মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
কালবেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৮:৪১ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

কৃষি গবেষণায় আরও জোর দেওয়া প্রয়োজন

ড. তাজুল ইসলাম চৌধুরী তুহিন
মাঠে কাজ করার সময় কৃষকরা। ছবি : সংগৃহীত
মাঠে কাজ করার সময় কৃষকরা। ছবি : সংগৃহীত

রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে সবুজ শ্যামলের গ্রামখ্যাত শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। ১১ সেপ্টেম্বর (গতকাল বৃহস্পতিবার) এ বিশ্ববিদ্যালয়টি ২৪ বছর পেরিয়ে ২৫ বছরে পদার্পণ করছে। যদিও উপমহাদেশের প্রাচীনতম কৃষি শিক্ষার প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটি এখন ৮৭ বছর অতিক্রান্ত করছে। ১১ ডিসেম্বর ১৯৩৮ সালে ‘দ্য বেঙ্গল এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট’ নামে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল। এরপর বিভিন্ন চড়াই-উতরাই পেরিয়ে নামের পরিবর্তন হয়ে ২০০১ সালের ৯ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদে পাস হয় ও পরবর্তী সময়ে ১১ সেপ্টেম্বর এক প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় নামে এটি যাত্রা শুরু করে। কৃষি শিক্ষা ও গবেষণা দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিতেই রাজধানীর বুকে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম হয়েছিল।

কৃষিই আমাদের প্রধান চালিকাশক্তি। পুকুরভরা মাছ, গোয়ালভরা গরু আর গোলাভরা ধান এখন প্রান্তিক কৃষকের স্বপ্ন মনে হলেও এটিই ছিল একসময় কৃষকের প্রধান অবলম্বন। কৃষকের বর্তমান অবস্থা যা-ই হোক না কেন, এ কথা সত্যি যে, আজও আমরা সারা বিশ্বে মাথা উঁচু করে টিকে আছি শুধু কৃষির কারণেই। করোনার কঠিন সময়ের মধ্যে যখন অন্য খাতগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক ছিল, তখনো কৃষিই আমাদের আশা জাগিয়েছে, এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছে। নতুন নতুন জাত ও প্রযুক্তির আধুনিকতায় একদিকে যেমন আমরা মাটি ছাড়াই সবজি ও ফসল চাষে সফলতা অর্জন করছি, ঠিক একইভাবে কৃষিবিদদের নিরন্তর গবেষণায় দেশের দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ত জমিতে লবণসহিষ্ণু জাত আবিষ্কারসহ খরা ও বন্যা সহনশীল জাত আমাদের প্রান্তিক কৃষকের ভাগ্য উন্নয়নে রাখছে বিশাল ভূমিকা। শুধু তাই নয়, ন্যানো প্রযুক্তি, ভাসমান বেডে সবজি চাষ, হাইড্রোপনিক্স, রিমোট সেন্সিং এরকম অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এখন কৃষকের হাতের নাগালে। আর এসবের পেছনে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা গ্র্যাজুয়েটদের রয়েছে অন্যতম ভূমিকা।

কৃষক ও কৃষিবিদদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণেই আজ আমরা দানা জাতীয় খাদ্যে অনেকটা স্বয়ংসম্পূর্ণ। বর্তমানে কোনো দুর্যোগকালীন অবস্থা ছাড়া সরকারকে উল্লেখযোগ্য কোনো খাদ্যশস্য আমদানি করতে হয় না। বরং আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে কৃষকের ন্যায্য দাম পাওয়ার জন্য সরকারকে বিদেশে রপ্তানিসহ অনেক কিছু বিকল্প ভাবতে হয়। ভাবনা যা-ই থাকুক, সরকারের কৃষি গবেষণা খাতে আরও বেশি উৎসাহ প্রদান এবং সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি—এ খাতটির জন্য আরও বেশি সুফল বয়ে আনতে পারে। আর সেইসঙ্গে আগামী দিনের তুখোড় মেধাবী শিক্ষার্থীরা কৃষিপ্রযুক্তির উন্নয়নে আরও বেশি আগ্রহী হয়ে উঠবে।

