

নির্ভরযোগ্য ও মানসম্পন্ন পরিসংখ্যান তৈরির জন্য নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে বিশ্বব্যাংকের ঋণে একটি উন্নয়ন প্রকল্প নিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য একটি আধুনিক ও সমন্বিত জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং বিবিএস ও অন্যান্য তথ্য উৎপাদনকারী সংস্থার সক্ষমতা বাড়ানো, যাতে তারা সঠিক, সময়োপযোগী ও নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান তথ্য তৈরি, ব্যবস্থাপনা ও প্রচারে সক্ষম হয় এবং স্বচ্ছতা ও প্রমাণভিত্তিক নীতিনির্ধারণে সহায়তা দিতে পারে। কিন্তু বিবিএসের সক্ষমতা বা দক্ষতা বাড়াতে বিশ্বব্যাংকের ঋণে নেওয়া প্রকল্পের বিভিন্ন খাতের ব্যয় নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঋণের টাকায় এ প্রকল্পের আওতায় সাবান, টয়লেট ক্লিনার, হ্যান্ডওয়াশসহ বিভিন্ন ধরনের স্যানিটারি সামগ্রী কিনবে বিবিএস, যদিও এসব সামগ্রী কেনার কথা প্রতিষ্ঠানটির রাজস্ব বাজেটের টাকায়।
‘পরিসংখ্যানগত সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়ন প্রকল্পে’ (এসসিইএমপি) এমন কেনাকাটা করতে চায় বিবিএস। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ১ হাজার ৯৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হবে ১ হাজার কোটি টাকা, বাকি ৯৬ কোটি টাকা দেবে বাংলাদেশ সরকার। এ বছর শুরু করে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করতে চায় বাস্তবায়নকারী সংস্থা বিবিএস।
আলোচ্য প্রকল্পের বিভিন্ন খাতের ব্যয় পর্যালোচনায় দেখা গেছে, শুধু স্যানিটারি সামগ্রী নয়, পরিসংখ্যানগত সক্ষমতা এবং কর্মকর্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নেওয়া প্রকল্পের ঋণের টাকায় বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অফিস কক্ষ আধুনিকায়ন করা হবে, অত্যধিক ব্যয়ে কেনা হবে ট্যাব। যানবাহনসহ বিভিন্ন মেরামত, সম্মানী, পরামর্শক, ভ্রমণ ভাতাসহ বিভিন্ন খাতের অযৌক্তিক ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রকল্পের বিভিন্ন খাতের অযৌক্তিক ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায়ও। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ জুন বিবিএসের আলোচ্য প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রকল্প প্রস্তাব (টিএপিপি) বিভিন্ন খাতের ব্যয় পুনর্মূল্যায়নের শর্ত জুড়ে দিয়ে একনেকে অনুমোদন দেওয়া হয়। শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ শুরু করা যাবে না।
কমিশন সূত্রে জানা গেছে, একনেকের নির্দেশনা অনুযায়ী গত ২৮ সেপ্টেম্বর টিএপিপি পুনর্গঠন করে পাঠায় বিবিএস। তবে সেখানে একনেকের নির্দেশনা সম্পূর্ণভাবে প্রতিপালন হয়নি। কোনো খাতে কমিয়ে, কোনো খাতে বাড়িয়ে টিএপিপি পুনর্গঠন করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে একনেকে পুনর্মূল্যায়নের নির্দেশনা পরিপূর্ণভাবে প্রতিপালন না করায় প্রকল্পটি আবারও ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং নির্দেশনা অনুযায়ী ঠিক করে পাঠাতে বলা হয়েছে।
পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ কালবেলাকে বলেন, পরিসংখ্যান ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ, সেজন্য একনেকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রকল্পে বেশ কিছু খাতের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন থাকায় পুনর্মূল্যায়ন করে পাঠাতে বলা হয়েছিল। নির্দেশনা অনুযায়ী তারা প্রকল্পটি পুনর্গঠন করে পাঠিয়েছিল, কিন্তু ঠিকভাবে পুনর্মূল্যায়ন না হওয়ায় আবারও ফেরত পাঠানো হয়েছে। অযৌক্তিক কোনো কিছু অনুমোদন দেওয়া হবে না।
প্রকল্পের ব্যয় বিভাজন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সাবান, হ্যান্ডওয়াশ, গ্লাস ক্লিনার, ফ্লোর ক্লিনার, পর্দা, ফেসিয়াল, টয়লেট টিস্যুসহ বিভিন্ন ধরনের স্যানিটারি সামগ্রী কিনতে খরচ ধরা হয়েছে ৩৬ লাখ ২৯ হাজার টাকা। এ ছাড়া প্রকল্পের আওতায় ২৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকায় ৮ হাজার ১০০টি ট্যাব কিনতে চায় বিবিএস। অর্থাৎ ৭ থেকে ৮ ইঞ্চি ডিসপ্লের প্রতিটি ট্যাবের দাম ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার টাকা। অথচ দুই বছর আগে জনশুমারি ও গৃহগণনা প্রকল্পে জরিপের জন্য প্রতিটি ট্যাব কেনা হয়েছিল মাত্র ১১ হাজার ৩৩৬ টাকায়, যার বেশিরভাগ এখন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে।
প্রকল্পের ব্যয় কাঠামোতে দেখা যায়, বিভিন্ন রাজস্ব ও মূলধনি খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রকল্পের রাজস্ব উপখাতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৮৫ কোটি ৮৫ লাখ ১৭ হাজার টাকা, আর মূলধনি উপখাতে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ২৯০ কোটি ৫৪ লাখ ৩ হাজার টাকা। সবচেয়ে বেশি ব্যয় ধরা হয়েছে জরিপ খাতে, ৪২৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। পরামর্শক খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১১৮ কোটি টাকা। প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ ৯৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এর মধ্যে স্থানীয় প্রশিক্ষণে ৮৪ কোটি ১ লাখ এবং বিদেশ প্রশিক্ষণে ১০ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। বিভিন্ন ধরনের আইসিটি সরঞ্জাম কেনায় ৭৯ কোটি ৪৯ লাখ, কম্পিউটার ও সংশ্লিষ্ট উপকরণে ১২৮ কোটি ৭৮ লাখ, বৈদ্যুতিক সরঞ্জামে ১ কোটি ৩৮ লাখ, অফিস সরঞ্জাম কেনায় ১৪ কোটি ১৩ লাখ, আসবাব বাবদ ৪ কোটি ৩ লাখ, অন্যান্য যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম খাতে ১০ কোটি ৮০ লাখ, কম্পিউটার সফটওয়্যার উন্নয়ন ও ক্রয়ে ৫১ কোটি ৮৯ লাখ, কম্পিউটার কনজ্যুমেবলস ৩ কোটি ৮৩ লাখ, প্রিন্টিং ও বাইন্ডিং ১৫ কোটি ২৫ লাখ, ডাকটিকিট ও সিল ৫ লাখ ৭৫ হাজার, অন্যান্য স্টেশনারি ১০ কোটি ৩৫ লাখ, স্টোর ব্যবহারে ৩৬ লাখ ২৯ হাজার, ফ্যাক্স ও ইন্টারনেট খাতে ৫ কোটি ৮৮ লাখ, টেলিফোন ও মোবাইল খাতে ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা চাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ভ্রমণ খরচ ৪৫ কোটি ৯৬ লাখ, সেমিনার, কনফারেন্স ও ওয়ার্কশপ বাবদ ১১ কোটি ৫৮ লাখ, যানবাহন ভাড়ায় ৯ কোটি ৮ লাখ, মোটরযান রক্ষণাবেক্ষণে ২ কোটি ৯৫ লাখ, পেট্রোল, তেল ও লুব্রিকেন্ট বাবদ ৫ কোটি ৫৩ লাখ, গ্যাস ও জ্বালানি ৫৫ লাখ, বিজ্ঞাপন খাতে ৭ কোটি ৪৭ লাখ, সম্মানী বাবদ ৫ কোটি ১১ লাখ, বিনোদন খাতে ১ কোটি ২ লাখ, আউটসোর্সিং খাতে ৩ কোটি ৭ লাখ, ভেন্যু ভাড়ায় ২ কোটি ৯৬ লাখ, অনিয়মিত মজুরি বাবদ ২ কোটি ১২ লাখ, এনআইডি পরীক্ষা ফি ২ কোটি ১০ লাখ, পরিবহন খাতে ২৬ লাখ, কপি চার্জ ১৬ লাখ, ব্যাংক চার্জ ৫ লাখ, ওভারটাইম বাবদ ৭ লাখ ৩০ হাজার এবং বই-পত্রিকা কেনায় ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
