

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে এসে ঐক্যের বার্তা দিলেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়ে বললেন, এবার দেশ গড়ার পালা।
সরকার গঠনের আলোচনার মধ্যেই গতকাল শনিবার বিকেলে সংবাদ সম্মেলনে আসেন তারেক রহমান। রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের বলরুমে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে দেশি-বিদেশি একদল সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন। সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন হবু প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তিনি তার দেওয়া প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেন।
তারেক রহমান বলেন, বিএনপি জনগণের সামনে রাষ্ট্র মেরামতের রূপরেখা উপস্থাপন করেছিল। অন্যান্য গণতান্ত্রিক দল এবং সারা দেশের জনগণের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে ৩১ দফা প্রণয়ন করেছিল। ৩১ দফার আলোকে ঘোষণা করা হয়েছে দলীয় ইশতেহার। একই সঙ্গে কয়েকটি বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়ে বিএনপি জুলাই সনদেও স্বাক্ষর করেছে। আমরা জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ—প্রত্যাশিত প্রতিটি অঙ্গীকার পর্যায়ক্রমিকভাবে বাস্তবায়ন করব ইনশাআল্লাহ। এ সময় তিনি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিয়ে বলেন, একটি জবাবদিহিমূলক সরকার গঠন হতে যাচ্ছে।
দেড় যুগের বেশি সময় লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটানোর পর গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। এরপর বনানীর হোটেল শেরাটনে সম্পাদকসহ সিনিয়র সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছিলেন তিনি। বৃহস্পতিবার ভোট দেওয়ার পর এবং রাজধানীর বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদর্শনের পর সাংবাদিকদের কাছে দুই দফা প্রতিক্রিয়াও জানিয়েছিলেন তারেক রহমান। তবে দেশে ফেরার পর গতকালই প্রথম সংবাদ সম্মেলনে আসেন তিনি। এসময় আলজাজিরা, বিবিসিসহ চীন, ভারত, পাকিস্তান, জাপান, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলন শেষে বিজয় চিহ্ন দেখান বিএনপির চেয়ারম্যান ও দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এর আগে সাদা শার্ট পরে হাস্যোজ্জ্বল মুখে তারেক রহমান হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের বলরুমে প্রবেশ করলে সেখানে আসা নেতারা দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে তাকে স্বাগত জানান। অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করে সাংবাদিকদের দিকে হাত তুলে সালাম জানান বিএনপি চেয়ারম্যান।
তারেক রহমান বলেন, স্বাধীনতার ঘোষকের প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপিকে দেশের জনগণ আবারও রাষ্ট্র পরিচালনার ম্যান্ডেট দিয়েছেন। জনগণ বিএনপির প্রতি যে বিশ্বাস এবং ভালোবাসা দেখিয়েছেন, এবার জনগণের জীবনমান উন্নয়নের জন্য নিরলস কাজের মাধ্যমে জনগণের এই বিশ্বাস এবং ভালোবাসার প্রতিদান দিতে আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। আমি সারা দেশে বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মী-সমর্থকদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলতে চাই, শত নির্যাতন-নিপীড়নের পরও আপনারা রাজপথ ছাড়েননি। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা তো সংগ্রামে অটুট ছিলেন, অনড় ছিলেন। এবার দেশ গড়ার পালা আমাদের। দেশ পুনর্গঠনের এই যাত্রায় আপনি-আমি—আমাদের প্রত্যেককে অবশ্যই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
তিনি বলেন, দেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রপ্রিয় জনগণ আবারও বিএনপিকে বিজয়ী করেছে, আলহামদুলিল্লাহ। এ বিজয় বাংলাদেশের, এ বিজয় গণতন্ত্রের, এ বিজয় গণতন্ত্রকামী জনগণের। আজ থেকে আমরা সবাই স্বাধীন। আমি দেশের সব জনগণকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন। সব প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করে আমরা দেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করেছি।
শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় দলীয় নেতাকর্মীদের বিজয় মিছিল বের না করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন জানিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, আমরা গণতন্ত্র এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এ বিজয়কে শান্তভাবে, শান্তির সঙ্গে, দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে উদযাপন করেছি। নির্বাচন-উত্তর বাংলাদেশে যাতে কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, এজন্য শত উসকানির মুখেও আমি সারা বাংলাদেশে বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীকে শান্ত এবং সতর্ক থাকার আহ্বান জানাচ্ছি। কোনো অপশক্তি যাতে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটানোর সুযোগ নিতে না পারে, সেজন্য নির্বাচন-উত্তর নিরঙ্কুশ জয় অর্জনের পরও আমি সারা দেশে বিএনপি এবং জোটভুক্ত দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীকে বিজয় মিছিল বের করতে নিষেধ করেছিলাম। আমরা আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায়ের মাধ্যমে বিজয় উৎসব পালন করেছি।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া সব চেষ্টা ব্যর্থ হবে মন্তব্য করে তারেক রহমান বলেন, আমার বক্তব্য স্পষ্ট—যে কোনো মূল্যে অবশ্যই শান্তি এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। কোনো রকমের অন্যায় কিংবা বেআইনি কর্মকাণ্ড আমরা বরদাশত করব না। দল-মত-ধর্ম-বর্ণ কিংবা ভিন্নমত যাই থাকুক, কোনো অজুহাতে অবশ্যই দুর্বলের ওপরে সবলের আক্রমণ আমরা মেনে নেব না। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে আমাদের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারি দল কিংবা বিরোধী দল, অন্য মত কিংবা ভিন্ন মত—প্রতিটি বাংলাদেশি নাগরিকের জন্যই আইন সমান।
