

ঢাকা ও আশপাশের শহরাঞ্চলের পানি নিরাপত্তা, স্যানিটেশন ব্যবস্থা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বহু বছর ধরেই সংকটাপন্ন। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, খাল-নদীর দখল-দূষণ, অপর্যাপ্ত স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্ক এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দূরবস্থার কারণে রাজধানী একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ‘মেট্রো ঢাকা ওয়াটার সিকিউরিটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রাম’ শীর্ষক নতুন প্রকল্পের প্রস্তাব নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী। খাল পুনর্বাসন, আধুনিক স্যানিটেশন ব্যবস্থা, স্টর্ম ওয়াটার নিষ্কাশন, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এসব উদ্যোগ নগরবাসীর জীবনমান উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ৭০ লাখ মানুষ উপকৃত হবে, এটি নিশ্চয়ই আশাব্যঞ্জক। কিন্তু প্রকল্পের ব্যয় প্রস্তাব যেভাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে, তা উদ্বেগের কারণ। মোট ৩ হাজার ৮০১ কোটি টাকার এ প্রকল্পে পরামর্শক খাতে বরাদ্দ ৮০৮ কোটি টাকা, যা মোট ব্যয়ের ২১ শতাংশের বেশি। বাংলাদেশের প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো বহুদিন ধরে পানি, ড্রেনেজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত কাজ করছে। সেখানে ১৬ ধরনের পরামর্শক নিয়োগের প্রস্তাব কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে যুক্তিসংগত প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষত যখন সংশ্লিষ্ট সংস্থা নিজেরাই স্বীকার করছে প্রাক্কলনে ভুল ছিল।
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এত বিপুল ঋণ যদি পরামর্শক খাতে ব্যয় হয়, তাহলে প্রকৃত উন্নয়ন-অবকাঠামোর জন্য বরাদ্দ কমে যাবে; জনগণের উপকারের তুলনায় বিশেষজ্ঞ বা বহিরাগত পরামর্শকদের আয়ই বেশি হবে। এ অবস্থায় পরিকল্পনা কমিশনের আপত্তি যথার্থ। প্রকল্পের খসড়ায় অসংগতি, অসম ব্যয়, অসমর্থিত জনবল নিয়োগ প্রস্তাব, সমীক্ষার অভাব এবং পিপিআর-বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়ার মতো নয়। আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো, আলোচ্য প্রকল্পটি এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত নয়, তবু বিশেষ অনুমতি নিয়ে দ্রুত অনুমোদনের তোড়জোড় চলছে। এটি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন তোলে। পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা পর্যাপ্ত সময় না পেলেও পিইসি সভায় পরামর্শক খাতের অস্বাভাবিক ব্যয় এবং ডিপিপির ত্রুটি চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, সুনির্দিষ্ট সমীক্ষা ছাড়া হাজার কোটি টাকার প্রকল্প কীভাবে অনুমোদনের পর্যায়ে পৌঁছে যায়?
খাল পুনর্বাসনের ব্যয় প্রস্তাবেও বৈষম্য স্পষ্ট। ঢাকায় কিলোমিটারপ্রতি খরচ ৪৮ কোটি টাকার বেশি; অথচ নারায়ণগঞ্জে তার অর্ধেকেরও কম। কেন এমন ব্যবধান তার ব্যাখ্যা নেই। যন্ত্রপাতি কেনায় ৫৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ‘অস্বাভাবিক’ প্রস্তাব প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তোলে। অন্যদিকে, ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বর্তমান সংকট বাস্তব ও জরুরি। খাল পুনর্বাসন, নর্দমা ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, স্লাজ ম্যানেজমেন্ট, রিসাইক্লিং প্লান্ট এসব কাজ বাস্তবায়িত না হলে রাজধানীর জলাবদ্ধতা, দূষণ ও পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি আরও বাড়বে। তাই প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু উদ্দেশ্য মহৎ হলেই ব্যয়ের অস্বচ্ছতা গ্রহণযোগ্য হয় না। উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্বল পরিকল্পনা, অতিরিক্ত পরামর্শকনির্ভরতা এবং অযৌক্তিক ব্যয় বারবার প্রমাণ করেছে, দায়বদ্ধতার অভাব শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপরই বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
আমরা মনে করি, এ প্রকল্পের ক্ষেত্রেও দ্বৈত বাস্তবতা স্পষ্ট। একদিকে প্রয়োজনীয় উন্নয়ন উদ্যোগ, অন্যদিকে ব্যয় প্রস্তাবে অসংগতি। তাই প্রকল্প অনুমোদনের আগে পূর্ণ সমীক্ষা, স্বচ্ছ ব্যয় কাঠামো, যৌক্তিক পরামর্শক নিয়োগ এবং পিপিআর-বিধি মেনে সার্বিক পুনর্মূল্যায়ন অপরিহার্য। ঢাকার পানি নিরাপত্তা ও স্যানিটেশন উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু বিষয়টি যেন উন্নয়নের নামে অস্বচ্ছতা এবং অযৌক্তিক ব্যয়ে কলুষিত না হয়, এটি নিশ্চিত করা এখন সরকারের নৈতিক দায়িত্ব।