রহমান মৃধা
প্রকাশ : ২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:২৬ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও নীরবতার সময় ডাভোসে ট্রাম্প

রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও নীরবতার সময় ডাভোসে ট্রাম্প

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে রাষ্ট্র আছে, কিন্তু রাষ্ট্রচিন্তা নেই। সরকার আছে, কিন্তু জনগণের উপস্থিতি ক্ষীণ। নির্বাচন আছে, কিন্তু সিদ্ধান্ত আগেই নির্ধারিত। এই বৈপরীত্য কোনো একক দেশের সমস্যা নয়। এটি আজকের বৈশ্বিক বাস্তবতা।

বিশ্বের দিকে তাকালে চারদিকে অস্থিরতা। যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক বিভাজন, উদ্বাস্তু সমস্যা, জলবায়ু বিপর্যয়। কিন্তু এর চেয়েও গভীর একটি পরিবর্তন নীরবে ঘটছে। মানুষ ধীরে ধীরে এই অস্থিরতাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিচ্ছে। অন্যায় আর বিস্ময় জাগায় না। নীরবতা হয়ে উঠছে প্রতিক্রিয়ার ভাষা।

এই নীরবতার ভেতরেই নতুন ক্ষমতার কাঠামো গড়ে উঠছে।

ডাভোসে কোনো আইন পাস হয় না। কোনো রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয় না। তবু ডাভোস গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানেই বৈশ্বিক নীতির ভাষা নির্মিত হয়। রাষ্ট্রপ্রধান, করপোরেট নেতৃত্ব, সামরিক শিল্প এবং প্রযুক্তি পুঁজির প্রতিনিধিরা একত্র হয়ে ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তের দিকনির্দেশ স্থির করেন। পরে সেই সিদ্ধান্ত গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতর দিয়ে বাস্তবায়িত হয়।

আজকের ডাভোস এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। এখানে আমরা কেবল কূটনৈতিক ভদ্রতা দেখি না। আমরা দেখি শক্তির সরাসরি উচ্চারণ। কোন অঞ্চল কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোন প্রতিষ্ঠান অকার্যকর। কোন জোট কতটা দায় নেবে। এসব কথা আজ আর আড়ালে থাকে না। প্রকাশ্যে বলা হয়।

এই প্রেক্ষাপটে ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনো ব্যতিক্রম নন। তিনি একটি দীর্ঘদিনের পরিবর্তনের প্রকাশ্য রূপ। গাজা, জাতিসংঘ, ন্যাটো বা গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তার বক্তব্য যতটা না নতুন, তার চেয়ে বেশি নগ্ন। আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার কিংবা বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলো আজ শক্তিধর রাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের অধীন। ট্রাম্প যা বলেন প্রকাশ্যে, অন্যরা তা করে নীরবে।

জাতিসংঘ আজ আর নৈতিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করতে পারছে না। ভেটো ক্ষমতা ও শক্তির রাজনীতি তাকে কার্যত অকার্যকর করে তুলেছে। এখানে ন্যায় মুখ্য নয়। ভারসাম্যই মুখ্য। ফলে গাজার মতো সংকটে জাতিসংঘের অসহায়ত্ব কোনো দুর্ঘটনা নয়। এটি একটি কাঠামোগত পরিণতি।

গ্রিনল্যান্ডের প্রশ্ন এই ক্ষমতার রাজনীতিকে আরও স্পষ্ট করে। এখানে মানবিকতা মুখ্য নয়। ভূরাজনীতি মুখ্য। আর্কটিক অঞ্চল, প্রাকৃতিক সম্পদ, সামরিক অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ বাণিজ্য পথকে কেন্দ্র করে নতুন মানচিত্র আঁকা হচ্ছে। মানুষের মতামত সেখানে গৌণ হয়ে পড়ছে।

ন্যাটোর ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা। কাগজে কলমে এটি সম্মতির জোট। বাস্তবে এটি একটি শক্তিনির্ভর কাঠামো। নিরাপত্তা বলতে আজ আর মানুষের জীবনমান বোঝানো হয় না। নিরাপত্তা মানে অস্ত্র, বাজেট এবং প্রস্তুতি। নিরাপত্তা মানে ভয় টিকিয়ে রাখা।