বিভিন্ন মেরামত ও পুনর্নির্মাণ খাতেও ব্যয় ধরা হয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। এর মধ্যে বিবিএসের মহাপরিচালকসহ অন্যান্য কর্মকর্তার অফিস কক্ষ সাজাতে ৮ কোটি ৭০ লাখ, ফার্নিচার মেরামতে ১৫ লাখ, কম্পিউটার মেরামতে ২৮ লাখ, অফিস সরঞ্জাম মেরামতে ২৬ লাখ এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম মেরামতে ২৬ লাখ টাকা খরচ ধরা হয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্পের ফিজিক্যাল ও মূল্য কন্টিনজেন্সি খাতে ২০ কোটি টাকা সংরক্ষিত রয়েছে, যা অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হবে।
প্রকল্পের ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা ও বিবিএসের উপপরিচালক মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, এটা এখনো প্রক্রিয়াধীন। বিভিন্ন খাতের অযৌক্তিক ব্যয় প্রস্তাবের বিষয়ে তিনি বলেন, আমি নতুন যোগদান করেছি, যারা এটা তৈরি করেছেন তারা ভালো বলতে পারবেন। তবে আমি যতটুকু জানি, সব বিভাগের কাছ থেকে স্পেসিফিকেশন ও রিকুইজিশন নিয়ে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।
অতিমাত্রায় প্রকল্পনির্ভর বিবিএস: সরকারি জরিপভিত্তিক তথ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। প্রায় সব সরকারি সিদ্ধান্তই নির্ভর করে এ সংস্থার তথ্যের ওপর। অথচ সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিবিএসের তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা এবং অতিরিক্ত প্রকল্পনির্ভরতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে সরকার এবং ব্যবহারকারীদের মধ্যে। খোদ বিবিএস সংস্কারের জন্য গঠিত টাস্কফোর্সও বলছে, অতিমাত্রায় প্রকল্পনির্ভর সংস্কৃতির কারণে বিবিএস মূল কাজ নিয়মিত ও নিরপেক্ষ পরিসংখ্যান প্রণয়ন থেকে বিচ্যুত হয়েছে। টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে বিবিএস এমন এক প্রকল্পনির্ভর সংস্কৃতির মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে, যা বিবিএসের কর্মকর্তাদের মধ্যে অস্বাস্থ্যকর প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করেছে এবং সদর দপ্তর কেন্দ্রিক কর্মপদ্ধতির ফলে মাঠপর্যায়ে দুর্বলতা তৈরি করেছে। ২০০৬-০৭ অর্থবছরের দিকে তহবিল অনিশ্চয়তার কারণে বিবিএসকে দাতানির্ভর হতে হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে নির্ভরতা প্রকল্প সংস্কৃতিতে পরিণত হয়।
প্রতিবেদনে টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বিবিএসকে একটি আধুনিক, পেশাদার ও স্বাধীন জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থায় রূপান্তর করতে হলে প্রকল্পনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে একটি স্থায়ী কাঠামো ও নীতিগত সংস্কার প্রয়োজন।