

লিওনেল মেসির মতো মহান ফুটবলার থাকলে অলৌকিক কিছু ঘটাতে পাঁচ মিনিটও লাগে না—নির্ভুল হিসাব করলে মাত্র চার মিনিট উনিশ সেকেন্ড। অসম্ভবকে সম্ভব করা, নিষ্প্রভ এক দলীয় পারফরম্যান্সকে কিংবদন্তির উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া, দুই গোলে
পিছিয়ে থাকা একটি ম্যাচকে মুহূর্তেই পাল্টে দেওয়া—যে ম্যাচটি প্রায় বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বড় চমক হয়ে উঠতে যাচ্ছিল। মিশর যখন ২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে বিদায় জানানোর দ্বারপ্রান্তে, তাও আবার পুরো ম্যাচজুড়ে তাদের চেয়ে ভালো খেলে, তখনই মেসি যেন সিদ্ধান্ত নিলেন—এটা হতে দেওয়া যাবে না। আর সেখানেই গল্পের মোড় ঘুরে গেল।
মাত্র ২৫৯ সেকেন্ডে, লিওনেল আন্দ্রেস মেসি নামের ফুটবল প্রতিভা, তিন অঙ্কের মহাকাব্য রচনা করলেন। আর্জেন্টিনাকে সমতায় ফেরালেন, আর গোটা ফুটবল বিশ্বকে আবারও মনে করিয়ে দিলেন—আমি যখন নিজের সেরাটা উজাড় করে দিই, তখন অন্য কেউ ম্যাচ জয়ের দুঃসাহস করো না।
প্রথম অঙ্ক: সেই ক্রস (৭৯ মিনিট)
এর আগ পর্যন্ত মনে হচ্ছিল, এ দিনটিও হবে মেসির হতাশার দিন। মিস করা একটি পেনাল্টি, একের পর এক ভুল পাস, ডিফেন্ডারদের কাছে থেমে যাওয়া ড্রিবল—সব মিলিয়ে বয়সের ছাপ যেন স্পষ্ট। মিশর তখন ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে, আর সময় যত গড়াচ্ছে আর্জেন্টিনার গোল করার সম্ভাবনাও ততই ক্ষীণ হয়ে আসছে। একটি কর্নার নিলেন, যা সহজেই ক্লিয়ার হয়ে গেল। ফিরতি বল কুড়িয়ে নিয়ে ডান প্রান্ত থেকে আরেকটি ক্রস তুললেন, সেটিও অনায়াসে ব্লক। কোথায় সেই কাঁধের সূক্ষ্ম নড়াচড়া? কোথায় কোমরের সেই জাদুকরি ভঙ্গি? বলটি নিজেই তুলে এনে থ্রো-ইন করলেন। আক্রমণ মাঝমাঠে গড়ালেও তিনি উইংয়েই রয়ে গেলেন। কিন্তু থ্রো-ইনের মাত্র ১৫ সেকেন্ড পর বল আবার তার পায়ে। আর্জেন্টিনা বিপদে পড়লে যেমনটা সব সময় করে, শেষ ভরসা সেই একজন—মেসি। প্রথম স্পর্শেই তিনি ডিফেন্ডারের সামনে দাঁড়ালেন। শরীরের হালকা এক মোচড়ে মাত্র এক ফুট জায়গা বের করলেন। সেটুকুই যথেষ্ট ছিল। একটি টাচ ভেতরের দিকে, একবার মাথা তুলে তাকানো, তারপর নিখুঁত এক ক্রস। বলটি গিয়ে পড়ল ক্রিস্তিয়ান রোমেরোর কপালে। ছয় গজ বক্সের ঠিক প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা রোমেরোর কাজ ছিল শুধু মাথা ছুঁইয়ে জালে পাঠানো। তিনি সেটা করলেন। আর্জেন্টিনা ১, মিশর ২। আমরা দেখতে পেলাম ম্যাচে হঠাৎ আবির্ভূত হলেন আমাদের সময়ের শ্রেষ্ঠ প্লেমেকার, আর সেখান থেকেই শুরু হলো অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের গল্প।
দ্বিতীয় অঙ্ক: সেই দৌড় (৮২ মিনিট)
খেলার মাঝে কিছু মুহূর্ত থাকে, যখন কোনো মহান ফুটবলার এমন কিছু করেন, যা দেখেই মনে হয়—এবার সব শেষ। আপনি যতই ভালো খেলুন, যতই সংগঠিতভাবে রক্ষণ সামলান, কৌশলে প্রতিপক্ষকে হার মানান—যখন একজন মহাতারকা ঠিক করে ফেলেন যে তিনি ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেবেন, তখন আর কোনো পরিকল্পনাই কাজে আসে না। সাইডলাইনে, পায়ের নিচে সাদা লাইনের ছোঁয়া নিয়ে বল পেলেন মেসি। আর ঠিক তখনই যেন সময়কে পেছনে ফিরিয়ে নিলেন। মুহূর্তেই যেন ২০১১ সালের সেই দুর্বার মেসি ফিরে এলো। প্রথম টাচেই কাছের ডিফেন্ডার ত্রেজেগেকে ছিটকে দিলেন। এরপর শরীর ঘুরিয়ে এমন এক গতি তুললেন, যা দেখে মনে হচ্ছিল এই রাতেই সেই বিস্ফোরণ ঘটবে, যার