

স্থল, জল, অন্তরিক্ষও দূষণের কবলে আক্রান্ত হচ্ছে ক্রমাগত। এই দূষণের ঢেউ যদি সমুদ্রে আঘাত হানে তাহলে তার বিরূপ প্রভাব হয় বহুমুখী। একদল গবেষক সম্প্রতি সাগরে জরিপ চালিয়ে সমুদ্রের গভীরে প্লাস্টিক বর্জ্যের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়ার উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করে। এই দূষণে আক্রান্ত বঙ্গোপসাগরও। এই তথ্যে পরিবেশ বিজ্ঞানী, জলবায়ু বিশেষজ্ঞ মহলকেও ভাবিয়ে তুলছে। সমুদ্রে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলায় পরিবেশগতসহ বহুমুখী ঝুঁকি তৈরি করছে। এতে সমুদ্রও আর সামুদ্রিক প্রাণীদের জন্য নিরাপদ থাকছে না। সমুদ্রে বেশ কিছু এলাকায় প্লাস্টিকের উপস্থিতি মূলত সামুদ্রিক উদ্ভিদ, মৎস্য সম্পদসহ প্রাণীদের জীবন বিপন্ন করে তোলায় উদ্বেগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে দূষণে আক্রান্ত সমুদ্রের মাছ খেয়ে ফুসফুস, কিডনিজনিত রোগ ও ক্যানসারের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে দেশের মানুষের।
প্রসঙ্গত, শুধু বঙ্গোপসাগরসহ বিশ্বের অন্যান্য সাগর মহাসাগরের মতো পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্যে বাংলাদেশের অন্যতম দূষিত নদীতে পরিণত হয়েছে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা, কর্ণফুলী ও সুরমা নদী। বর্তমানে এ নদীগুলোর মরণদশা। অন্যদিকে পদ্মা, যমুনা ও মেঘনা নদী দিয়ে প্রতিদিন ৭৩ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য সাগরে মিশছে। এ কারণে সমুদ্রের তলদেশে যে হারে বাড়ছে পলিথিন-প্লাস্টিকের স্তর, তাতে আগামী ৫০ বছর পর সমুদ্রে মাছের চেয়ে পলিথিনের পরিমাণ বেশি হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের টুলেন ইউনিভার্সিটি স্কুল অব সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিজ্ঞানী ইয়ানক্সু ঝাংয়ের নেতৃত্বে এক গবেষণায় সমুদ্রে প্লাস্টিক দূষণের নতুন চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণায় ভাসমান বোতলের সংখ্যা না গুনে বাস্তুতন্ত্রের ওপর প্লাস্টিকের ঝুঁকির একটি বৈশ্বিক ম্যাপ তৈরির মাধ্যমে সমুদ্রের কোথায় কোথায় প্লাস্টিকের সঙ্গে প্রাণীর সংযোগের সম্ভাবনা বেশি ও কোথায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর, তা বের করেছেন বিজ্ঞানীরা। শুধু তা-ই নয়, প্লাস্টিক বর্জ্য ভিন্ন ভিন্ন প্রাণীর জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তা-ও বিশ্লেষণ করেছেন তারা। বিজ্ঞানীদের তৈরি বৈশ্বিক ম্যাপ পর্যবেক্ষণে বঙ্গোপসাগরও প্লাস্টিক দূষণের ঝুঁকি রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। গবেষণা জাহাজ আর ভি ড ফ্রিডজোফ নানসেন কর্তৃক সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ ও ইকোসিস্টেমের ওপর পরিচালিত গবেষণা প্রতিবেদন সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনুসের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।
প্লাস্টিক চারভাবে প্রাণীদের ক্ষতি করছে। অনেক প্রাণী প্লাস্টিক খায়, প্লাস্টিকের মধ্যে জড়িয়ে যায়। অনেক প্রাণী প্লাস্টিকের সঙ্গে লেগে থাকা ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থও খায়। প্লাস্টিক থেকে নিঃসৃত রাসায়নিক শরীরে প্রবেশ করে সমুদ্রের প্রাণীদের ক্ষতি করছে। আর তাই বিজ্ঞানীরা এপিপেলাজিক প্রজাতি হিসেবে সমুদ্রপৃষ্ঠের কাছাকাছি প্রায় ৬৫০ ফুট গভীরতার মধ্যে বসবাসকারী প্রাণীদের চিহ্নিত করেছেন। দেখা গেছে, সমুদ্রের ভিন্ন ভিন্ন স্থানে প্রাণীদের ওপরে প্লাস্টিকের প্রভাব ভিন্ন রকম।
