

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ঘোষণা করেছে, রাজধানীর ফুটপাত ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনার উদ্দেশ্যে ব্যবসায়ীদের তালিকাভুক্ত করে লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পথচারীদের চলাচলের জায়গা ব্যবসায়ীদের পাকাপোক্তভাবে লাইসেন্স সরবরাহ করে ফুটপাতে শৃঙ্খলা ফিরবে—নাকি ফুটপাতের ওপর এসব ব্যবসায়ীর একচ্ছত্র অধিকার তুলে দিয়ে পথচারীদের জন্য নতুন বিড়ম্বনার সৃষ্টি করবে, তা অবশ্য সময়ই বলতে পারবে।
গতকাল বুধবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে ফুটপাত দখলমুক্ত করে নান্দনিক পরিবেশ তৈরির একটি পাইলট প্রকল্প উদ্বোধন শেষে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) প্রশাসক মো. আবদুস সালাম এ উদ্যোগের কথা জানান। তার ভাষ্যে, ফুটপাত যেন পথচারীদের জন্য অনুপযোগী হয়ে না পড়ে, সেজন্য নির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স দেওয়া হবে। যে কোনো ধরনের ব্যবসার মতো ফুটপাতেও ব্যবসা করতে হলে সিটি করপোরেশনের অনুমতি নিতে হবে। নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে জনগণ ও সিটি করপোরেশনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। ‘ফিফটি-ফিফটি’ অংশীদারত্বের মাধ্যমে একটি বাসযোগ্য শহর গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি। সীমিত জায়গায় অতিরিক্ত দোকান বসা ঠেকাতে কোথায় এবং কীভাবে হকাররা বসবেন, সে বিষয়ে গাইডলাইন তৈরি করা হবে।
আমরা জানি, রাজধানী ঢাকার চিরচেনা চেহারা হচ্ছে জনাকীর্ণ ফুটপাত। ফুটপাতের এ পরিস্থিতির জন্য সাধারণ পথচারীদের চেয়ে বেশি ভূমিকা থাকে হকার বা ভাসমান ব্যবসায়ীদের। দেখা যায়, হাঁটাচলার জায়গায় পথচারীর চেয়ে হকারের সংখ্যাই বেশি। দীর্ঘকাল ধরে এ সমস্যা নিরসনে উচ্ছেদ অভিযান চললেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। তবে ডিএসসিসির ফুটপাত ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স প্রদানের ঘোষণা কি ফুটপাত ব্যবস্থাপনার জন্য উপযুক্ত উদ্যোগ, এ প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে? কেননা ফুটপাত মূলত পথচারীদের চলাচলের জন্য। আবার এটিও অস্বীকার জো নেই যে, বিশালসংখ্যক মানুষ ফুটপাতের ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। বারবার উচ্ছেদ করে তাদের জীবিকা বন্ধ করা যেমন অমানবিক; তেমনি ফুটপাত দখলও পথচারীর অধিকার হরণ এবং তাদের চলাচলকে অনিরাপদ করে তুলে। এরকম এক বাস্তবতায় আসলে সঠিক করণীয় কী, সেটা ঠিক করা জরুরি।
ফুটপাতের সময়োপযোগী উদ্যোগ যে দরকার এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। কেননা ফুটপাতের বিশৃঙ্খলা সাধারণ পথচারীদের হাঁটাচলাকে অনিরাপদ করে যে তোলে শুধু তাই নয়, চলে বেপরোয়া চাঁদাবাজি। চাঁদাবাজির সঙ্গে সাধারণত জড়িত থাকে রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহল, বিশেষ করে সরকারি দলের রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা অলিখিত এক সত্য। ফলে ফুটপাত চাঁদাবাজমুক্ত করা ও চলাচল উপযোগী করা জরুরি হলেও চ্যালেঞ্জটা বড়। অতীতে হকারদের পুনর্বাসনের অনেক চেষ্টা এ চাঁদাবাজ চক্রের কারণে ভেস্তে গেছে।
আমরা মনে করি, বিদ্যমান বাস্তবতা, অর্থাৎ পথচারীর নিরাপদ চলাচল এবং ফুটপাতের বিশালসংখ্যক মানুষের রুটিরুজির কথা বিশেষভাবে বিবেচনায় নিয়ে সঠিক করণীয় ঠিক করতে হবে, যার মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা স্থাপন গড়ে উঠবে। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারের উচিত নগর বিশেষজ্ঞ, সচেতন নাগরিক সমাজসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে করণীয় নির্ধারণ করা। স্মরণে রাখা জরুরি যে, ফুটপাতের ওপর হকারদের বৈধতা দেওয়ার অর্থ হলো লিখিতভাবে তাদের ওপর ওই জায়গার এক ধরনের অধিকার স্বীকার করা। ফলে পথচারীর চলাচল সংকুচিত হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। আমরা এমন একটি উদ্যোগ চাই, যা ফুটপাতে শৃঙ্খলা ফেরাবে, পাশাপাশি কারও রুটিরুজির ক্ষতি হবে না।