বিশ্ববিদ্যালয়টি গত ২৪ বছরে যেভাবে এগোনোর কথা ছিল, সেভাবে এগোয়নি। কৃষিতে সেন্টার অব এক্সিলেন্স হবে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়—এটিই ছিল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য। একদিকে গবেষণার জন্য জমির অভাব আর অন্যদিকে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার ও বিশেষায়িত ল্যাব আজও শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে খুব বেশি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাই বলে কি গবেষণা কার্যক্রম থেমে আছে? না, বিশ্ব যখন এগিয়ে যাচ্ছে জ্যামিতিক গতিতে; আমরা তখন এগোচ্ছি গাণিতিক গতিতে। ব্যক্তিগত উদ্যোগে দেশের ও দেশের বাইরের ফান্ডে কিছু ল্যাব বানানো ছাড়া আর উল্লেখযোগ্য কোনো কিছুর উন্নয়ন হয়নি। তবে হ্যাঁ, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইনফাস্ট্রাকচারাল কিছু ডেভেলপমেন্ট এ বিশ্ববিদ্যালয়েও হয়েছে। কিন্তু পুরাতন বিল্ডিংগুলোর ক্লাসরুমের জরাজীর্ণ অবস্থা ও আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব এখানকার ছাত্র-শিক্ষকদের প্রায় প্রতিদিনেরই অভিযোগ। শুধু তাই নয়, কলেজ আমলের জরাজীর্ণ ক্যাফেটারিয়াই এখনো শিক্ষার্থী ও শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের খাওয়ার প্রধান জায়গা।

যেহেতু রাজধানীর বুকে এ প্রতিষ্ঠানটি মাত্র ৮৭ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত, তাই কৃষকের সমস্যা তাৎক্ষণিকভাবে সমাধানকল্পে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন উন্নতমানের বিশেষায়িত ল্যাব স্থাপন এখন আর দাবি নয়, বরং বাস্তবতা। আর এর জন্য প্রয়োজন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে আলাদা বাজেটও। যেটি দ্রুত বাস্তবায়ন হলে রাজধানীর বুকে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এর প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্যও অর্জিত হবে। কৃষিই যেহেতু আমাদের মূল চালিকাশক্তি, তাই কৃষি ও কৃষকের স্বার্থে সরকারের এ বিষয়ের ওপর বিশেষ নজর ও আর্থিক সহযোগিতার প্রয়োজন। এ ছাড়া ছাত্রছাত্রীদের ক্লাসরুম ও হলের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়ন, অতিদ্রুত মাঠ গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ পাশেই খালি থাকা সাবেক বাণিজ্য মেলার মাঠ ফিরিয়ে দেওয়া (যা আসলে একসময়ে এ প্রতিষ্ঠানেরই অধীনে ছিল) এখানকার ছাত্র-শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রাণের দাবি। এতে একদিকে যেমন এখানকার গবেষণার মাঠের কিছুটা ঘাটতি মিটবে, অন্যদিকে ঢাকা শহর পাবে একটা নিঃশ্বাস পাওয়ার আলাদা জায়গা; যেখানে কিছুটা হলেও মানুষ সপ্তাহে একদিন তাদের সন্তানদের নিয়ে প্রাণভরে অক্সিজেন নেওয়ার সুযোগ পাবেন।

