সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
প্রকাশ : ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:৪৪ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও আসাদের আত্মত্যাগ

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও আসাদের আত্মত্যাগ

আসাদুজ্জামান যেদিন শহীদ হয়, সেদিন কিছু একটা ঘটবে এমন মনে হয়েছিল। কেমন করে ঘটবে, কী ঘটবে তা বোঝা যায়নি, তবে কিছু একটা ঘটবে এমন একটা অনুভব ছিল মানুষের মনে। অন্তত আশাটা ছিল, মানুষের অসন্তোষের পটভূমিতে।

তারপর যখন ঘটল সেই ঘটনা, আসাদের মৃত্যু, তখন দেখা গেল সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে আন্দোলনের প্রকৃতি। কর্তৃপক্ষ হয়তো আশা করেছিল স্তিমিত হয়ে যাবে আন্দোলন, প্রবল বাধার মুখে অব্যাহত থাকবে না তার প্রবাহ। দেখা গেল উল্টো ঘটনা ঘটেছে সম্পূর্ণ। আসাদের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে কোথায় গেল পাহারা, কোথায় নিষেধাজ্ঞা।

আন্দোলনটা কীসের ছিল? ছিল কি শুধু আইয়ুব খান-মোনেম খাঁকে সরানোর? পুরাতন বীরের জায়গায় নতুন বীর সৃষ্টির? অবশ্যই এত সামান্য ছিল না এ আন্দোলন। ব্যাপকতার দিক থেকে ঊনসত্তরের আন্দোলন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে ছাড়িয়ে গেছে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন পূর্ব বাংলায় প্রথম গণতান্ত্রিক অসাম্প্রদায়িক আন্দোলন, কিন্তু সে আন্দোলনও বায়ান্নতে ছিল মূলত ছাত্রদেরই আন্দোলন। পরে বায়ান্নের সম্ভাবনা বিকশিত হয়ে উঠেছে ঊনসত্তরে। ঊনসত্তরের আন্দোলনে সাধারণ মানুষ অনেক বেশি সংখ্যায় অংশগ্রহণ করেছে—এ আন্দোলন ছিল সাধারণ মানুষের জীবনের অপরিসীম দুর্গতির অবসান ঘটানোরই আন্দোলন।

সাধারণ মানুষ বলতে নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও বিত্তহীনদেরই বোঝায়। বস্তুত নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও বিত্তহীনের মধ্যে তফাত শুধু নামেরই। আমাদের দেশে নিম্ন-মধ্যবিত্তের যে দুর্ভোগ, তা বিত্তহীনের তুলনায় কম নয় বরং বেশিই। কেননা, নিম্ন-মধ্যবিত্তের দায় আছে একটা কৃত্রিম লজ্জাবোধের, তার জীবনে অভাব তো আছেই, সঙ্গে আছে প্রকাণ্ড একটা অভাববোধও। আইয়ুব খান, মোনেম খাঁর রাজ্যকালের অভিশাপ যেটুকু তার প্রায় সবটুকুই গেছে এ সাধারণ মানুষের ওপর দিয়ে, নইলে উচ্চবিত্তরা তো বটেই, মধ্যবিত্তদেরও একটা বড় অংশ বাড়তি আয় ও উঠতি সুযোগের মধ্য দিয়ে যে পরিমাণ সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য যতটা গুছিয়ে নিয়েছে এর আগের কোনো দশ বছরে ততটা নিতে সক্ষম হয়েছে কি না সন্দেহ। আত্মার তথাকথিত স্বাধীনতার প্রশ্নটা দেহের প্রয়োজন মিটলে তবেই আসে, তার আগে নয়, অভুক্ত মানুষের আত্মা নেই। নিষ্পিষ্ট সাধারণ মানুষের জন্যই ছিল ঊনসত্তরের আন্দোলন। কিন্তু তবু সাধারণ মানুষ প্রথমে এতে অংশ নিতে পারেনি। পারার কথাও নয়। ছাত্ররাই আন্দোলন শুরু করেছিল, যেমন অতীতে করেছে, প্রত্যেকবারই। আসাদুজ্জামান যখন শহীদ হলো তখন এই আন্দোলন আগুনের মতো চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল, সাধারণ মানুষের আন্দোলনে পরিণত হলো।

