কালবেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:৫৫ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

তুর্কি উসমানি সুলতানদের ঐতিহ্যের নিদর্শন তোপকাপি প্রাসাদ

আবিদ রাইহান
তুর্কি উসমানি সুলতানদের ঐতিহ্যের নিদর্শন তোপকাপি প্রাসাদ

তুরস্কের উসমানি সুলতানরা একসময় মক্কা, মদিনা, বাগদাদ ও জেরুজালেমসহ দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপ, রাশিয়া, পশ্চিম এশিয়া, উত্তর-পূর্ব আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল এক সাম্রাজ্য শাসন করতেন। তাদের সেই অর্ধপৃথিবীব্যাপী শাসনের কেন্দ্র ছিল তুরস্কের বিখ্যাত তোপকাপি প্রাসাদ। প্রাসাদটি তুরস্কের ইস্তাম্বুলে মর্মর সাগর, বসফরাস প্রণালি ও গোল্ডেন হর্ন খাঁড়িঘেরা একটি নয়নাভিরাম ছোট উপদ্বীপে পাহাড়ের ওপর অবস্থিত। বর্তমান ইস্তাম্বুল শহরের এই উপদ্বীপটি ১৪৫৩ সালের পূর্ব পর্যন্ত কনস্টান্টিনোপল নামের এক খ্রিষ্টানপ্রধান শহর ছিল। তোপকাপি আজ অবধি টিকে থাকা বিশ্বের বৃহত্তম ও প্রাচীনতম প্রাসাদ। তোপ শব্দের অর্থ কামান আর কাপি অর্থ গেট। তোপকাপি নামে একসময় প্রাসাদের একটি বড় গেট ছিল, যার নামে প্রাসাদের এই নাম। তুর্কি ভাষায় এই প্রাসাদ ‘টপকাপু সারাই’ বা ‘সার্গলিও’ নামেও পরিচিত।

মোগলদের পূর্বসূরি, অর্ধপৃথিবী শাসন করা সেলযুক সাম্রাজ্য ভেঙে ওসমানি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল আনুমানিক ১২৯৯ সালে। তাদের শাসনকাল ছিল প্রায় ৬২৫ বছর। ১৪৫৩ সালে ওসমানি সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ সুরক্ষিত খ্রিষ্টান শহর কনস্টান্টিনোপল বিজয় করে এর পূর্ব পাশে প্রাচীন বাইজেন্টাইনের ধ্বংসাবশেষের ওপর টপকাপি প্রাসাদ নির্মাণ শুরু করেন। পরে প্রায় সব সুলতানই এর সৌন্দর্য ও পরিধি বাড়ান। ১৮৫৩ সালে সুলতান আবদুলমেচিদ তার ইউরোপীয় ধাঁচে বানানো নতুন দোলমাবাচে (Dolmabahçe) প্রাসাদে বসবাস করতে শুরু করার পর থেকে তোপকাপি গুরুত্ব হারাতে শুরু করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ওসমানি রাজবংশের বিলুপ্তি হলে ১৯২৪ সালে আধুনিক তুরস্কের স্থপতি ও প্রথম রাষ্ট্রপতি মুস্তফা কামাল আতাতুর্ক তোপকাপি প্রাসাদ জাদুঘরে রূপান্তরিত করেন এবং প্রথমবারের মতো সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেন।

