

বিচারাধীন বিভিন্ন মামলায় আটকা রয়েছে দেশের ব্যাংক খাতের প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা। এর বাইরে উচ্চ আদালতে রিটের কারণে আটকে আছে আরও ১ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা। এসব অর্থ উদ্ধারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে স্পষ্ট পরিকল্পনা চেয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। শুধু তাই নয়, আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে খেলাপি দেখানো যাচ্ছে না প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের অনেককে। এজন্য প্রয়োজনে রিট করতে নির্দিষ্ট ডাউন পেমেন্টের ব্যবস্থা করা যায় কি না, সে বিষয়ে কাজ করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। প্রধান বিচারপতি এবং রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করে সংশ্লিষ্ট আইনে এ ধরনের কোনো বিধান যুক্ত করা যায় কি না, সে বিষয়ে কাজ শুরু করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক বিশেষ সভায় এসব বিষয়ে আলোচনা হয় বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র। ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক নির্বাহী পরিচালক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব, অর্থ উপদেষ্টা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান আর্থিক কর্মকর্তারা (সিএফও)।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, দেশের প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার পর তা আর পরিশোধ করতে চান না। এজন্য তারা সাধারণত সবচেয়ে বেশি সংশ্লিষ্ট আইনের অপব্যবহারের চেষ্টা করেন। তাই আইনের অপব্যবহার ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের চিন্তা করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। বিশেষ করে, বর্তমানে ঋণখেলাপির তালিকায় না ওঠা থেকে থেকে বাঁচতে বা বিশেষ সুবিধা নিতে উচ্চ আদালতে রিটের যে খরচ রয়েছে, তা বাড়ানোর চিন্তা চলছে। একই সঙ্গে খেলাপি হওয়া থেকে বাঁচতে কেউ রিট করতে গেলে অন্তত ৬-১০ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট হিসেবে পরিশোধের শর্ত যুক্ত করা যায় কি না, সে বিষয়েও আইনের ব্যাখ্যা চাইবে মন্ত্রণালয়। এ ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতি এবং রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে আলোচনা করে সংশ্লিষ্ট আইনে সংস্কার আনার বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
শুধু তাই নয়, খেলাপি ঋণ-সংক্রান্ত গ্রাহকদের মামলা, আপিল বা অন্যান্য ক্ষেত্রেও ডাউন পেমেন্টের বিধান রাখার চিন্তা করা হচ্ছে। অর্থাৎ, কোনো ঋণখেলাপি তার ঋণ-সংক্রান্ত যে কোনো রাষ্ট্রীয় সুবিধা গ্রহণ করতে গেলেই দিতে হবে নির্দিষ্ট পরিমাণ ডাউন পেমেন্ট। এতে খেলাপিদের ভবিষ্যতে যাতে বাধ্য হয়েই ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে হয়, তেমন পরিস্থিতি তৈরি করতে চায় অর্থ মন্ত্রণালয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘খেলাপিরা সাধারণত বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে পার পেয়ে যেতে চায়। এজন্য সরকার মনে করছে, যে কোনোভাবেই হোক খেলাপিদের বেঁচে যেতে চাওয়ার ফাঁকফোকর বন্ধ করতে হবে। যাতে তারা আইন বা অন্য কোনো ফাঁকফোকর ব্যবহার করে বেঁচে যেতে না পারে।’
এদিকে, বিভিন্ন অভিযোগে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের ব্যবসা সংক্রান্ত জব্দ হওয়া (ফ্রিজ) সব ব্যাংক হিসাব খুলে দেওয়ার চিন্তা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এজন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সভায় ব্যবসায়ীদের হিসাব খুলে দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি অর্থ উপদেষ্টা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত অর্থঋণ আদালতে মোট মামলা হয়েছে ২ লাখ ৫৩ হাজার ৯১টি। এসব মামলার বিপরীতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পাওনা দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৩ হাজার ২৪২ কোটি টাকা। এগুলোর মধ্যে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৭০ হাজার ৩৪৩টি। শুধু এই মামলাগুলোতেই আটকে আছে প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। অথচ এত বিপুল টাকার বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র ৬ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা, যা মোট পাওনার মাত্র ৩ শতাংশ।