এ আন্দোলন অহিংস ছিল না। হিংসা আমরা ভয় করি, আমরা বলে থাকি, হিংস্রতা ঘৃণার্হ। অবশ্যই। কিন্তু প্রতিদিন নীরবে নিঃশব্দে যে হিংস্রতা চলছে মানুষের মনুষ্যত্বের ওপর, তাকে আমরা দেখি না, দেখার সময় পাই না, সুযোগ পাই না। দুর্বল প্রবলকে বহন করে চলছে—এই চিত্র, এই দৃশ্য আমাদের অর্থনীতি ও সমাজনীতির প্রধান চিত্র। এ হৃদয়হীন বর্বরতাকে আমরা মেনে নিয়েছি। আসাদুজ্জামান মানতে পারেনি। তার কাছে অসহ্য মনে হয়েছিল এ ব্যবস্থা। সেজন্য যোগ দিয়েছিল আন্দোলনে। যোগ দিয়েছিল অচেনা-অজানা আরও অনেক মানুষ। আমরা তাদের চিনি না, চিনলেও জানি না। দেশময় যে ভয়াবহ অন্ধকার কায়েম হয়ে আছে অনেক আসাদুজ্জামান তার মধ্যে থেকেই আলোর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শিখা প্রজ্বলিত করার সাধনা করছে। এ আলোকটাকে, আলো জ্বালার এই চেষ্টাটাকে, আমরা দাম দিই না। আমাদের ধারণা, বিদ্যালয়ে শিক্ষার যে ছোট ছোট মুদি-দোকান খোলা হয়েছে আলো বিতরণের একচেটিয়া ব্যবসায়, সেসব দোকানেরই। অথচ দুষ্ট পণ্য ও অসৎ ব্যবসায়ের যুগে আলোর নামে যে অন্ধকার সরবরাহ করা হচ্ছে, সেদিকটায় খেয়াল করার মতো সতর্কতা নেই। যাকে আমরা বলি শিক্ষার আলো তার যথেষ্ট মর্যাদা আছে দেশে, কিন্তু সাধারণ মানুষের দুর্গতি ঘোচানোর জন্য যে আত্মত্যাগ, যে আত্মত্যাগের নির্মল শিখা অন্ধকারের প্রতাপকে উপেক্ষা করে নীরবে, তার কোনো মর্যাদা নেই। আত্মত্যাগ নিঃশব্দেই সম্পন্ন হয়, প্রচলিত ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টাই শুধু নানানভাবে, তর্জনে-গর্জনে আত্মপ্রচার করতে থাকে। আসাদুজ্জামানও লোকচক্ষুর বাইরেই থাকত, যদি না ওই প্রচণ্ড বিস্ফোরণের অগ্ন্যুৎসবে আমরা তার মুখ দেখতে পেতাম। আসাদের মুখ একটি মুখ নয়, অনেক মানুষের মুখ, অনেক আত্মত্যাগীর, অনেক সংগ্রাম নিযুক্তের। সেখানেই এ মুখ অসাধারণ।

এমনিতে আসাদুজ্জামান অসাধারণ কিছু ছিল না। ছিল এ দেশেরই সাধারণ একজন ছাত্র। বিদ্যা বা বুদ্ধিতে অসামান্য নয় মোটেই। কিন্তু ওই যে হৃদয় দিয়ে দেখেছিল, দেখতে পেয়েছিল প্রচলিত-ব্যবস্থায় বর্বর হিংস্রতাকে, দেখতে পেয়ে ফিরিয়ে নিতে পারেনি চোখ, পালিয়ে যেতে পারেনি নিজের উপলব্ধির কাছ থেকে; সেখানেই, সেই হৃদয়বানতাতেই অসামান্য হয়ে উঠেছে সে। নইলে তার বয়সের আর পাঁচজনের মতোই হওয়ার কথা ছিল আসাদুজ্জামানের। উপার্জনের পথ খুঁজে নিতে পারত একটা, বিয়ে করত সুবিধামতো, তারপর সন্তানের পিতা হওয়া, গার্হস্থ্য জীবনযাপন করা, সম্ভব হলে আত্মীয়স্বজনকে কিছুটা সাহায্য করা। এই দীর্ঘকাল ধরে নির্ধারিত ছকের মধ্যেই জীবন কেটে যেত, যেমন কেটে যায় অসংখ্যজনের। আসাদুজ্জামানের কাটেনি।