এই সবকিছুর ভেতর দিয়ে রাষ্ট্রের চরিত্র বদলে যাচ্ছে। রাষ্ট্র আর জনগণের প্রতিনিধি নয়। রাষ্ট্র হয়ে উঠছে বৈশ্বিক পুঁজি ও সামরিক শক্তির মধ্যস্থতাকারী। নাগরিক তখন আর রাজনৈতিক সত্তা নয়। সে নীতির দর্শক।

এখানেই রাষ্ট্রের বৈধতার সংকট।

আধুনিক রাষ্ট্র তার বৈধতা দাবি করে জনগণের সম্মতি থেকে। কিন্তু যখন ভোটে সরকার বদলায়, অথচ নীতির দিক বদলায় না, তখন সেই বৈধতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। রাষ্ট্র দ্বৈত চরিত্র ধারণ করে। একদিকে গণতন্ত্র। অন্যদিকে জনগণের বাইরে গড়ে ওঠা সিদ্ধান্ত।

এই দ্বৈততা রাষ্ট্র ও মানুষের সম্পর্ককে দুর্বল করে। মানুষ রাষ্ট্রকে নিজের বলে অনুভব করে না।

নিরাপত্তার প্রশ্নেও একই বিভ্রান্তি। অস্ত্র নিরাপত্তা আনে না। অনিরাপত্তা দীর্ঘায়িত করে। যে রাষ্ট্র হাসপাতাল দুর্বল রেখে অস্ত্র মজুত করে, সে রাষ্ট্র নিরাপত্তার নামে জীবনের ঝুঁকি বাড়ায়। মানুষের অভিজ্ঞতায় নিরাপত্তা মানে কাজ, চিকিৎসা, শিক্ষা, মর্যাদা এবং ভয়হীন ভবিষ্যৎ।

গণতন্ত্রের ক্ষেত্রেও ফাঁক স্পষ্ট। ভোট দেওয়া আর অংশগ্রহণ এক নয়। মানুষ ভোট দেয়। প্রতিবাদ করে। তবু সিদ্ধান্ত বদলায় না। এতে নাগরিক ধীরে ধীরে নীরব দর্শকে পরিণত হয়। এই দর্শকত্বই রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।

এই বৈশ্বিক বাস্তবতার প্রতিফলন বাংলাদেশে স্পষ্ট।

বাংলাদেশে রাষ্ট্র আছে, কিন্তু রাষ্ট্রচিন্তা সংকুচিত। নির্বাচন হয়, কিন্তু নীতিনির্ধারণে জনগণের উপস্থিতি দুর্বল। উন্নয়ন হয়, কিন্তু উন্নয়নের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে একটি সীমিত গোষ্ঠী। নিরাপত্তা ব্যাখ্যা করা হয় নিয়ন্ত্রণের ভাষায়, জীবনের ভাষায় নয়।

রাষ্ট্র এখানে জনগণের প্রতিনিধি নয়। রাষ্ট্র এখানে একজন ব্যবস্থাপক। বৈশ্বিক অর্থনীতি, ঋণ, বিনিয়োগ এবং কৌশলগত সম্পর্কের চাপে রাষ্ট্র নাগরিকের প্রশ্নকে গৌণ করে ফেলে। ফলে রাষ্ট্র শক্তিশালী দেখালেও মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।

সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে নীরবতা। মানুষ রাজনীতি থেকে দূরে সরে যায়। রাষ্ট্রকে নিজের বলে দাবি করে না। এই নীরবতাই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তোলে।

এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে নতুন রাষ্ট্রচিন্তা জরুরি।

এই রাষ্ট্রচিন্তা বলবে, রাষ্ট্রের কেন্দ্রে মানুষ থাকবে, পুঁজি নয়। এটি বলবে, নিরাপত্তা মানে অস্ত্র নয়, জীবন। এটি বলবে, গণতন্ত্র মানে শুধু ভোট নয়, অংশগ্রহণ। এটি বলবে, রাষ্ট্র জবাবদিহি করবে জনগণের কাছে, বৈশ্বিক ক্ষমতার কাছে নয়। এটি বলবে, উন্নয়ন পরিমাপ হবে মর্যাদা ও ন্যায়ের ভিত্তিতে।

