

রাজধানী ঢাকায় বিবাহবিচ্ছেদ বাড়ছে। পরিবারগুলোতে যে পরিবর্তন নীরবে ঘটছে, তা নিছক কতিপয় বিচ্ছিন্ন ঘটনার সমষ্টি নয়। এটি আমাদের সামাজিক জীবনের গভীরে জমে থাকা এক জটিল সংকটের বহিঃপ্রকাশ। দাম্পত্য সম্পর্কের ভাঙন এখন আর লজ্জা বা ব্যতিক্রম কিছু নয়, এটি ক্রমশ স্বীকৃত সামাজিক বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে। তবে এ স্বীকৃতি আমাদের স্বস্তি দেয় না; উল্টো প্রশ্ন তোলে কেন কমে যাচ্ছে আস্থা, ক্ষয়ে যাচ্ছে বিশ্বাস। কেন একই ছাদের নিচে থেকেও মানুষ একে অপরের কাছে হয়ে উঠছে অচেনা।
গতকাল কালবেলায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে আসা শিউলি কিংবা রুমানার অভিজ্ঞতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় যে, সম্পর্ক ভাঙে শুধু বড় কোনো ঘটনার অভিঘাতে নয়। অনেক সময় সম্পর্ক ভাঙে ধীরে ধীরে, নীরবে। প্রতিদিনের অল্প অল্প অবহেলা, না বলা কথা, না শোনা অনুভূতি আর একে অপরকে সময় না দেওয়ার অভ্যাস একসময় জমতে জমতে দুর্ভেদ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়। এ দেয়ালই মানুষকে আলাদা করে দেয়। বিশ্বখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী অ্যান্থনি গিডেনস আধুনিক সম্পর্ককে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, বর্তমান যুগে সম্পর্কের ভিত্তি বদলে গেছে। তার ‘pure relationship’ ধারণা অনুযায়ী, সম্পর্ক এখন টিকে থাকে যতক্ষণ তা উভয়ের জন্য মানসিকভাবে তৃপ্তিদায়ক। অতীতে যেখানে সামাজিক বাধ্যবাধকতা, পরিবার বা অর্থনৈতিক নির্ভরতা সম্পর্ককে ধরে রাখত, এখন সেখানে ব্যক্তিগত সন্তুষ্টি ও আবেগের পূর্ণতাই প্রধান হয়ে উঠেছে। ফলে সম্পর্কের ভেতরে সুখ কমে গেলে মানুষ বিচ্ছেদকে একটি গ্রহণযোগ্য পথ হিসেবে ভাবতে শুরু করে। একইভাবে উলরিখ বেক আধুনিক সমাজে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার উত্থান নিয়ে আলোচনা করেছেন। তার মতে, মানুষ এখন নিজের পরিচয়, স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত ইচ্ছাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এ প্রবণতা একদিকে ব্যক্তিস্বাধীনতাকে শক্তিশালী করেছে, অন্যদিকে সম্পর্কের ভেতরে আপস, সহনশীলতা ও পারস্পরিক ছাড় দেওয়ার মানসিকতাকে দুর্বল করেছে। আমাদের সমাজে এই বৈশ্বিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্থানীয় বাস্তবতা। নারীর শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক অগ্রগতি। তারা আর নির্যাতন, অসম্মান বা অবহেলাকে মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন না। কিন্তু সমস্যা তৈরি হচ্ছে তখন, যখন পারিবারিক ও সামাজিক মানসিকতা সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপন। মানুষ এখন ভার্চুয়াল জগতে বেশি সময় ব্যয় করছে, বাস্তব সম্পর্কের প্রতি মনোযোগ কমে যাচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে অর্থনৈতিক বাস্তবতাও। শহুরে জীবনের ব্যস্ততা, কর্মক্ষেত্রের চাপ, প্রতিযোগিতামূলক জীবনযাপন মানুষের মানসিক স্থিতি নষ্ট করছে। ক্লান্ত মানুষ ঘরে ফিরে আর সম্পর্কের যত্ন নেওয়ার শক্তি খুঁজে পায় না। ফলে সম্পর্ক ক্রমশ আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ হয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক, বিচ্ছেদের প্রভাব শিশুদের ওপর গভীরভাবে পড়ে। একটি ভাঙা পরিবারে বেড়ে ওঠা শিশু অনেক সময় নিরাপত্তাহীনতা, মানসিক চাপ ও আত্মবিশ্বাসের সংকটে ভোগে। প্রভাবিত হয় তাদের ভবিষ্যৎ। তাই বিবাহবিচ্ছেদকে শুধু ব্যক্তিগত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি সামাজিক ইস্যু।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। সম্পর্কের ভেতরে যোগাযোগ বাড়াতে হবে। একে অপরের কথা শোনা, অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং মতভেদকে সম্মানের সঙ্গে সমাধান করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। এ ছাড়া পরিবারে দায়িত্বের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কেউ নিজেকে অবমূল্যায়িত মনে না করে। পাশাপাশি সামাজিকভাবে সম্পর্কের মূল্যবোধ, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার গুরুত্ব নতুন করে তুলে ধরতে হবে। সম্পর্ককে মানবিক ও ভারসাম্যপূর্ণ পথে পরিচালিত করতে হবে। পরিবার যদি সমাজের ভিত্তি হয়, তবে তাকে টিকিয়ে রাখতে সচেতন হতে হবে।