আসাদুজ্জামানের অসাধারণত্বের প্রেক্ষিতটার দিকে তাকিয়ে দেখা যেতে পারে। শিক্ষকের পুত্র ছিল, তার সময়ে অন্য একজন শিক্ষক-সন্তান, নাম তার খোকা। খোকা নিহত হয়েছে আততায়ীর হাতে। খোকার মতোও হতে পারত আসাদ, কেউ কেউ হয়েছে বৈকি। আইয়ুব খান তার স্বঘোষিত বিপ্লবের পরে ঘোষণা করেছিলেন, শিক্ষাকেই তিনি প্রথম ও প্রধান গুরুত্ব দেবেন। মিথ্যা বলেননি। দিয়েছিলেন বটে গুরুত্ব। শিক্ষাব্যবস্থার যত প্রকার অনিষ্টসাধন করা সম্ভব তা করে। ছাত্রদের প্রলোভন দিয়েছেন কল্পনীয়-অকল্পনীয় নানা উপায়ে। প্রশ্রয়-পৃষ্ঠপোষকতার জাদুকরী স্পর্শে স্কুলের শিক্ষকের একদা-শান্ত ছেলেটি শহরে এসে নিকৃষ্টতম দুর্বৃত্তে পরিণত হয়েছে। যারা হয়নি তারা ব্যস্ত থেকেছে নিজের উন্নতি সাধন করার সার্বক্ষণিক কর্মে। আত্মসুখসন্ধানের ব্যাপারে এই দুই দলে, দুর্বৃত্তে ও স্বার্থপরে, একটা সাদৃশ্য আছে বড় রকমের। আসাদুজ্জামানের অসামান্যতাটাকে এ পটভূমিতেই দেখতে হবে। অপকর্ম ও উদাসীনতা নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল, আসাদুজ্জামান নিয়মকে মানেনি। আত্মত্যাগ আরও এক প্রকারের আছে। যারা সংসারী, গৃহী, তারা আত্মত্যাগ করেন না এমন নয়। অবস্থার নির্মম হাতে তারা নিগ্রহ ভোগ করেন না এটা সত্য নয়। কিন্তু তারা প্রচলিত ব্যবস্থার একটা অংশ মাত্র। এ ব্যবস্থার বাইরে কোনো ব্যবস্থা থাকা সম্ভব এ কথাটা তারা ভাবেন না, ভাবলেও তাকে সম্ভব করে তোলার জন্য চেষ্টা করেন না। আসাদরা ভাবে, চেষ্টাও করে এবং তারা মনে করে ব্যবস্থাটা বদলাবে না কিছুতেই যদি না সমবেতভাবে চেষ্টা করি। এ সমবেত চেষ্টা, অনেক হাতে হাত মিলিয়ে ধাক্কা দেওয়া, এ কাজটার নামই আন্দোলন। আসাদুজ্জামানের আত্মত্যাগ এ বিশেষ পথেরই। কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনে তো কোনো পরিবর্তন আসেনি।

দুই.