এটি কোনো হঠাৎ বিপ্লবের ডাক নয়। এটি ধীর কিন্তু মৌলিক পরিবর্তনের আহ্বান।

এই লেখা কোনো দলীয় ইশতেহার নয়। এটি একটি সময়োপযোগী রাজনৈতিক বার্তা। এই আহ্বান ক্ষমতার কেন্দ্রের উদ্দেশ্যে নয়। এই আহ্বান নাগরিকের উদ্দেশ্যে।

কারণ রাষ্ট্র তখনই বদলায়, যখন মানুষ রাষ্ট্রকে নিজের বলে দাবি করে।

আমাদের দরকার এমন রাষ্ট্র, যেখানে রাজমিস্ত্রির সন্তান সংসদে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে এবং সেই স্বপ্নকে অস্বাভাবিক মনে করা হয় না। যেখানে কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, নার্স এবং শিক্ষার্থী রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অংশ নেয়।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সরল। রাষ্ট্র কি মানুষের জন্য, না মানুষ রাষ্ট্রের জন্য। এই প্রশ্নের উত্তরই আমাদের সময়কে সংজ্ঞায়িত করবে।

রহমান মৃধা গবেষক ও লেখক সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন

[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। দৈনিক কালবেলার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, দৈনিক কালবেলা কর্তৃপক্ষের নয়। ]
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

কেন্দ্রীয় যুবদলকে স্বাগত জানিয়ে সাতক্ষীরায় জেলা যুবদলের র‍্যালি

চলতি মাসেই ভারতীয় হাইকমিশনারের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন দীনেশ ত্রিবেদী

বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৬ / সবুজ পরিবেশ, নিরাপদ কৃষি ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশই আমাদের প্রত্যাশা

প্রধানমন্ত্রীর লাল টেলিফোনের তার চুরি, ৫ দিনের রিমান্ডে দুই আসামি

১৫ বছর পর বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখল অস্ট্রেলিয়া

সীমান্তবর্তী এলাকায় টহল ও নজরদারি জোরদার

ব্রাজিলের বিখ্যাত ভবিষ্যৎদ্রষ্টার মতে এবার বিশ্বকাপ জিতবে পর্তুগাল

দৌলতদিয়ার বাস ডুবির ঘটনায় দুটি তদন্ত কমিটি গঠন : নৌ প্রতিমন্ত্রী

আর্জেন্টিনার সামনে সেই পুরোনো অভিশাপ

তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থীদের পাশে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় : উপাচার্য 

১০

বিশ্বকাপে ভুভুজেলা নিষিদ্ধ করল ফিফা, কঠোর হচ্ছে স্টেডিয়াম প্রবেশনীতি

১১

ভেঙে গেল জার্মানীর বিশ্বকাপজয়ী তারকার দুই দশকের সংসার

১২

আম খাওয়ার পর ভুলেও খাবেন না এই ৫ খাবার

১৩

অবশেষে ‘অলৌকিক’ সেই গাছ নিয়ে রহস্যের অবসান

১৪

অস্ত্র নামাবে না হামাস, সামরিক অস্ত্রভাণ্ডারের সিদ্ধান্তও আলোচনা ছাড়া নয়

১৫

জিমেইল হ্যাক করে ব্যাংক থেকে টাকা আত্মসাৎ, মূলহোতাসহ গ্রেপ্তার ২ 

১৬

বাসযোগ্য পৃথিবী গড়তে বৈশ্বিক সহযোগিতার আহ্বান পরিবেশ প্রতিমন্ত্রীর

১৭

সাহারা মরুভূমিতে ট্রাক বিকল, তৃষ্ণায় প্রাণ গেল ৪৯ যাত্রীর

১৮

লেবাননে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী নিহতের ঘটনায় মিসরের নিন্দা

১৯

রাজনীতি ও গণতন্ত্রকে ধ্বংসে সুপরিকল্পিত চক্রান্ত চলছে : মির্জা ফখরুল

২০
X