

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের বগুড়ার বড়গোলা শাখা আফাকু কোল্ড স্টোরেজ লিমিটেডের নামে খেলাপি ৩৮ কোটি ৪ লাখ ৭৬ হাজার টাকা পরিশোধে ‘কল ব্যাক নোটিশ’ জারি করেছে। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না এবং তার অংশীদার জুলাই গণহত্যায় ৯ মামলার পলাতক আসামি ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি এ বি এম নাজমুল কাদির শাজাহান চৌধুরী। গত বুধবার ইসলামী ব্যাংক, বগুড়া শাখাপ্রধান মো. তৌহিদ রেজা স্বাক্ষরিত এ নোটিশ পাঠানো হয়। নোটিশে বলা হয়েছে, আগামী ১৮ ডিসেম্বরের মধ্যে বকেয়া পরিশোধ না হলে ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইসলামী ব্যাংকের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, আফাকু কোল্ড স্টোরেজ একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও মান্না ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ করেননি। বারবার নোটিশ দেওয়া হলেও টাকা পরিশোধের কোনো চেষ্টাও করেননি তিনি।
ব্যাংকের নোটিশ অনুযায়ী, ২০১০ সালে ২২ কোটি টাকার বিনিয়োগ অনুমোদন করা হলেও, মুনাফা, চার্জ ও জরিমানা পরিশোধ না করায় বর্তমানে মোট বকেয়া দাঁড়িয়েছে ৩৮ কোটি ৪ লাখ ৭৬ হাজার টাকা।
ইসলামী ব্যাংক জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বরের মধ্যে বকেয়া পরিশোধ না হলে তারা আইনি ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে।
ব্যাংকের নোটিশে বলা হয়, ‘ইতোপূর্বে আপনাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে ষষ্ঠবারের মতো পুনঃতফশিল করে দিয়েছিল, কিন্তু পুনঃতফশিলের পরও প্রতিশ্রুতি মোতাবেক আপনারা পুনঃতফশিলের কিস্তির টাকা ব্যাংকে জমা দেননি বা আপনাদের দায় পরিশোধ করেননি, যা খুবই হতাশাজনক। উল্লেখ্য যে, নিয়মিত ব্যাংকের কিস্তির টাকা জমা দিলে ২০১৭ সালের মধ্যে প্রকল্পের দায় পরিশোধ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে লক্ষ করছি যে, লাভজনক একটি প্রকল্প থেকে শুধু সদিচ্ছার অভাবে ব্যাংকের দায় পরিশোধ না হয়ে প্রকল্পের দায় ৩৮৪.৭৬ মিলিয়ন টাকা দাঁড়িয়েছে।’
বগুড়া শাখাপ্রধান তৌহিদ রেজা স্বাক্ষরিত নোটিশে আরও বলা হয়, ‘মঞ্জুরিপত্রের নিয়মানুযায়ী প্রতিটি ডিলে নির্ধারিত তারিখের মধ্যে কিস্তির টাকা পরিশোধের কথা থাকলেও আপনাকে/আপনাদেরকে মৌখিকভাবে, ব্যক্তিগতভাবে ও মোবাইল ফোনে বারবার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও আপনি/আপনারা তা পরিশোধ করেননি। ইতোপূর্বে আপনাকে লিখিতভাবে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে, তবুও আপনারা বিনিয়োগের দায় পরিশোধ করেননি। আপনার/আপনাদের লেনদেনের পরিস্থিতি দেখে আমাদের কাছে অনুমিত হচ্ছে যে, আপনার/আপনাদের সঙ্গে আমাদের আর ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সুতরাং আপনাদের সব দায়-দেনা পরিশোধ করার জন্য কল ব্যাক নোটিশ দেওয়া হলো। অতএব, আগামী ১৮ ডিসেম্বরের মধ্যে বিনিয়োগের সমুদয় দায় ৩৮৪.৭৬ মিলিয়ন টাকা পরিশোধ করে হিসাবসমূহ নিষ্পত্তি করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। অন্যথায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আপনাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য থাকবে।’
দুজন মিলে ঋণের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ: অভিযোগ উঠেছে যে, প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগের একটি বড় অংশ মান্না আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে মিলে আত্মসাৎ করেছেন। জানা গেছে, পুলিশের বিশেষ শাখার তথ্যমতে, ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহজাহান চৌধুরী গত বছরের ১৯ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যান। অনেকের সন্দেহ, শাহজাহান চৌধুরীর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে এ টাকা পাচার করেছেন মাহমুদুর রহমান মান্না।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসন থেকে সংসদ সদস্য পদে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না। কিন্তু গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও)-এর ১৬ (ঠ) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ঋণগ্রহীতা ঋণখেলাপি হলে তিনি নির্বাচনে অযোগ্য বিবেচিত হবেন। সেক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী ঋণখেলাপি অবস্থায় মাহমুদুর রহমান মান্না আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কি পারবেন না সেটা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
মান্নার বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড়: স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের সমালোচনা করে আসছেন মাহমুদুর রহমান মান্না, সেই দলেরই এক প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে তিনি ব্যবসায় যুক্ত। যে আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গণহত্যার জন্য ৯টি মামলা রয়েছে বগুড়া সদর ও শিবগঞ্জ থানায়। এ নিয়ে বিস্তর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকার নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।
এ বিষয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে মাহমুদুর রহমান মান্না কালবেলাকে বলেন, তার প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ আছে, এটা সঠিক। তবে চিঠির বিষয়ে তিনি এখনো কিছু জানেন না। তিনি কোনো চিঠি পাননি। মান্না বলেন, ‘ঋণটি পুনঃতপশিল প্রক্রিয়াধীন। কোনো নোটিশ ইস্যু হলে তো আমার কাছে আসবে! আমি এখনো জানি না।’
আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে ব্যবসা করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি জেল খেটেছি দুই বছর, রিমান্ডে ছিলাম ৪৮ ঘণ্টা। তাহলে আমি দোসর না হলে কি শাহআলম দোসর? আমার এমডি আওয়ামী লীগ করে, সেটা ঠিক আছে। কারণ কোম্পানিটা হয়েছে ১৫ থেকে ১৬ বছর আগে। তখন তো আমিও আওয়ামী লীগ করতাম। এ কথা তো সঠিক যে, গত ১০ বছরে এই কোম্পানির কাছে আমি যেতেই পারিনি। কারণ ওই ছেলে সব নিয়ন্ত্রণ করত। আমাকে সাপোর্ট দেয়নি; কিন্তু টাকাপয়সা নিয়ে সব আমেরিকা পাঠিয়ে দিয়েছে। এটাও ঠিক যে, সে আমেরিকা পালিয়ে গেছে।’
মাহমুদুর রহমান মান্না প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘এই নিউজগুলো এখন করাচ্ছে ঠিক ভোটের আগে। এতদিন না!’ তবে চিঠির বিষয়ে বিস্তারিত জানতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।