও সারা বছরই কমবেশি বৃষ্টিপাত হয়। এ ধরনের শহরে বৃষ্টিপাত ধারণ করার জন্য প্রাকৃতিকভাবেই যেসব সবুজ এলাকা এবং জলাশয়-জলাভূমি ছিল, সেগুলো আমরা ধ্বংস করেছি। একসময় প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল অনেক খাল-জলাশয়-জলাধার ও পুকুর।
যেগুলো ছিল আমাদের জন্য আশীর্বাদ। আবাসনের নামে সেগুলো ধ্বংস করা হয়েছে।
ঢাকার সবুজ এলাকা একসময় ৩০ ভাগের মতো থাকলেও এখন কমতে কমতে পাঁচ ভাগে নেমেছে। জলাশয়-জলাভূমিও কমতে কমতে কেন্দ্রীয় এলাকায় পাঁচ ভাগে নেমেছে। অথচ ঢাকার মতো নগরীতে ২৫ থেকে ৩০ ভাগ সবুজ এলাকা এবং ১০ থেকে ১৫ ভাগ জলাভূমি দরকার ছিল। ৩৫ থেকে ৪০ ভাগ সবুজ এলাকা বা গ্রিন ব্লু নেটওয়ার্কের সক্ষমতা ছিল এ ধরনের বৃষ্টিপাত ধারণ করার। সেটি আমরা রক্ষা করতে পারিনি; নগরারণের নামে তা নষ্ট করে ফেলেছি। এটি হচ্ছে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের সুযোগটা নিয়ে। প্রভাবশালী লোকজনই এ দখলগুলো করেছেন।
এখন হঠাৎ করে শুধু কৃত্রিম ব্যবস্থাপনা বা কৃত্রিম ড্রেন বানিয়ে এবং খালকে বক্সে পরিণত করে বক্স কালভার্ট করলাম। সেই ড্রেনগুলোও প্লাস্টিক বা অন্য আবর্জনায় পরিপূর্ণ। এটি আমাদের মেনে নিতে হবে যে, মূল ঢাকা শহরে বৃষ্টিপাত হলে কিছু সময়ের জন্য জলাবদ্ধতা হবেই। তবু আমাদের করণীয় আছে। বিদ্যমান সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহারটা করতে হবে। এই পানি নামার জায়গা বা জলাশয়ের সঙ্গে আমাদের যে আউটফল বা নদীগুলো পড়বে, সেই সংযোগগুলো নিয়ে অনেক কাজ করার আছে। ড্রেনগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করতে পারলেও ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ক্যাপাসিটি ইমপ্রুভমেন্ট সম্ভব।
খালগুলোতে আমরা নাগরিকরাই ময়লা ফেলে ভরাট করে ফেলছি। একদিকে সিটি করপোরেশন পরিষ্কার করছে, অন্যদিকে নাগরিকরা ভরাট করছেন। এ থেকে মুক্তি পেতে হলে কমিউনিটিভিত্তিক কার্যক্রম এগিয়ে নিতে হবে। আমাদের অঙ্গীকার করতে হবে খালগুলোকে আমরা প্রবহমান রাখব এবং সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলব না। এ ছাড়া আমাদের মেজর ওয়াটার ফ্লো যেগুলো আছে, সেগুলোকে রক্ষা করার ব্যাপারে আন্তরিক হতে হবে। মানে শুধু প্রকৌশলগত সমাধান সবকিছু না। প্রকৌশলগত ব্যবস্থার সঙ্গে কমিউনিটির অংশীদারত্বও গুরুত্বপূর্ণ। এভাবে সমন্বিত কাজ করতে পারলে ঢাকার জলাবদ্ধতা থেকে কিছুটা পরিত্রাণ সম্ভব।
নগরায়ণের যে বড় পাপ আমরা করেছি, সেটি দিয়ে ঢাকায় জলাবদ্ধতা মুক্ত করা সম্ভব নয়। উল্টো ঢাকার আশপাশ এলাকার খালগুলো দখলের শিকার হচ্ছে। পানি নিষ্কাশনের এ ফ্ল্যাট ফ্লো জোন নির্বিচারে দখল হচ্ছে। আবাসনের নামে এসব হচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি সব পর্যায়ে যদি আমরা নগরায়ণের সঙ্গে এ বৃষ্টির পানি ধারণ এবং সবুজের সংরক্ষণকে মেলাতে পারি, তাহলে ঢাকার জলাবদ্ধতার প্রকোপ কিছুটা কমাতে পারব। সার্বিক বিচারে আমাদের নগর পরিকল্পনার যে দর্শন, সেটা যেন আগামীদিনের নগরায়ণের ক্ষেত্রে একটু খেয়াল করি।
লেখক: নগর-পরিকল্পনাবিদ; অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ; সভাপতি, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)।