

ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজ কমপ্লেক্সে বারবার অগ্নিকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নির্মাণ ত্রুটি, দায়িত্বরতদের গাফিলতি নাকি নাশকতা—সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে। বিশেষ করে ৯ মাসের মধ্যে অতি স্পর্শকাতর এলাকায় ছুটির দিনেই দুবার আগুন লাগায় নানা সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। গত শুক্রবার রাতে কার্গো ভিলেজের ৯ নম্বর গেট এলাকায় লাগা আগুনে ডিএইচএল কুরিয়ারের কনটেইনার পুড়ে যায়। এর আগে গত বছরের ১৮ অক্টোবর কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল।
বিমানবন্দর ও বেবিচক সূত্র জানায়, শুক্রবার রাতে যে কনটেইনারটি পুড়েছে, সেটির ভেতর কাপড়ের রোল, পেপার আইটেম, রাবার আইটেম, প্লাস্টিক আইটেমসহ বিভিন্ন পণ্য ছিল। এই পণ্যগুলো আজ রোববার নিলাম হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এর আগেই সেটি পুড়ে যাওয়ায় নানা সন্দেহ দানা বাধছে।
বেবিচকের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শুক্রবার রাতের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সরকার ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এর মধ্যে ডিএইচএলের অন্তত ৫ কর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।
এদিকে গতকাল কার্গো ভিলেজে লাগা আগুনের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রায় এক ঘণ্টার জরুরি বৈঠকও করেন তিনি। তবে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি মন্ত্রী।
তবে শুক্রবার রাতেই আগুন লাগার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়েছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। ঘটনাস্থলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, তদন্ত সাপেক্ষে বোঝা যাবে কী থেকে আগুনটা ধরেছে। তবে প্রাথমিকভাবে এখানকার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে বোঝা যাচ্ছে, শর্টসার্কিট থেকে আগুনের ঘটনা ঘটতে পারে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘কিন্তু প্রশ্ন হলো শর্টসার্কিট হবে কেন? এর আগেও যে অগ্নিকাণ্ড হয়েছিল, সেখানেও তদন্ত রিপোর্টে শর্টসার্কিট ছিল। তা
হলে নিশ্চয়ই গাফিলতি রয়েছে। আমাদের তা স্বীকার করতে হবে।’
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শুক্রবার রাত ১১টা ২৪ মিনিটের দিকে ৯ নম্বর গেট-সংলগ্ন কুরিয়ার অপারেশন এলাকায় ডিএইচএলের একটি কনটেইনারে আগুন লাগে। ঘটনাস্থলটি সিসিটিভি ক্যামেরার আওতার বাইরে ছিল। আগুন লাগার স্থানের সামনের অংশে একটি বিদ্যুতের খুঁটি ছিল এবং নিচে কিছু কেবল পড়ে থাকতে দেখা গেছে। তা ছাড়া ঘটনাস্থলের অদূরে কয়েকটি সিগারেটের অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে। অথচ ওই এলাকায় ধূমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সিগারেট থেকে আগুন লাগলে সাধারণত ধীরে ধীরে ধোঁয়া সৃষ্টি হয়ে পরে আগুন ছড়িয়ে পড়ে; কিন্তু এই ঘটনায় হঠাৎ দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠেছে, যা ফুটেজে দেখা গেছে।
বিমানবন্দর কার্গো এলাকার দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা বলেন, শর্টসার্কিট হলে সাধারণত স্পার্কিং হওয়ার কথা ছিল। এমনকি আশপাশের বিদ্যুৎ-সংযোগেও প্রভাব পড়ার কথা। কিন্তু সে রকম কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। আলোও নিভে যায়নি। ফলে আগুনের কারণ নিয়ে গভীরভাবে তদন্ত করতে হবে।
সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণের তথ্য দিয়ে একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগুন লাগার সময়ে ঘটনাস্থলের কাছে ডিএইচএলের একজন কর্মীকে অবস্থান করতে দেখা গেছে। তিনি সেখানে মশারি টানিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। আগুন লাগার পরও দেড় থেকে দুই মিনিট তিনি শান্তভাবে আগুনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। পরে ফোন করে বিষয়টি অন্যদের জানান। ঘটনাটি স্বাভাবিক আচরণ মনে হচ্ছে না।
গত শুক্রবার রাতের আগুন অল্প সময়ের মধ্যে নিয়ন্ত্রণে নেওয়া সম্ভব হলেও গত বছরের ১৮ অক্টোবর শনিবার লাগা আগুনে হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়। তবে বন্ধের দিনই কেন আগুন লাগছে সেই প্রশ্ন তুলেছেন আমদানি-রপ্তানিতে এজেন্ট ব্যবসায়ীরা।
ওই ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত বছরের ভয়াবহ আগুনে কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হয়েছে কি না, তা জানা যায়নি। তবে এসব ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আগুন লাগার ঘটনা বন্ধ হবে না।
ফেডারেশন অব বাংলাদেশ কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (সিঅ্যান্ডএফ) সভাপতি মো. মিজানুর রহমান বলেন, শুক্র ও শনিবার ছুটির দিনেই কেন বারবার কার্গো ভিলেজে আগুন লাগছে। এটা রহস্যজনক। এসব বিষয় খতিয়ে দেখা উচিত।