

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘যাদের ৩৯ জন এমপি প্রার্থী ঋণখেলাপি তারা দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করতে পারবে না। অন্তত ওই দলের মুখে দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার কথা মানায় না। চোর-ডাকাতদের সংসদে নিয়ে চোর-ডাকাত মুক্ত করা যায় না। দুর্নীতিবাজ আর চাঁদাবাজদের দিয়ে দুর্নীতি-চাঁদাবাজি বন্ধ করা যায় না।’
গতকাল রোববার বিকেলে রাজধানীর ধূপখোলা মাঠে ঢাকা-৬ আসনে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে শফিকুর রহমান এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি ১১ দলীয় ঐক্যজোটকে বিজয়ী করে চাঁদাবাজমুক্ত বাংলাদেশ বুঝে নিতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।
এর আগে সকালে যাত্রাবাড়ীর কাজলার পাড় এলাকায় ঢাকা-৪ ও ঢাকা-৫ আসনের নির্বাচনী কমিটির সমাবেশে বক্তব্য দেন জামায়াত আমির। এ সময় তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনে হেরে যাওয়ার ভয়ে কেউ কেউ বাঁকা, অন্ধকার গলির পথে চলতে পারেন। সবশেষে সন্ধ্যায় রাজধানীর বকশীবাজারে ঢাকা-৭ আসনের নির্বাচনী সমাবেশে বক্তব্য দেন ডা. শফিকুর রহমান। সব সমাবেশে সংশ্লিষ্ট আসনে জামায়াতের প্রার্থীদের হাতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক তুলে দেন তিনি।
ধূপখোলার সমাবেশে জামায়াত আমির বলেন, রাজনীতিবিদরা জাতিকে পথ দেখাবেন, ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখবেন; কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় বিগত ৫৪ বছরে যারা পালাক্রমে দেশ শাসন করেছে, তারা ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে পারেনি, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি, তরুণ প্রজন্মের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা নিতে পারেনি। ফলে যুব সমাজের অনেকে বিপথগামী হয়ে উঠেছে। এরাই মূলত চাঁদাবাজি করছে, সন্ত্রাসী করছে, লুটপাট করছে, দখলদারিত্ব করছে। ১১ দলীয় ঐক্যজোট সরকার গঠনের সুযোগ পেলে সামাজিক দায়িত্বগুলো রাষ্ট্র কর্তৃক পালন করা হবে। আমাদের আগামীর পরিচয় হবে ‘আমিই বাংলাদেশ’। যেখানে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, কর্মের অধিকার নিশ্চিত হবে।
শফিকুর রহমান বলেন, ১৯৪৭ সালে আমরা ব্রিটিশদের হাত থেকে স্বাধীন হয়েছিলাম; কিন্তু স্বাধীনতা ভোগ করতে পারিনি। ১৯৭১ সালে আমরা পাকিস্তানের হাত থেকে স্বাধীন হয়েছি; কিন্তু স্বাধীনতা পাইনি। চব্বিশে আমরা আধিপত্যবাদের দোসর ফ্যাসিবাদের হাত থেকে মুক্ত হয়েছি আর কোনো ফ্যাসিবাদ আমরা দেখতে চাই না। জুলাই কারও একার নয়। জীবন দেব, জুলাই দেব না। জুলাই আন্দোলনে একক কোনো মাস্টারমাইন্ড ছিল না। এদেশের ১৮ কোটি জনগণ জুলাইয়ের মাস্টারমাইন্ড।
তিনি বলেন, আমরা সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বে বিশ্বাসী; কিন্তু কাউকে আমাদের প্রভু হতে দেব না। কেউ যদি আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাতে চেষ্টা করে, তবে তার উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে। আগামীর নেতৃত্ব দেবে তরুণ প্রজন্ম। জামায়াতে ইসলামী তরুণ প্রজন্মের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ক্ষমতায় গেলে বেকার ভাতা দিয়ে বেকারত্বের মহাসাগর সৃষ্টি না করে যুব সমাজকে দক্ষ উদ্যোক্তা হিসেবে তৈরি করার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, যুব সমাজ হবে আগামীর বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চাবিকাঠি। কেউ ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে কিংবা ভোট চুরির চেষ্টা করলে তাদের প্রতিহত করতে হবে। জনগণের বিজয় নিশ্চিত করতে জনগণকে সজাগ থাকতে তিনি আহ্বান জানান।