মানুষের মনে যে অনেক অসন্তোষ জমেছিল, এ খবরটা সবাই জানতেন। মুখের কথায় এ অসন্তোষের প্রকাশ দেখেছি, প্রকাশ দেখেছি লেখকের লেখাতেও। কিন্তু সে অসন্তোষ যে এত প্রবল ও গভীর ছিল সেটা জানা ছিল না অনেকেরই। এর মাপজোখ মানুষের কথাতে প্রকাশ পেয়েছে হয়তো কখনো কখনো, কিন্তু লেখকের লেখাতে তেমন প্রকাশ পায়নি। বোধকরি সম্পূর্ণ প্রকাশ করা সম্ভবপরও নয়। জীবনের সত্য অনেক সময়েই শিল্পের প্রকাশ-ক্ষমতাকে ছাড়িয়ে ছাপিয়ে চলে যায়, গেছে এ ক্ষেত্রেও। আওয়ামী লীগের ছয় দফা অসন্তোষেরই মানচিত্র, সেটা গ্রহণযোগ্য ছিল সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত। একাত্তরের মার্চ মাসে সে মানচিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে, মানুষের চেতনা ও বিক্ষোভ অনেক অনেক দূর এগিয়ে গেছে ছয় দফাকে ছাড়িয়ে। ছাত্রদের এগারো দফাকেও পেছনে ফেলে। ঊনসত্তর সালেও গণআন্দোলন হয়েছে এ দেশে। সেই আন্দোলন থামল যখন, অনেকেই তখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন। সম্পত্তিবানরা ভেবেছেন, নিঃশেষিত হয়েছে আন্দোলনের শক্তি। কিন্তু কোথায় শেষ? অন্তঃসলিলা নদী আরও বেশি বেগবান হয়েছে ভেতরে ভেতরে, ঊনসত্তরে যেখানে শেষ হয়েছে আন্দোলন, সেখান থেকেই আবার শুরু হয়েছে একাত্তরে, অতিঅল্প সময়ে অতিদ্রুত এগিয়ে গেছে অনেকটা পথ। অসন্তোষের ফল্গুধারায় পুরাতনের ভিত নড়ে নড়ে উঠেছে। ঊনসত্তরে তবু মোনেম খাঁ ছিলেন, ছিল পুলিশের লাঠি, ইপিআরের রাইফেল, ছিল গোয়েন্দাদের গোপন তৎপরতা, কনভেনশন লীগের উঁচুগলা চিৎকার। একাত্তরে প্রতিরোধ ও বিভেদ নিশ্চিহ্ন হয়ে উড়ে গেছে। উড়ে গেছে হতাশাবাদীর নিরুৎসাহ, উন্মাসিকের তর্ক, উড়ে গেছে এমনকি হিসেবির হিসাবও। অনেক যন্ত্র ছিল এ দেশে মানুষের জন্য মোহ সৃষ্টির: ছিল বেতার প্রতিষ্ঠান, টেলিভিশন কেন্দ্র, ছিল পত্রপত্রিকা, ছিলেন লোভী বুদ্ধিজীবী। একাত্তরের মার্চে সব বদলে গেছে।

এই আন্দোলন কাদের? আন্দোলনবঞ্চিত মানুষের। যারা সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত, তারাই ছিল সবচেয়ে বেশি বিক্ষুব্ধ। মিছিলের সর্বাগ্রে ছিল তারাই, বুলেটের সামনেও তারাই। তারাই ছিল আপসের ব্যাপারে সবচেয়ে অনমনীয়। এই প্রথম তারা সুযোগ পেয়েছে ব্যাপক হারে, বিপুল হারে বেরিয়ে আসার। দুর্বলতা ছিল, সংগঠন ছিল না শক্ত, নেতৃত্ব ছিল অনিশ্চিত, দোদুল্যমান ও আপসকামী। কিন্তু সেই দুর্বলতার জন্যই অসন্তোষ আরও বড় করে চোখে পড়েছে, যেমন দেহ চোখে পড়ে যন্ত্রের অপ্রতুলতায়। এ দেশের সাধারণ মানুষের জীবনে দেশের তথাকথিত উন্নতির কোনো ঢেউই লাগেনি, এ দেশের সাধারণ মানুষ নিজেরা অভুক্ত থেকে সেনাবাহিনীর রসদ জুগিয়েছে, জুগিয়েছে অস্ত্র, একাত্তর সালের মার্চ মাসে সেই অস্ত্র, তাদের দিকেই ফিরে এসেছে। এ আন্দোলনে অস্থিরতা ছিল, ছিল চঞ্চলতা, কিন্তু সব অস্থিরতা ও চাঞ্চল্যের মধ্যে স্থির হয়েছিল অধিকার আদায় করার সংকল্প। নেতৃত্বে দ্বিধা ছিল, সন্দেহ ছিল, ভয় ছিল অবশ্যই, কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে এসব কিছুই ছিল না। আন্দোলনে ক্রোধ ছিল নিশ্চয়ই, কিন্তু তার চেয়েও বেশি করে ছিল সৃজনশীলতা। ক্রুদ্ধ মানুষ গাছ কেটে, ইট বিছিয়ে, রাস্তা খুঁড়ে ব্যারিকেড তৈরি করে যখন-তখন সেটা ধ্বংস নয়, সৃজনই; তার মধ্যে ধ্বংসাত্মক শক্তি প্রকাশ পায় না, প্রকাশ পায় সৃজনোন্মুখ চেতনা। এ আন্দোলন পুরো দেশজুড়ে একটা নতুন চেতনার জন্ম দিয়েছে। একে বলতে পারি একটা নবীন ঐক্য চেতনা, দেশাত্মবোধের। উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণা অনেক হয়েছে, কিন্তু সব মানুষ দেশকে এমন করে চিনতে বা তার সঙ্গে এমনভাবে একাত্ম হতে আগে কখনো পারেনি—একাত্তরের মার্চে যেমন পেরেছে। এ বোধের প্রকাশ চারদিকে দেখেছি, কিন্তু এর ভেতরে যে প্রতিশ্রুতি আছে, তা প্রকাশের তুলনায় অনেক বেশি ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী তাৎপর্যসম্পন্ন। দেশাত্মবোধের এ নতুন অনুপ্রেরণা উৎপাদন ব্যবস্থায় যদি নিয়োজিত হয় তবে উৎপাদনের কাজ যান্ত্রিক থাকবে না, উৎপাদন করা অর্ধোৎসাহ বা নিরুৎসাহ কর্তব্য-সম্পাদনের প্রাণহীন স্তরে থাকবে না, সে কাজ জীবনের কাজ, প্রাণবন্ত কাজ, উৎসাহের কাজে পরিণত হবে।