তিনি আরও বলেন, আইনের প্রয়োগ হবে বিধিবদ্ধ নিয়মে। নির্বাচনে একে অপরের বিরুদ্ধে কিংবা এক দল আরেক দলের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে নির্বাচনের মাঠে হয়তো কোথাও কোথাও নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। তবে এ ধরনের বিরোধ যেন প্রতিশোধ, প্রতিহিংসার রূপ না নেয়—সে ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকার জন্য আমি আন্তরিকভাবে আহ্বান জানাচ্ছি। একটি নিরাপদ, মানবিক, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার যাত্রাপথে আমি ভিন্ন দল কিংবা ভিন্ন মতের সবার সহযোগিতা কামনা করছি।
জবাবদিহিমূলক সরকার হতে যাচ্ছে জানিয়ে নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ফ্যাসিবাদের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি, অকার্যকর করে দেওয়া সাংবিধানিক এবং বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান এবং দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি—এমন একটি পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছি। জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক সংসদ এবং সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আর কোনো অপশক্তি যাতে দেশে ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে না পারে, দেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে না পারে; সেজন্য আমরা সবাই ইনশাআল্লাহ ঐক্যবদ্ধ থাকব এবং থাকতে হবে।
বিএনপিপ্রধান বলেন, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, গণঅধিকার পরিষদসহ ৫১টি রাজনৈতিক দল এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল। জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি রাজনৈতিক দলকেও আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং রাজনীতিতে রাজনৈতিক দলগুলো মূলত গণতন্ত্রের বাতিঘর। সরকার এবং বিরোধী দল যে যার অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করলে অবশ্যই দেশে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। মত ভিন্নতা সত্ত্বেও দেশের স্বার্থে আমরা সবাই এক। আমি বিশ্বাস করি, জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, বিভাজন আমাদের দুর্বলতা।
‘জনগণকে কনভিন্স করাটাই আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিং’: এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, জনগণকে কনভিন্স করাটাই হচ্ছে আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিং। আমাদের যে ইঞ্জিনিয়ারিংটা ছিল, সেটা হলো জনগণকে আমাদের পক্ষে নিয়ে আসা। সেটাতে আলহামদুলিল্লাহ, আমরা সফল হয়েছি।’
তার সরকারের পররাষ্ট্র নীতি সম্পর্কে আরেক প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের স্বার্থ, বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ আমাদের কাছে প্রথম। বাংলাদেশ এবং দেশের মানুষের স্বার্থ ঠিক রেখে আমরা আমাদের ফরেন পলিসি ডিসাইড করব।’
নতুন সরকারের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ বিষয়ে জানতে চান এক সাংবাদিক। এ প্রসঙ্গে হবু এ প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের কাছে কিছু চ্যালেঞ্জ আছে। সেগুলো হচ্ছে—অর্থনীতিকে সচল করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা, অবশ্যই আমাদের জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আপনি জানেন যে, গত রেজিম তারা (আওয়ামী লীগ) দেশে সব প্রতিষ্ঠান দলীয়করণ করেছে। সেজন্য আমরা সুশাসন প্রতিষ্ঠা করব। এগুলো আমরা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছি এবং এগুলোকে উই নিড টু টেকেল। তিনি আরও বলেন, আমরা জনগণের রায় পেয়েছি। অবশ্যই যুবকরা আছেন, তবে সমাজের আরও শ্রেণি-পেশার মানুষ আছেন। আমরা সবার বিষয়ে অ্যাড্রেস করব।
দক্ষিণ এশীয় সহযোগিতা ফোরাম (সার্ক) এবং শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে বিএনপি কী করবে—এমন প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, সার্ক গঠন হয়েছিল বাংলাদেশের উদ্যোগে। স্বাভাবিকভাবে আমরা সার্ক সক্রিয় করতে চাই। এই বিষয়ে আমরা আলাপ করব। দ্বিতীয় প্রশ্নটা ডিপেন্ড অন দ্য লিগ্যাল প্রসেস অব কোর্স।
চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের দেশের স্বার্থ ঠিক রেখে আমরা সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ব। আশা করি, দুই দেশ সামনের দিনগুলো আরও নিবিড়ভাবে একসঙ্গে কাজ করবে। দেশের অর্থনীতি সচল করার বিষয়ে তিনি বলেন, টু ব্রিং মোর বিজন্যাস অ্যান্ড ক্রিয়েট মোর জবস। আওয়ামী লীগের বিষয়ে আপনাদের অবস্থান কী? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আইনের শাসন নিশ্চিতের মাধ্যমে।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সেলিমা রহমান, হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, এজেডএম জাহিদ হোসেনসহ সিনিয়র নেতারা। অনুষ্ঠানে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন চৌধুরী, বরকত উল্লাহ বুলু, শামসুজ্জামান দুদু, জয়নাল আবেদীন, মীর নাসির, আহমেদ আযম খান, আসাদুজ্জামান রিপন, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, কেন্দ্রীয় নেতা খায়রুল কবির খোকন, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, মীর সরফত আলী সপু, অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান, ড. শাকিরুল ইসলাম খান শাকিল, আফরোজা আব্বাস, মিডিয়া সেলের মওদুদ হোসেন আলমগীর, আতিকুর রহমান রুমন, শায়রুল কবির খান, শামসুদ্দিন দিদার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।