কৃষিতে আমাদের অর্জন ও সাফল্য অনেক। ধান উৎপাদনে আমরা বৈশ্বিক গড়কে পেছনে ফেলে পৃথিবীতে তৃতীয়, মিঠা পানির মাছে চতুর্থ, সবজি উৎপাদনে অষ্টম—এরকম আরও কত কি! আমাদের সুস্বাদু আম এখন দেশ পেরিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে। তা ছাড়া প্রাণিজ আমিষ উৎপাদন অনেক বেড়েছে, ডিম-দুধের জোগান বেড়েছে। এত সব ভালো খবরের পরও আমরা স্বাধীনতার এত বছর পরও কৃষকের পরিশ্রমের সঠিক মূল্য দিতে ব্যর্থ হয়েছি। অন্য যে কোনো পেশা থেকে কৃষকের আয় অনেক কম বাংলাদেশে। কৃষককে আমরা তার দুর্যোগকালীন বা আপৎকালীন সময়ে নিরাপত্তা দিতে পারি না। সর্বস্বান্ত দিয়ে ফসল ফলিয়েও অনেক ক্ষেত্রেই উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকেও কৃষক বঞ্চিত হয়। আর এভাবেই প্রতিনিয়ত জীবনযুদ্ধের সঙ্গে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকে আমাদের প্রান্তিক কৃষকরা। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ না হলে, কৃষককে তার প্রাপ্য জায়গায় সম্মান দিতে না পারলে কখনোই তাদের মুখে হাসি ফোটানো সম্ভব হবে না। এ ছাড়া প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে আমাদের কৃষকরা এখনো অনেক পিছিয়ে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটদের কৃষির আধুনিক শিক্ষা ও গবেষণায় প্রশিক্ষিত করতে না পারলে কৃষককে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না। কৃষি শিক্ষা, গবেষণা, সম্প্রসারণ ও সঠিক বিপণনের বিষয়ে ছাত্রদের আধুনিক কৃষি শিক্ষায় শিক্ষিত করাটাই আমাদের এখন বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে শুধু উৎপাদন করলেই হবে না, উৎপাদিত খাদ্যটি যেন নিরাপদ ও পুষ্টি সম্মত হয়, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট সবার আরও বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি। কৃষি শিক্ষায় ও গবেষণায় শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় উত্তরোত্তর এগিয়ে যাবে। দক্ষ কৃষিবিদ তৈরি করে দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় সুনামের সঙ্গে আরও বেশি ভূমিকা রাখবে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়—এ প্রত্যাশাই সবার।

লেখক: অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান, কৃষি রসায়ন বিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

চাকরিনির্ভরতা থেকে উদ্যোক্তা: আত্মকর্মসংস্থানে আনসারের ‘সঞ্জীবন’ প্রকল্প

পদত্যাগী মন্ত্রীর বাসায় খিচুড়ি, প্রতিমন্ত্রীর সভা শেষে বিরিয়ানি দিয়ে আপ্যায়ন

বাজেটে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে নতুনভাবে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে : মির্জা ফখরুল 

মৌচাকে থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা বিল্লাল খুন

মহানগর যুবদল নেতা বহিষ্কার

নুরজাহান বেগমের মৃত্যু : সমাজের এক নির্মম আয়না

দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বিএনপি নেতা সোহেল রানাকে স্থায়ী বহিষ্কার 

পবিপ্রবির নতুন উপাচার্য হলেন প্রফেসর ড. এস এম হেমায়েত জাহান

তনু হত্যা  / ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারির নির্দেশ ২ আসামির বিরুদ্ধে 

নাগরিকসেবায় অবহেলা করলে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি ডিএসসিসি প্রশাসকের

১০

হোয়াটসঅ্যাপে ইসরায়েলের সাইবার হামলা, মামলা করবে মেটা

১১

রাজধানীতে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা

১২

আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক ট্রেনিং সেন্টার / ৬ দিনব্যাপী ফাউন্ডেশন কোর্সের দ্বিতীয় পর্ব শুরু

১৩

এনসিপিতে যোগ দিলেন বিভিন্ন দলের শতাধিক নেতাকর্মী

১৪

বাংলাদেশ-ইন্দোনেশিয়া বাণিজ্য : হালাল পণ্যে বড় সম্ভাবনা

১৫

ছেলের সামনে বাবাকে গুলি করে হত্যা

১৬

মুক্তির আগেই সাফল্যের দুয়ারে ‘ককটেল ২’

১৭

ইসরায়েলে ছোড়া ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেনি যুক্তরাষ্ট্র

১৮

নারী-পুরুষের বৈষম্য কমিয়ে আনতে কাজ করছে সরকার : মঈন খান

১৯

অতিরিক্ত ফাউলের অভিনয় করলে বিশ্বকাপে দেখতে হবে হলুদ কার্ড

২০
X