১৫১৭ সালে আব্বাসীয় খলিফাদের কাছ থেকে মিশর ও আরবের ক্ষমতা সুলতান সেলিমের হাতে চলে গেলে পর্যায়ক্রমে ইসলামের অনেক পবিত্র স্মৃতিচিহ্ন ওসমানি সুলতানরা প্রাসাদে নিয়ে যান। এর মধ্যে হজরত মোহাম্মদ (স.)-এর পবিত্র দাড়ি, জুব্বা, পাগড়ি, স্যান্ডেল, পানি পানের বাটি, তরবারি, ধনুক, পতাকা, চিঠি, পায়ের ছাপসহ তার পরিবার ও সাহাবিদের ব্যবহৃত অনেক জিনিসপত্র প্রাসাদের ভেতর একটি জাদুঘরে প্রদর্শিত আছে। এ ছাড়া এই জাদুঘরে ইব্রাহিম (আ.)-এর ব্যবহৃত পাত্র, ইউসুফ (আ.)-এর পাগড়ি, মুসা (আ.)-এর লাঠি, দাউদ (আ.)-এর তরবারি ও ইয়াহিয়া (আ.)-এর পুথি রক্ষিত আছে।

প্রাসাদের উত্তর পাশে সুরক্ষিত ও বিলাসবহুল হারেমে সুলতানের মা (রাজমাতা), স্ত্রী ও পরিবারের অন্যান্য সদস্য এবং প্রায় ৩০০ জনের মতো উপপত্নী ও দাসী থাকতেন। সুলতানের উপপত্নী ও দাসীরা সাধারণত ককেশীয়, জর্জিও ও আবখাসিও ছিলেন। এদের কম বয়সে পরিবার বা বাজার থেকে দাসী হিসেবে কিনে এনে হারেমে লালন-পালন করা হতো। আরবি ‘হারেম’ বা ‘হারাম’ শব্দের অর্থ ‘নিষিদ্ধ’। সুলতানের হারেমে সুলতান ও তার পরিবারের অত্যন্ত কাছের মানুষ ছাড়া সবার জন্য নিষিদ্ধ ছিল। হারেমের পাহারাসহ অন্যান্য দায়িত্বে থাকতেন প্রায় দুইশ তুর্কি ও নিগ্রো খোজা-প্রহরী।

পুরো প্রাসাদ প্রাঙ্গণ মোটামুটি একটি আয়তক্ষেত্রের মতো এবং চারটি প্রধান চত্বর ও হারেমে বিভক্ত। চত্বরগুলো চারদিক থেকে বিভিন্ন ছোট থেকে মাঝারি আকারের ভবন ও উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। চত্বরগুলো দক্ষিণ থেকে উত্তরে দিকে পর্যায়ক্রমে কম থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রাসাদের সীমানা বাইজেন্টাইন আমলের দেড় হাজার বছরের পুরোনো বেসিলিকা হাজিয়া সোফিয়ার ঠিক পেছন থেকে শুরু। বহির্মুখী প্রথম চত্বরটি একেবারে দক্ষিণে, যেখানে প্রবেশাধিকার সবচেয়ে বেশি শিথিল ছিল। হাজিয়া সোফিয়ার উত্তর পূর্ব কোণে বাব-ই-হুমায়ুন নামে গেট দিয়ে প্রথম চত্বরে ঢুকতে হয়। টিকিট ছাড়াই এ চত্বরে ঢোকা যায়। এ চত্বরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে আছে প্রায় আড়াই হাজার বছরের পুরোনো হাজিয়া ইরিন গির্জা। প্রথম চত্বর থেকে দ্বিতীয় চত্বর উঁচু দেয়াল আর বাবা-উস-সালাম দিয়ে আলাদা করা। এ গেট দিয়ে একমাত্র সুলতান ঘোড়ায় চড়ে যেতে পারতেন। বাকি সবার হেঁটে যেতে হতো। দ্বিতীয় থেকে তৃতীয় চত্বরে ঢোকার গেটের নাম বাব-উস-সাদি। এ গেটের সামনে ধর্মীয় ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দিনে হজরত মুহাম্মদ (স.) পবিত্র পতাকা টানানো হতো। এ গেটের ঠিক পেছনে সুলতানের দর্শনার্থী কক্ষ। সুলতানের অনুমতি ছাড়া বাব-উস-সাদি দিয়ে দর্শনার্থী কক্ষে বা তৃতীয় চত্বরে কারোরই প্রবেশাধিকার ছিল না। এমনকি প্রধান উজিরের ও সুলতানের অনুমতি নিতে হতো। সবচেয়ে উত্তরের চতুর্থ চত্বর ও হারেম ছিল সবচেয়ে দুর্গম, সুরক্ষিত ও সুলতানের একান্ত ব্যক্তিগত। এ চত্বরের উত্তর দিকে ছোট একটি সাধারণ দরজা আছে। এ দরজা দিয়ে একমাত্র সুলতান ছাড়া আর কারও প্রবেশ বা বের হওয়ার অনুমতি ছিল না। মাঝেমধ্যে রাতের বেলায় সুলতান ছদ্মবেশে এই দরজা দিয়ে ইস্তাম্বুলের সাধারণ মানুষের জনজীবন দেখতে বেরোতেন। প্রাসাদে প্রায় চার থেকে পাঁচ হাজার কর্মী বসবাস ও কাজ করতেন। এ ছাড়া বিভিন্ন কাজে প্রাসাদে প্রতিদিনই অনেক মানুষ আসতেন। প্রাসাদের পূর্ব পাশে আছে বিশাল রন্ধনশালা, যেখানে একসময় আটশ থেকে এক হাজার বাবুর্চি আর সহযোগীরা পাঁচ থেকে ছয় হাজার মানুষের খাবার তৈরি করতেন।