পর মেসি আর বল থাকবে আর কেউ নয়! ৩৯ বছরের মানুষটি যেন হঠাৎ ২৪-এ নেমে এলেন। বল যেন তার বাঁ পায়ের সঙ্গে সেলাই করে লাগানো। ত্রেজেগে মরিয়া হয়ে জার্সি টেনে ধরার চেষ্টা করলেন, কিন্তু লাভ হলো না। বক্সের কিনারায় পৌঁছে কাঁধের হালকা এক দোলায় নিজের ডান দিকে সরে গেলেন মেসি। সামনে করিম হাফেজ, আত্মবিশ্বাসী—ভাবছেন তার বিশাল শরীর দিয়ে পথ আটকে দিয়েছেন। কিন্তু লা পুলগা—তখন সত্যি সত্যি মাছির মতো উড়ছেন। এক টোকায় বল পাঠালেন হাফেজের বাঁ দিকে, আর নিজে ছুটে গেলেন ডান দিক দিয়ে। ডিফেন্ডারকে শরীর দিয়ে সরিয়ে রেখে আবার বলের নিয়ন্ত্রণ নিলেন। হাফেজের মরিয়া ট্যাকলও ব্যর্থ। প্রায় গোললাইনের কাছে পৌঁছে, রামি রাবিয়ার চাপের মধ্যেও শরীর ঘুরিয়ে এমন এক পাস বাড়ালেন, যা সোজা গিয়ে পড়ল লাউতারো মার্তিনেজের মাথায়। একবারও মাথা তুলে সতীর্থ কোথায় আছেন তা দেখলেন না। জায়গা বলতে প্রায় কিছুই ছিল না। পূর্ণ গতিতে দৌড়াতে দৌড়াতে তিনি শুধু বাঁ পায়ে বলটিকে নির্দেশ দিলেন—কোথায় যেতে হবে। আর বলও যেন সেই নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলল। মার্তিনেজ সুযোগটি নষ্ট করলেন। কিন্তু তাতে কিছুই বদলাল না। মিশরের খেলোয়াড়দের মুখের অভিব্যক্তিই সব বলে দিচ্ছিল। হয়তো কোনো অ্যাসিস্ট হলো না, কোনো গোলও নয়—তবু একটি বার্তা পৌঁছে গিয়েছিল। প্রথম ক্রসটি ছিল সতর্কবার্তা। আর সেই দৌড় ছিল ঘোষণা। আর্জেন্টিনা জানত। মিশর জানত। আমরাও জানতাম।
তৃতীয় অঙ্ক: সেই গোল (৮৩ মিনিট)
মাঝে মাঝে আমরা ভুলেই যাই, আসলে কোন জিনিসটি মেসিকে ‘মেসি’ বানিয়েছে। হয়তো মাঠের বাইরে তার বিনয়, নিজেকে বড় করে না দেখানোর স্বভাব, কিংবা সেই চিরচেনা মৃদু হাসি। হয়তো মাঠে তার সেই নির্লিপ্ত হাঁটা—যেন হারিয়ে যাওয়া এক শিশু। অথবা এমনভাবে ফুটবল খেলেন, যেন সবকিছুই কত সহজ! কিন্তু এসবের আড়ালে যে মানুষটি লুকিয়ে আছেন, তাকে সংজ্ঞায়িত করে একটাই জিনিস—জয়ের প্রতি তার নির্মম ক্ষুধা। উইংয়ে বল পেলেই তার চোখে সেই আগুন জ্বলে। যেখানে বিন্দুমাত্র নির্লিপ্ততা নেই, আছে শুধু হার না মানার অদম্য ইচ্ছা।
প্রথম ক্রসটি ব্লক হলেও মেসি থামেন না। আবার বল তুলে আরেকটি ক্রস করেন। বলটি দূরের পোস্টে ভেসে যায়। তিনি মুহূর্তেই হিসাব কষে নেন—ওখান থেকে সবচেয়ে সম্ভাব্য পাসটি আসবে আবার গোলমুখে। তাই আগেভাগেই দৌড় শুরু করেন বক্সের ভেতরে। সময় যেন তার জন্য ধীরে চলে। গনসালো মন্টিয়েল কোনোমতে লাউতারো মার্তিনেজের ফিরিয়ে দেওয়া বলটি থামান। এরপর আলতো করে বলটি ঠেলে দেন মেসির দিকে। তিনি ততক্ষণে দেখে ফেলেছেন সবকিছু। সামনে তিনজন লাল জার্সিধারী ডিফেন্ডার। গোলরক্ষকের অবস্থান। বল মাটিতে পড়ার ঠিক পরের মুহূর্ত। এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে সিদ্ধান্ত নিলেন—পুরো শক্তিতে শট। ডান পায়ে ভর দিয়ে শরীর ঘুরিয়ে বাঁ পায়ের বাইরের অংশ দিয়ে এমন এক ভলি মারলেন, যা ক্রসবারে লেগে জালে ঢুকে গেল। শটটি এতটাই প্রচণ্ড ছিল যে, বলটি যেন মিশরের দুর্দান্ত গোলরক্ষক মোস্তফা শুবির নয়, পিরামিড থাকলেও তা ভেদ করেই জালে ঢুকে যেত।
একটি ক্রস। একটি দৌড়। একটি গোল। মাত্র ২৫৯ সেকেন্ড—এই ছিল লিওনেল মেসির পুরো ম্যাচ নিজের করে নেওয়ার সময়। শেষ পর্যন্ত জয়সূচক গোলটি করেছিলেন এনজো ফার্নান্দেজ। কিন্তু আর্জেন্টিনাকে সেই জয়ের পথে ফিরিয়ে এনেছিল মেসির পাঁচ মিনিটের অলৌকিক জাদু—যে জাদু শুধু তার পক্ষেই সম্ভব।