

আমাদের রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাসে বিশেষ করে আমাদের জাতীয় স্বাধীনতার চূড়ান্তলগ্নে এবং স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেও রাষ্ট্রনায়কোচিত নেতৃত্বের অভাব পরিলক্ষিত হয়। পশ্চিমা শাসন-শোষণের রক্তাক্ত পিচ্ছিল মহাসড়ক অতিক্রম করে জাতি যখন স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে, তখন দিশেহারা জাতিকে ফেলে রেখে দিগ্বিদিক চলে গেলেন জাতীয় নেতারা।
স্বাধীনতা যুদ্ধের নির্দেশনার জন্য জাতি যখন উন্মুখ, সে প্রত্যাশা যখন মেটেনি জাতীয় নেতৃবৃন্দের সিদ্ধান্তহীনতার দোলাচালে, তখন জাতির ওই ক্রান্তিকালে আশ্বাসবাণী পাওয়া গেল চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত এক মেজরের কণ্ঠে স্বাধীনতা যুদ্ধের আহ্বান,
যে আহ্বান জনগণের মধ্যে বিশ্বাস ও ভরসার মন্ত্রধ্বনি হয়ে বেজে ওঠে। অসংখ্য প্রাণের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হয়। কিন্তু নতুন দেশ পরিচালনার প্রকৃত রাষ্ট্রনায়ক পাওয়া গেল না। যিনি অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক অশুভ শক্তির চাপকে অগ্রাহ্য করে রাষ্ট্রযন্ত্রকে সঠিক পথে স্থাপন করতে পারেন। তার বদলে স্বাধীনতা-উত্তর পরবর্তী কয়েকটি বছর অনেকটা অনুমতি-অনুগ্রহ নিয়ে দেশ পরিচালিত হলো। এর কারণ গোপন চুক্তি, শর্ত ছিল বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি অনুসৃত হবে পার্শ্ববর্তী দেশের নীতিতে। শর্ত ছিল সেনাবাহিনীর বদলে অপেক্ষাকৃত সীমিত পরিধির একটি মিলিশিয়া বাহিনী থাকবে। ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালিত হবে পরদেশনির্ভর। দেশের অভ্যন্তরে সৃষ্টি করা হলো প্রচণ্ড গোলযোগ। বিরোধী দল দমনে গুপ্তহত্যা, গুম ও খুনের আশ্রয় নেওয়া হলো। সর্বত্র পরিব্যপ্ত হলো নৈরাজ্যের বিভীষিকা। বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ উপনিবেশ থেকে মুক্তি পেয়ে পরোক্ষ উপনিবেশের বেড়াজালে আবদ্ধ হলো।
রাষ্ট্রনায়ক যদি শুধুই ভাবাবেগ দ্বারা পরিচালিত হন, তাহলে তিনি ব্যর্থ হবেন, তার থাকতে হবে শক্তিশালী কাণ্ডজ্ঞান। এ কথা সত্যি যে, ভাবাবেগ ও স্বপ্ন না থাকলে ব্যাপক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় উদ্যম ও উদ্যোগ সৃষ্টি হয় না। তবে এর সঙ্গে বাস্তব কাণ্ডজ্ঞান যোগ হলে তা ভাবাবেগ ও স্বপ্নকে সংহত করে ব্যক্তিকে সঠিক কর্মপন্থা নির্ধারণে সক্ষম করে তোলে। রাষ্ট্রনায়কের অন্তর্লোক হচ্ছে বাস্তবতা, ভাবাবেগ ও স্বপ্নের সহাবস্থান।
আমাদের জাতীয় ইতিহাসের গতিপথে জাতীয় নেতৃত্বের ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রনায়কের সব উপাদানের উপস্থিতি দেখা যায় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মধ্যে। বীরত্ব, দেশপ্রেম, বলিষ্ঠতা, বাস্তব-কাণ্ডজ্ঞান, দূরদর্শিতা, স্বাপ্নিক, প্রশ্নাতীত সততা, স্থৈর্য ও সহনশীলতার বহুমাত্রিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন জিয়াউর রহমান। ৭৫-এর ৭ নভেম্বরে ক্ষমতাসীন হয়ে শহীদ জিয়া পূর্বেকার শাসনামলের (৭২-৭৫) ব্যর্থতাগুলো চিহ্নিত করে জনস্বার্থে তার গৃহীত পদক্ষেপগুলো ছিল বৈপ্লবিক ও জননন্দিত। তার পেছনেও জনসমর্থন ছিল ঈর্ষণীয়। তার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা জনসমর্থনকে সঞ্চালিত করেছেন ইতিবাচক দিকে। তিনি দেশের উৎপাদন, উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। তার নেতৃত্বে দীর্ঘদিনের সামাজিক জাড্য ভেঙে গড়ে উঠেছিল এক কর্মচঞ্চল জাতি। কি অভ্যন্তরীণ, কি বৈদেশিক প্রতিটি ক্ষেত্রে পুরোনো অচলায়তন ভেঙে এক গলগ্রহ অবস্থা থেকে বাংলাদেশ প্রকৃতপক্ষেই মুক্তি লাভ করে স্বাধীন সত্তায়। তাই ক্রান্তিকালে জিয়াউর রহমানের প্রত্যয়দৃঢ় ভূমিকা পরভৃত্যের গ্লানি থেকে জাতিকে পরিত্রাণ দিয়েছিল দুবার—একবার ৭১ সালে স্বাধীনতা ঘোষণায়, দ্বিতীয়বার ৭৫ সালের ৭ নভেম্বরে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও গণতন্ত্রের পথ চলাকে নিশ্চিত করে। স্থূল চটকদার তোষামোদকে জিয়া ঘৃণা করতেন অন্তরের অন্তস্তল থেকে। তার আমলের ছাত্রদলের একজন জ্যেষ্ঠ ছাত্রনেতা আমাকে একটি ঘটনার কথা বলেছিলেন। একবার ছাত্রদলের এক সভায় জনৈক ছাত্রনেতা তার বক্তব্যে জিয়াকে আজীবন রাষ্ট্রপতি থাকতে অনুরোধ করেছিল। জিয়া সেই সময় চিৎকার করে সেই বক্তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘এ ছেলেটি তো আমাকে ধ্বংস করে দেবে।’ এই একটি ধমকের মধ্যে রাষ্ট্রনায়কের সুস্পষ্ট গুণ খুঁজে পাই জিয়াউর রহমানের মধ্যে।
