

নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ইস্যুতে টানা আন্দোলনে কার্যত অচল হয়ে পড়া চট্টগ্রাম বন্দরে বৃহস্পতিবার দিনভর উত্তেজনা, দরকষাকষি, বৈঠক ও পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারির পর আপাতত বিরতির ঘোষণা এসেছে। অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে টানা তিন দিন বন্ধ থাকা বন্দরে এই পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার সকালে জরুরি বৈঠকে যোগ দিতে চট্টগ্রাম বন্দরে যান নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা এম শাখাওয়াত হোসেন। তবে বন্দর ভবন এলাকায় পৌঁছানোর পর আন্দোলনরত শ্রমিক-কর্মচারীদের বাধার মুখে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় তাকে বন্দর ভবনে প্রবেশ করানো হয়।
সকালের উত্তেজনার রেশ কাটতে না কাটতেই দিনভর একের পর এক বৈঠক, আলোচনা ও কড়া বক্তব্যে পরিস্থিতি আরও ঘনীভূত হয়। দুপুরে বন্দর কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে বৈঠক করেন উপদেষ্টা। বিকেলে আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার পর সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, শুক্র ও শনিবারের জন্য কর্মসূচি স্থগিত রাখা হচ্ছে। তবে শনিবারের মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে সন্তোষজনক সিদ্ধান্ত না এলে রোববার থেকে আবারও কঠোর কর্মসূচি শুরুর আলটিমেটাম দেন আন্দোলনকারীরা।
বৃহস্পতিবার সকালে কার্যত অচল বন্দর এলাকায় পৌঁছানোর পর আন্দোলনকারীরা উপদেষ্টাকে ঘিরে ধরেন। একপর্যায়ে তিনি গাড়ি থেকে নেমে তাদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন বলেন, ‘৩২ বছর ধরে বন্দরে চাকরি করছি। এমন চেয়ারম্যান আমরা কখনো দেখিনি। গত দেড় বছরে আমাদের নানাভাবে হয়রানি করা হয়েছে। আমরা এই চেয়ারম্যানের অপসারণ চাই।’ জবাবে উপদেষ্টা বলেন, ‘আপনাদের সঙ্গে ওয়ান টু ওয়ান কথা বলব। চেয়ারম্যান থাকবেন না।’ উপদেষ্টার এই বক্তব্যে সাময়িকভাবে আশ্বস্ত হন আন্দোলনকারীরা। তিনি আরও বলেন, গত দেড় বছর ধরে তিনি শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে কাজ করছেন এবং তাদের কথা শোনার পাশাপাশি তার কথাও শোনার আহ্বান জানান।
এরপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় উপদেষ্টাকে বন্দর ভবনে প্রবেশ করানো হয়।
বন্দর ভবনের কনফারেন্স রুমে অনুষ্ঠিত জরুরি বৈঠকে বন্দর কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার অতিরিক্ত পরিচালক, বিজিবি, কোস্টগার্ড, নৌ অঞ্চল ও নেভি ইন্টেলিজেন্সের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। প্রায় এক ঘণ্টার বৈঠক শেষে উপদেষ্টা গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা ওনাদের সঙ্গে কথা বলব, ওনাদের কথা শুনব। এটা এমন কোনো বিষয় না যে, পোর্ট বন্ধ রাখতে হবে। পোর্ট বন্ধ না রেখেও দাবি-দাওয়া তোলা যায়।’
এ বৈঠকে আন্দোলনকারীদের কোনো প্রতিনিধি রাখা হয়নি, যা নিয়ে তাদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়ে। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বন্দর ব্যবহারকারীদের সঙ্গে বৈঠক শেষে বেরিয়ে যাওয়ার সময় উপদেষ্টা আবারও আন্দোলনকারীদের বিক্ষোভের মুখে পড়েন। বন্দর ভবনের ভেতরে থাকা শ্রমিক-কর্মচারীরা মিছিল নিয়ে ভবনের সামনে অবস্থান নেন। কড়া নিরাপত্তায় ভবন থেকে বের হলেও বাইরে অবস্থানরত আন্দোলনকারীরা তাকে ঘিরে ধরে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দেন।
উপদেষ্টা চলে যাওয়ার পর ইব্রাহিম খোকন বলেন, উপদেষ্টা তাদের বোটক্লাবে আলোচনায় যাওয়ার আমন্ত্রণ জানালেও তারা সেখানে যাবেন না। পরে উপদেষ্টা এম শাখাওয়াত হোসেন বলেন, বন্দরে এভিয়েশন ফুয়েল আটকে থাকায় দেশের এয়ারলাইন খাত চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। যারা কাজ করতে চায়, তাদের বাধা দেওয়া হলে সরকার কঠোর অবস্থানে যেতে বাধ্য হবে বলেও তিনি জানান। তিনি বলেন, ১৮ কোটি মানুষকে জিম্মি করে রাখা যায় না এবং বিকল্প সমুদ্রবন্দর না থাকায় পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর।
পরিস্থিতির মোড় ঘুরে যায় বিকেলে। নৌপরিবহন উপদেষ্টার সঙ্গে আলোচনায় বসেন আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিরা। বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনের নেতা হুমায়ুন কবির জানান, দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং পবিত্র রমজান মাসের প্রতি সম্মান জানিয়ে শুক্র ও শনিবার কর্মসূচি স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে শনিবারের মধ্যে সরকার সন্তোষজনক সিদ্ধান্ত না নিলে রোববার থেকে আবার আন্দোলনে নামার ঘোষণা দেন তিনি। ইব্রাহিম খোকন বলেন, এনসিটি কোনোভাবেই ডিপি ওয়ার্ল্ড বা অন্য কোনো দেশি-বিদেশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে দেওয়া যাবে না, এটিই তাদের প্রধান দাবি। তিনি জানান, আন্দোলনে অংশ নেওয়া কর্মচারীদের বিরুদ্ধে নেওয়া প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রত্যাহার, নিজ নিজ পদে পুনর্বহাল এবং ভবিষ্যতে কোনো হয়রানিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন উপদেষ্টা, যদিও এনসিটি ইজারা বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিতে না পারার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন।
উল্লেখ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডকে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গত শনিবার থেকে আন্দোলনে নামেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। প্রথমে টানা তিন দিন আট ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালনের পর বুধবার থেকে তারা অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে যান। ফলে চট্টগ্রাম বন্দর কার্যত অচল হয়ে পড়ে। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই হাজার কনটেইনারে পণ্য রপ্তানি হলেও বুধবার দ্বিতীয় দিনের মতো একটি কনটেইনারও রপ্তানি হয়নি। আন্দোলনকারীদের বাধায় জেটি থেকে কোনো জাহাজ ছাড়তে না পারায় বন্দরের ইয়ার্ড, জেটিতে থাকা ১০টি জাহাজ ও বেসরকারি ডিপোতে আটকে আছে প্রায় ১৩ হাজার একক রপ্তানি কনটেইনার, যার আনুমানিক মূল্য ৬৬ কোটি ডলার বা প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। দেশের মোট রপ্তানির ৯১ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দরনির্ভর হওয়ায় টানা কয়েক দিনের অচলাবস্থায় রপ্তানি খাতে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।