সমুদ্রে প্লাস্টিক দূষণ একটি বৈশ্বিক উদ্বেগ হিসেবে স্বীকৃত। যদিও প্লাস্টিকের বাস্তুসংস্থানের ঝুঁকি সম্পর্কে এখনো খুব কমই জানা। মানুষ কীভাবে প্লাস্টিক ঝুঁকির মাধ্যমে সামুদ্রিক জীবন ও বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে, তা জানার চেষ্টা করা হয়। গবেষণায় উত্তর প্রশান্ত মহাসাগর, উত্তর আটলান্টিক, উত্তর ভারত মহাসাগরের কিছু অংশ ও পূর্ব এশিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলকে প্লাস্টিক ঝুঁকির হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ অঞ্চলগুলোয় প্রচুর বন্যপ্রাণী থাকে। আবার বড় আকারের মাছ ধরার কার্যক্রম চলে। সমুদ্রের উপক্রান্তীয় অঞ্চলের বেশি প্রাণীর ঘনত্ব থাকে না। সেখানে শুধু দৃশ্যমান আবর্জনা দেখে ক্ষতির মাত্রা অনুমান করা যায় না। প্লাস্টিক-সম্পর্কিত পরিবেশগত ঝুঁকির বৈশ্বিক অবস্থানের ম্যাপ তৈরি করে গবেষক দল বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য-উপাত্ত খোঁজার চেষ্টা করেন।
অন্যদিকে, বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহারে পরিবেশদূষণের মারাত্মক ক্ষতির মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। আর এসবের ব্যবহার প্রতিরোধে কয়েক দশক ধরেই কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়েছে, যার ফলে পরিবেশদূষণ রোধে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ।
এনভায়রনমেন্টাল পারফরম্যান্স ইনডেক্স (ইপিআই) সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৭তম। বৈশ্বিক প্লাস্টিক-পলিথিন দূষণের প্রায় আড়াই শতাংশ সৃষ্টি হচ্ছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১০ মিলিয়ন টন পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যবহার হচ্ছে। যদিও এসব প্লাস্টিক-পলিথিনের মাত্র ৩৭ শতাংশ রিসাইক্লিং করা সম্ভব হচ্ছে।
কিছু প্লাস্টিক ক্ষুদ্র ভেলা বা বাহক হিসেবে কাজ করে। এসব ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ বহন করে। এই গবেষণায় পিএফওএস ও মিথাইলমারকারির মতো রাসায়নিক পদার্থ চিহ্নিত করা হয়েছে। এই রাসায়নিক প্লাস্টিকের সঙ্গে মিশে দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে। মিথাইলমারকারি একটি শক্তিশালী নিউরোটক্সিন। এটি গ্রহণ করে প্রাণীর মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি হচ্ছে। এসব মাছ, সামুদ্রিক পাখি, কচ্ছপ ও স্তন্যপায়ী প্রাণীর জন্য মারাত্মক বিপদ ডেকে আনে। এ গবেষণার মানচিত্রে ওখোটস্ক সাগর, হলুদ ও পূর্ব চীন সাগর, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং অন্যান্য ব্যস্ত উপকূলীয় অঞ্চলে এ ধরনের ঝুঁকির মাত্রা বেশি দেখানো হয়েছে। এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ২০৬০ সালের মধ্যে সমুদ্রে বৈশ্বিক প্লাস্টিক গ্রহণের ঝুঁকি বর্তমানের চেয়ে তিন গুণের বেশি বাড়বে। গবেষণার ফলাফল নেচার সাসটেইনেবিলিটি সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষক দলের সদস্যরা জানান, দেশে গভীর সমুদ্রে জেলি ফিশের আধিক্য মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে গেছে। দেখা গেছে, গভীর সমুদ্রে বড় বড় মাছ কমে যাচ্ছে। অনুরূপ স্বল্প গভীরে সমুদ্রে আশঙ্কাজনকভাবে মাছ কমছে। গত বছরের ২১ আগস্ট থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ জরিপ চালানো হয়। আট দেশের ২৫ জন বিজ্ঞানী এ জরিপ পরিচালনা করেন। এ দলের ১৩ জনই বাংলাদেশের। দেশের স্থলভাগ যতটুকু তার সমপরিমাণ অঞ্চল জলভাগেও আছে। সমুদ্র দূষণ সম্পর্কে পর্যাপ্ত গবেষণা, পলিসি সাপোর্ট প্রয়োজন।’ জাপান, ইন্দোনেশিয়া, মালদ্বীপের সঙ্গে যৌথ গবেষণা সমন্বয় করতে গুরুত্ব দেন প্রধান উপদেষ্টা।
প্রত্যাশা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সাগর-মহাসাগরকে প্লাস্টিকসহ সব রকম বর্জ্য থেকে মুক্ত রাখতে প্রয়োজন বৈশ্বিক উদ্যোগ। অন্যদিকে নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদনদীকে সবরকম দূষণ থেকে রক্ষায় সরকার, নাগরিক সমাজসহ সর্বস্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। নতুবা বাংলাদেশকে এ জন্য গুনতে হবে অপূরণীয় মাশুল।
লেখক: সম্পাদক-ক্লাইমেট জার্নাল২৪.কম
মন্তব্য করুন