এর আগে কাজলারপাড়ে আয়োজিত সমাবেশে শফিকুর রহমান বলেন, আমরা শুনতে পাচ্ছি, কেউ কেউ নিজেদের হেরে যাওয়ার (জাতীয় নির্বাচনে) ভয়ে বাঁকা, অন্ধকার গলিপথে চলতে পারেন। আমরা নির্দিষ্ট কোনো দলকে বলছি না, ব্যক্তিকেও বলছি না। আশা করব, জুলাইয়ের চেতনাকে উপলব্ধি করে এগুলো থেকে সরে আসবেন। যদি না আসেন, মনে রাখবেন, জুলাই যোদ্ধারা ঘুমিয়ে যায়নি। তাদের প্রথম কাজটি করেছে, দ্বিতীয় কাজের জন্য তারা এখন প্রস্তুত।
বাংলাদেশে আর ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম দেখতে চান না উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের জনগণের অর্থে কেনা অস্ত্র থেকে জনগণের ওপরই গুলি ছোড়া হবে, জামায়াত এটি দেখতে চায় না। ফ্যাসিবাদের সব জট কেটে দিতে হলে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলতে হবে। ‘হ্যাঁ’ মানে আজাদি, ‘না’ মানে গোলামি।
জামায়াতের আমির ঢাকা-৪ আসনের প্রার্থী সৈয়দ জয়নুল আবেদীন ও ঢাকা-৫ আসনের প্রার্থী কামাল হোসেনের হাতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক তুলে দেন এবং তাদের ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করতে এলাকাবাসীর প্রতি অনুরোধ জানান। সভায় বক্তব্য দেন জকসু ভিপি রিয়াজুল ইসলাম, জাকসু এজিএস মাজহারুল ইসলামসহ জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, এবি পার্টি এবং ঢাকা-৪ ও ৫ আসনের বিভিন্ন ওয়ার্ড জামায়াতের নেতারা। সভাপতিত্ব করেন জামায়াতের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের নায়েবে আমির আবদুস সবুর ফকির।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম, ১১ দলীয় জোট সমর্থিত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী ড. আব্দুল মান্নান, ১১ দলীয় জোট সমর্থিত শাপলা কলি প্রতীকে ঢাকা-৮ আসনে সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম।
এ ছাড়া ঢাকা-৬ আসনের নির্বাচন পরিচালক কামরুল আহসান হাসানের সভাপতিত্বে ধুপখোলা মাঠের জনসভায় উপস্থিত ছিলেন নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইজহার, জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমির আব্দুস সবুর, ড. হেলাল উদ্দিন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাওলানা জহিরুল ইসলাম, এবি পার্টির গাজী নাসির উদ্দিন, এনসিপির আলাউদ্দিন মোহাম্মদ, জুলাই শহীদ জুনায়েদের পিতা শেখ জামাল হোসেন প্রমুখ।
জামায়াত আমিরের সঙ্গে ফরাসি রাষ্ট্রদূতের বৈঠক: গতকাল সন্ধ্যায় জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলটির আমির শফিকুর রহমানের সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শার্লেট সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। তার সঙ্গে ছিলেন ডেপুটি রাষ্ট্রদূত ফ্রেদেরিক ইনজা ও অর্থনৈতিক উপদেষ্টা জুলিয়েন ডিউর। সাক্ষাৎকালে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন ও উভয় দেশের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, পারস্পরিক সহযোগিতা আরও জোরদার হবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এ সময় জামায়াত আমিরের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, শিক্ষাবিদ ড. যুবায়ের আহমেদ এবং আমিরের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মাহমুদুল হাসান।
মন্তব্য করুন