গণতান্ত্রিক চেতনাসম্পন্ন রাষ্ট্রনায়ক জিয়া বিরোধী দল ও মতকে সহ্য করার এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন এ দেশে। এ প্রসঙ্গে অসংখ্য উদাহরণের মধ্যে একটি উল্লেখ করছি, ১৯৭৩ ও ১৯৭৯ সালে দুটি পার্লামেন্টের তুলনামূলক বিচার করলে দেখা যাবে—১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ ছিল যোগ্য পার্লামেন্টারিয়ানদের সমাহার। বিএনপি এই সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেলেও দেশের প্রখ্যাত বাম, ডান ও মধ্যপন্থি জাতীয় নেতারা জাতীয় সংসদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহার করে ওই জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে প্রভাবিত করেননি। এ কারণে স্বাধীনতা-পরবর্তী কয়েক দশকের মধ্যে ৭৯ সালের জাতীয় সংসদ অত্যন্ত সমৃদ্ধশালী ছিল বলে দলমত নির্বিশেষে অনেকে স্বীকার করেন। ১৯৭৩ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একচেটিয়া বিজয় ছিনিয়ে নেয়, শুধু হাতেগোনা চার-পাঁচজন বিরোধী দলের মাঝারি নেতা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এ বিষয়ে প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ও লেখক আবুল মনসুর আহমদ বলেছিলেন, দেশের সুপরিচিত, সুবক্তা বিরোধীদলীয় রাজনীতিবিদদের ১৫-২০টি আসন ছেড়ে দিলেও আওয়ামী লীগের কোনো ক্ষতি হতো না। তাতে গণতন্ত্র শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা থাকত। তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী সেই কথায় কর্ণপাত করেনি বরং জনপ্রিয়তা হ্রাসে আরও বেশি বিরোধী দলগুলোর প্রতি অন্ধ হিংসায় মেতে ওঠে। একপর্যায়ে আইন করে সব দল বন্ধ করে গঠন করা হলো একদল—বাকশাল। শুরু হলো মধ্যযুগের দিকে যাত্রা। একজন খ্যাতিমান চিন্তাবিদ বলেছেন, ‘খারাপ আইন হলো নিকৃষ্টতম অত্যাচার।’ (Bad laws are worstform of tyrany) সেই কালো আইন দিয়েই দমন করা হলো মানুষের বাক, ব্যক্তি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে।
একদলীয় ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে সংবিধানের পূর্ণ গণতান্ত্রিক চরিত্র ফিরিয়ে নিয়ে আসেন শহীদ জিয়া। সুতরাং শহীদ জিয়া নিজের বিশ্বাস ও আদর্শ থেকে কখনোই বিচ্যুত হননি। গণতন্ত্রের মূল চেতনা ছিল
তার রাষ্ট্রপরিচালনার ভিত্তি, সেখান থেকে তিনি কখনোই সরে আসেননি। রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক বিকাশে অপরিহার্য শর্ত যে, প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করতে তিনি নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। বহু মত ও পথের প্রতি শ্রদ্ধা, হস্তক্ষেপবিহীন অসংখ্য সংবাদপত্রের প্রকাশ, জনপ্রশাসন ও বিচার বিভাগকে স্বাভাবিক গতিতে চলতে দেওয়া, দেশের মানুষের নির্বিঘ্নে বাড়ির দরজা খুলে ঘুমাতে পারার নিশ্চয়তা অর্থাৎ জানমালের নিরাপত্তা—তার অসামান্য অবদান।
শহীদ জিয়ার আমলে বিচারকদের বিরোধী মতের কাউকে কাঠগড়ায় হাতজোড় করে দাঁড় করিয়ে রাখা বা সরকারের পক্ষ নিয়ে বিরোধী কোনো রাজনীতিককে গালাগালি করতে শোনা যায়নি। পুলিশ বা জনপ্রশাসনকে দলীয় অঙ্গসংগঠনের বর্ধিতাংশ করা হয়নি। গণতন্ত্রের মাপকাঠি অনুযায়ী দেশের এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়।
রাষ্ট্রদর্শনকে আবিষ্কার করার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রনায়কের সফলতা নির্ভর করে। শহীদ জিয়ার অসাধারণ কৃতিত্ব হচ্ছে, তিনি বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের অন্তর্নিহিত দর্শনকে যথার্থভাবে আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন। আবহমানকাল ধরে গড়ে ওঠা এ নির্দিষ্ট ভূপৃষ্ঠে আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অহংকারকে তিনি এককথায় প্রস্ফুটিত করেছিলেন বাংলাদেশি জাতীয়তবাদের শিরোনামে, যা সম্পূর্ণতা দান করেছে আমাদের জাতীয়তাবাদকে। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ শব্দটি শুধু স্বাজাত্যবোধের দ্যোতক নয়। এটি স্বজাতির বিরুদ্ধে বিদেশি আধিপত্যকামী ও প্রভাববলয়-সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধেরও দর্শন।
লেখক: সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি
মন্তব্য করুন