মানুষের ঐক্যে রাজনীতি বাঁচার নীতিতে উন্নীত হয়েছে। এই ঐক্যের সামনে পরাক্রমশালী সামরিক শক্তি যান্ত্রিক শক্তি বৈ নয়। বঞ্চিত মানুষের ঐক্য স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু একাত্তরে দেখেছি যারা সম্পন্ন লোক, যারা সুযোগপ্রাপ্ত তারাও এসে যোগ দিয়েছে জনতার আন্দোলনে। এসেছেন তারাও যারা মোহগ্রস্ত, ছিলেন, ছিলেন মোহসৃষ্টির কাজে জড়িত, ছিলেন আত্মসন্তুষ্ট, ক্ষমতার দ্বারা উত্তপ্ত। কেউ কেউ ভয় পেয়ে এসেছেন এটা ঠিক, কেউ কেউ চাপে পড়ে যোগ দিয়েছেন তাও সত্য, কিন্তু মোহ যে সত্যি ভেঙে গেছে অনেকেরই; সে কথাও মিথ্যা নয়। যতই ক্ষমতাবান হোক তবু যে ক্রীড়নক মাত্র—এ সত্যটা ধরা পড়ে গেছে, অন্যের চোখে শুধু নয়, নিজের চোখেও; যা লেগেছে আত্মমর্যাদায়। আত্মমর্যাদাবোধ যে তাদেরও ছিল, সেটা জানা গেছে একাত্তরের মার্চে। সাহেব ও সাহেবের পিয়ন একই সঙ্গে একই কথা বলেছেন। পরস্পর তারা অনেক দূরে ছিলেন পরস্পরের, সাতচল্লিশের স্বাধীনতা লাভের পর প্রতিদিন তারা আরও দূরে সরে গেছেন পরস্পরের, একাত্তরে স্বাধীনতা লাভের নতুন লগ্নে তারা নিকটবর্তী হয়েছেন—অভাবিতপূর্ব রূপে।

বস্তুত একাত্তরের মার্চে যে শুধু পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যেই পুরাতন সম্পর্কের জায়গায় নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলার কাজ চলেছে তা নয়, কাজ চলেছে মানুষে মানুষে নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও।

আন্দোলনে স্বার্থবুদ্ধি যে ছিল না, তা বলা যাবে না। ব্যবসায়ীরা কি ছিল না? ছিল না কি দুর্বৃত্তরা? নিশ্চয়ই ছিল। তারা সুযোগ খুঁজেছে, এখন যতটা না সুবিধা করতে পারছে দুদিন পর আন্দোলনের বহিঃপ্রকাশ কিছুটা স্তিমিত হয়ে এলে তার চেয়ে বেশি সুবিধা করার আশা রেখেছে। তা রাখুক, অসন্তোষের যে ফল্গুধারা সামরিক শক্তির মোকাবিলা করেছে, সে ধারা এদেরও ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারবে নিশ্চয়ই। পারে যাতে সেদিকটায় লক্ষ রাখা কর্তব্য হবে সব মানুষের।