এক হাজার ৮৬ জন ঋণগ্রহীতার ১ লাখ ৬৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে নিয়মিত ঋণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। তালিকায় থাকা প্রতিজনের কাছে গড় পাওনা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা। এর বাইরে দৃশ্যমান খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৩০ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা। অথচ গত বছরের জুনে এ অঙ্ক ছিল মাত্র ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, গত ৮-১০ বছর দেশের ব্যাংক খাতে বিস্তর লুটপাট হয়েছে। এসব অনিয়মে আমলা থেকে শুরু করে ব্যাংকের অনেক কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন। কিন্তু অবসরে চলে যাওয়ার কারণে তারা অনেকাংশেই দায়মুক্তি পেয়ে যাচ্ছেন। এমন প্রেক্ষাপটে সরকার ঋণ কেলেঙ্কারিতে জড়িত কর্মকর্তারা কর্মরত অবস্থায় এবং অবসরে গেলে কী ধরনের শাস্তি ভোগ করতে হবে সে বিষয়ে স্পষ্ট নীতিমালা তৈরি করতে চাচ্ছে। ভবিষ্যতে যাতে কোনো কর্মকর্তা অনিয়মে সম্পৃক্ত হতে না পারেন সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে আইন পরিবর্তনেরও চিন্তা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কালবেলাকে বলেন, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে ঋণ জালিয়াতির যেসব ঘটনা ঘটেছে তার মধ্যে অল্প সংখ্যক কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন, যাদের অনেকেই এখন অবসরে চলে গেছেন। মূলত ঋণ জালিয়াতিতে জড়িত হওয়ার পর কেউ অবসরে গেলে অনেকটাই দায়মুক্তি পান। এজন্য ব্যাংকগুলোও অনেক সময় কর্মকর্তাদের বাঁচাতে বিভিন্ন ধরনের কৌশল অবলম্বন করে তার অবসর পর্যন্ত অপেক্ষা করে। এসব বিষয় এড়াতে কোনো কর্মকর্তা জালিয়াতিতে জড়িত হলে চাকরিরত অবস্থা এবং অবসরে গেলে কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়, সে বিষয়ে চিন্তা করে আইনে পরিবর্তন আনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সেক্ষেত্রে জালিয়াতিতে জড়িত অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সার্ভিস বেনিফিট বাতিলের মতো কঠিন সিদ্ধান্তও আসতে পারে।’
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে লুটপাটের শিকার হয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শরিয়াহভিত্তিক ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা। সেক্ষেত্রে ভবিষ্যতে জালিয়াতির ঋণ এড়াতে কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়, সে বিষয়ে ব্যাংকারদের কাছ থেকে পরামর্শও চাওয়া হয়েছে। অর্থাৎ আগামীতে যাতে কোনোভাবেই ঋণ জালিয়াতিতে কর্মকর্তারা জড়িত না হন, সে বিষয়ে বিস্তারিত পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের সুশাসন নিশ্চিতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়েছে।
অর্থ উপদেষ্টা মনে করেন, শুধু বোর্ড চেয়ারম্যান (পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান) বা একক ব্যক্তির উদ্যোগে লুটপাট সম্ভব নয়। এজন্য বোর্ড, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ও কর্মকর্তাদের জড়িত থাকতে হয়। তাই প্রত্যেক ক্ষেত্রেই কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়, তা নিশ্চিত করতে বলেন তিনি। উদাহরণ টেনে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ‘জনতা ব্যাংকে অনিয়মের জন্য অনেকেই শুধু আবুল বারকাতকে দায়ী করছেন। তিনি অবশ্যই এর জন্য বড়ভাবে দায়ী। কিন্তু তাকে সে সময় যারা অনিয়মে উৎসাহিত করেছে বা পরামর্শ দিয়েছে, তাদেরও দায়ীর তালিকায় নিয়ে আসতে হবে। তাহলেই ভবিষ্যতে ঋণ জালিয়াতি বন্ধ করা সম্ভব।’
এদিকে, তারল্য সংকটে থাকা ব্যাংকগুলো উচ্চসুদে আমানত সংগ্রহ শুরু করেছে। দেশের ব্যাংক খাতের আমানতের সিংহভাগই বর্তমানে উচ্চসুদে নেওয়া। এসব আমানত ভবিষ্যতে ব্যাংকগুলোর জন্য বড় বোঝা হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। সেক্ষেত্রে দেশের ব্যাংক খাতে উচ্চ সুদের আমানত দ্রুতই কমিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা। আর এজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি।
এ ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো সরকারকে বিভিন্ন ধরনের সেবা দিয়ে থাকে, যেসব সেবার জন্য সাধারণত ব্যাংকগুলোকে কোনো বেনিফিট দেওয়া হয় না। এজন্য ব্যাংকগুলো সরকারের কাছে ওইসব সেবার বিপরীতে বেনিফিট হিসেবে সুবিধা চেয়েছে বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।