লেখক: মাদ্রাসা শিক্ষক

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সিগারেট খেতে বাঁধা দেওয়ায় খুন

ইউরোপজুড়ে জিপিএস সংকেত বিঘ্নিত করছে রুশ স্যাটেলাইট

আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রধানমন্ত্রীর ধন্যবাদ

শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ না করা পর্যন্ত ককরোচ পার্টির আন্দোলন চলবে

জাতীয় সংসদে পাঁচ সদস্যের সভাপতিমণ্ডলী ঘোষণা

ইরানের জব্দকৃত সম্পদ নিয়ে নতুন পরিকল্পনা সাজাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

১০ বছরের শিশুকে ‘ধর্ষণ’, অভিযুক্তকে গণপিটুনির পর পুলিশে সোপর্দ

৪ বার সঠিক পূর্বাভাস দেওয়া প্রতিষ্ঠান জানাল ২০২৬ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন কে

আদ্-দ্বীনে ৬ নবজাতকের মৃত্যু / মারা যাওয়া প্রত্যেক শিশুর পরিবার পাবে ৮০ লাখ টাকা : শিশির মনির

শাকিব বুবলীর দ্বিতীয় সন্তানের আগমন ঘটল কোথায়?

১০

লাঠিসোঁটা নিয়ে বিএসএফকে ধাওয়া দিল এলাকাবাসী

১১

এমপিওর দাবিতে অবস্থানরত শিক্ষকদের পানি-স্যালাইন দিলো ছাত্র জমিয়ত

১২

দুই মাদক কারবারীকে ইট দিয়ে বেধড়ক মারপিট, ভিডিও ভাইরাল

১৩

২৪ বিলিয়ন ডলারের জন্যই থমকে আছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা

১৪

ইসরায়েলে বন্দুকধারীদের গুলিবর্ষণ, বহু হতাহত 

১৫

বিশ্বকাপে রেকর্ড ১২৪৮ ফুটবলার, দেখে নিন ৪৮ দেশের চূড়ান্ত স্কোয়াড

১৬

কে জিতলো? অপু বুবলীকে নিয়ে মেতেছেন ভক্তরা

১৭

ব্রিটিশ ও চীনা ব্যবসায়ীদের নিয়ে ইএটিএল ইনোভেশন হাবের আলোচনা সভা

১৮

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দুই গোষ্ঠীর সংঘর্ষে আহত ২০

১৯

শূন্যরেখায় অনিশ্চয়তার ৫৬ ঘণ্টা

২০
X