একাত্তরের মার্চে মনে হয়েছে চতুর্দিকের অভ্যুত্থানে আর্তনাদ নেই, আছে নিজেদের হারানো অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার অবিচল সংকল্প। শোণিতে-অশ্রুতে আন্দোলনের জয় লিখিত হয়েছে, সাধারণ মানুষ উদ্যত হয়েছে ছিনিয়ে আনবে ক্ষমতা। প্রতিষ্ঠা করবে কর্তৃত্ব, নিজেদের। নেতৃত্ব মনে হয়েছে চলে যাচ্ছে তাদের হাতে। উদ্যম ও অগ্রসরমানতা, শক্তি ও সাহস—সবকিছু এসেছে তাদের কাছ থেকে। মনে হয়েছে নতুন সমাজের ভিত তৈরি হচ্ছে পুরাতন সামাজিক সম্পর্কের সূত্রগুলো বিধ্বস্ত করে দিয়ে। ঊনসত্তর পূর্ণ হয়েছে একাত্তরে। কিন্তু মৃত্যুর শক্তি পরাভূত হয় না অত সহজে। জীবনের জয় দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে মৃত্যু, সে ঝাঁপিয়ে পড়েছে সেখানে, যেখানে জীবন ছিল প্রবলরূপে জীবন্ত, সেসব এলাকার, যেখান থেকে ঢেউয়ের পরে ঢেউয়ের মতো আসছিল আন্দোলনের আঘাত। পড়েছে ছাত্রদের ওপর, শ্রমিকদের ওপর, বিশেষভাবে যুবকদের ওপর—সব শ্রেণির। জীবনের সঙ্গে মৃত্যুর প্রত্যক্ষ সামনাসামনি জীবনমরণ এ সংগ্রামে রক্তক্ষয় হয়েছে অসামান্য। মৃত্যুর শক্তি—হানাদার বাহিনী, রাজাকার, আলবদর, শান্তি কমিটি—প্রাণপণ আঘাত হেনেছে। শেষ পর্যন্ত যা হওয়ার তা-ই হয়েছে, জয় হয়েছে জীবনের। কিন্তু ক্ষমতা এখনো আসেনি সাধারণ মানুষের কাছে, কর্তৃত্ব এখনো প্রতিষ্ঠা হয়নি তাদের। পুরাতন সামাজিক সম্পর্কগুলো আবার ফিরে এসেছে নতুন বেশ ধারণ করে।

লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

পোস্টার-শোডাউন এড়িয়ে যে অভিনব কৌশলে প্রচারণায় নেমেছেন জারা

ভোট কেন্দ্র দখলের ষড়যন্ত্র রুখে দেবে জনগণ : নাহিদ ইসলাম

সকালে খালি পেটে যে ৭ অভ্যাস শরীরের ক্ষতির কারণ

মঙ্গলবার রাজধানীর যেসব এলাকার মার্কেট বন্ধ

ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট আউটলেটে চাকরির সুযোগ

২৭ জানুয়ারি : আজকের নামাজের সময়সূচি

বাংলাদেশ সরে দাঁড়ানোয় সুযোগ পাওয়া স্কটল্যান্ডের বিশ্বকাপ দল ঘোষণা

সুপার সিক্সে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ যারা

শাবিপ্রবিতে ভর্তি শুরু ৩ ফেব্রুয়ারি

সরিষা ফুলের হলুদ মোহ দেখতে দর্শনার্থীদের ভিড়

১০

একীভূত হচ্ছে সরকারের ৬ প্রতিষ্ঠান

১১

সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ম খা আলমগীরসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে ইইউবি’র মামলা

১২

বিশ্বকাপে না থাকা বাংলাদেশের প্রতি যে বার্তা দিল স্কটল্যান্ড

১৩

দেশে মাদক সেবনকারী ৮২ লাখ, প্রায় ৬১ লাখই গাঁজাখোর

১৪

চমক রেখে বিশ্বকাপের জন্য দল ঘোষণা ওয়েস্ট ইন্ডিজের

১৫

একটি দল নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র করছে : দুলু

১৬

ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি রাশেদ গ্রেপ্তার

১৭

ছবি তোলায় আদালত চত্বরে সাংবাদিকের ওপর হামলা বিআরটিএ’র কর্মকর্তার

১৮

৫ শীর্ষ ব্যবসায়ীর সঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের ঘণ্টাব্যাপী বিশেষ বৈঠক

১৯

আগামীতে নারীদের প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনা আছে : জামায়াত

২০
X