মানুষের ক্ষত স্থানে চামড়া প্রতিস্থাপনের ইতিহাস প্রায় দেড়শ বছরের। ১৯৩৯ সালে প্রথম চামড়া ফ্রিজিং করা শুরু হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্কিন ব্যাংক একটি স্বীকৃত চিকিৎসা পদ্ধতি। সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও ভারতে এটি দীর্ঘদিন ধরে চালু রয়েছে। প্রতিবেশী ভারতে গত প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে স্কিন ব্যাংক কাজ করছে। তবে বাংলাদেশে বিষয়টি নিয়ে আলোচনাই হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে স্কিন ব্যাংক চালুর কথা বলা হলেও সম্প্রতি চালু হয়েছে। জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ১২৩৯ নম্বর কক্ষে দেশে প্রথম স্কিন ব্যাংক স্থাপন করা হয়েছে। এখানে উন্নত প্রযুক্তির ৮টি বিশেষ ফ্রিজারে চামড়া সংরক্ষণ করা হচ্ছে। এরই মধ্যে পাঁচ রোগীর শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। যার ফলে তাদের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। গুরুতর দগ্ধ রোগীদের জন্য দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার এই সংযোজন নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে, এই উদ্যোগ গুরুতর দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ব্যাংকটি কার্যকর করতে সর্বস্তরে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।
জানা যায়, গত ২২ ডিসেম্বর গরম পানিতে পুড়ে যায় দুই বছরের শিশু হামিদা। তার শরীরের ৪২ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে তার রক্তে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ দেখা দেয়। ক্ষত থেকে ক্রমাগত রক্ত ও পুঁজ বের হচ্ছিল। চিকিৎসকরা গত ১৪ জানুয়ারি স্কিন ব্যাংক থেকে সংগৃহীত চামড়া প্রতিস্থাপন করলে সংক্রমণ কমতে শুরু করে। ইনস্টিটিউটের ১৩ তলার কেবিনে চিকিৎসাধীন শিশু হামিদার শরীরের ৩৫২ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার চামড়া প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। ৮ বছর বয়সী আরেক শিশু মরিয়ম। দগ্ধ এই রোগীর শরীরের ৭৭৯ সেন্টিমিটার পোড়া অংশ ঢেকে দেওয়া হয়েছে স্কিন ব্যাংকের সংরক্ষিত চামড়া দিয়ে। তার মা মজেমা বেগম জানান, গ্যাসের চুলার আগুনে পুড়ে শরীরের ২২ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। চিকিৎসকরা চামড়া প্রতিস্থাপনের পর তার অবস্থার উন্নতি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যার শরীরের ৭০ শতাংশ পুড়ে যায়, তার শরীরের বাকি ৩০ শতাংশ চামড়া দিয়ে ৭০ শতাংশ ঢাকা সম্ভব হয় না। অথচ শরীরের যত বেশি অংশ পুড়বে, তত বেশি শরীর থেকে পানি, লবণ, প্রোটিন ও তাপ শরীর থেকে বের হয়ে যায়। মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়। রোগীর ক্ষত দ্রুত চামড়া দিয়ে ঢেকে দিতে পারলে তা মৃত্যুর ঝুঁকি কমায়। বাংলাদেশে স্কিন ব্যাংকের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হলে পোড়া রোগীদের চিকিৎসা অনেক সহজ হবে। পর্যাপ্ত দাতার অংশগ্রহণ থাকলে এটি দগ্ধ রোগীদের সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সুস্থ মানুষও চামড়া দিতে পারবেন। এ ছাড়া মৃত ব্যক্তির চামড়া অন্য যে কাউকে দেওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সব ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, পোড়া রোগীর ৭০ শতাংশেরই বয়স ১৫ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। এ বয়সই মূলত আয়-উপার্জনের মূল সময়। তাই এই মানুষদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের স্বার্থেই বাঁচাতে হবে।
স্কিন ব্যাংকের প্রশিক্ষিত সদস্য ও বার্ন ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগের আবাসিক সার্জন ডা. শাওন বিন রহমান বলেন, অল্প সময়ের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ চামড়া দিয়ে ঢেকে দিতে পারলে রোগীর মৃত্যুঝুঁকি কমে আসে। দ্রুত নতুন চামড়া তৈরিতে ভূমিকা রাখে। তিনি বলেন, একজন সুস্থ ব্যক্তি জীবনে একাধিকবার শরীরের স্কিন ডোনেট বা চামড়া দান করতে পারেন। এক্ষেত্রে দাতাকে অস্ত্রোপচার কক্ষে নেওয়ার পর প্রথমে একজন অবেদনবিদ স্পাইনে ইনজেকশন দিয়ে শরীরের নির্দিষ্ট অংশ অবশ করে নেন। এরপর প্রশিক্ষিত সার্জনরা (ডার্মাটম যন্ত্রের সাহায্যে সুবিধামতো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থেকে চামড়া সংগ্রহ করে থাকেন। চামড়া দানের পর হাসপাতালে ভর্তি থাকার প্রয়োজন হয় না। এমনকি ১৪ দিনের মধ্যে দাতার শরীরে নতুন চামড়া তৈরি হয়ে যায়।
স্কিন ব্যাংকের কো-অর্ডিনেটর ডা. মাহবুব হাসান জানান, সুস্থ ব্যক্তি জীবদ্দশায় একাধিকবার চামড়া দান করতে পারেন।
জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন বলেন, মৃত দেহ থেকে চামড়া সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কিছু শর্ত আছে। এ কারণে স্কিন ব্যাংকের কার্যক্রম গতিশীল হচ্ছে না। যন্ত্রপাতি কেনাকাটার পরও এই প্রকল্পটার অগ্রগতি করা সম্ভব হয়নি। যে সমস্ত মানুষের শরীরে অনেক চর্বি আছে, মেদ কমাতে অপারেশন করার সময় চর্বিসহ এই চামড়া ফেলে দিতে হয়। এই যে ফেলে দেওয়া চামড়া সেটা আমরা রাখছি। এভাবেই আমরা প্রাথমিকভাবে চামড়া সংগ্রহ কর। এরই মধ্যে এ চামড়া পাঁচ রোগীকে আমরা দিয়েছি।
তিনি বলেন, সুস্থ মানুষ চাইলে পোড়া রোগীকে চামড়া দিতে পারেন। এরই মধ্যে আমাদের ইনস্টিটিউটে এক রোগীকে তার বাবা মা চামড়া দিয়েছেন। এজন্য আমাদের দেশের আইন কিন্তু পরিষ্কার নয়। অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা হয়েছে। আইনগত বিষয়টা যেন পরিষ্কার করা হয়। আইনগত জটিলতা নিরসন করা গেলে আমরা আরও বেশি মানুষকে সহায়তা করতে পারব।
মন্তব্য করুন