

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক দেশের অন্যতম ব্যস্ততম সড়ক। প্রতিদিন লক্ষাধিক মানুষ এ সড়ক ব্যবহার করে রাজধানী ঢাকা ও উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় যাতায়াত করেন। বিশেষ করে টঙ্গী অংশটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, এখানে শিল্পাঞ্চল, ব্যবসা-বাণিজ্য আর জনবসতির কারণে প্রতিদিন হাজার হাজার শ্রমিক, কর্মজীবী ও সাধারণ মানুষ এ সড়ক ব্যবহার করেন। অথচ এ মহাসড়ক এখন মানুষের জন্য আশীর্বাদ নয়; বরং দুর্ভোগের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর প্রধান কারণ হলো দীর্ঘদিন চলমান বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের কাজের ধীরগতি, অদক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং সম্প্রতি অতিবৃষ্টিতে সৃষ্ট খানাখন্দ ও গর্ত। স্থানীয়রা জানান, টঙ্গী স্টেশন রোড থেকে শুরু করে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত পুরো অংশে বছরের পর বছর ধরে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। একপাশে কাজ শুরু করলেও তা আর শেষ হয় না, অন্যদিকে নতুন করে খোঁড়া হয়। রাস্তার মাঝখানে ফেলে রাখা ইটপাথর, নির্মাণসামগ্রী আর অসমাপ্ত ব্রিজ-ফ্লাইওভারের খুঁটি এখন চিরচেনা দৃশ্য। যানবাহন চলাচলের রাস্তা সরু হয়ে পড়েছে, ফলে প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত লেগেই থাকে যানজট। স্কুলগামী শিক্ষার্থী, অফিসগামী কর্মজীবী মানুষ থেকে শুরু করে শ্রমজীবী সবাইকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হয় এ মহাসড়কে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব। কয়েক দিন ধরে টানা অতিবৃষ্টির কারণে টঙ্গী অঞ্চলের সড়কের নিচে মাটি দেবে গিয়ে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও রাস্তা ভেঙে গিয়ে পানি জমে থাকছে দীর্ঘ সময়, যা চালকদের জন্য অজানা ফাঁদে পরিণত হয়েছে। বৃষ্টির পানিতে ঢাকা এসব গর্তে বাস, ট্রাক বা ছোট গাড়ি হঠাৎ পড়ে গেলে দুর্ঘটনা ঘটছে প্রতিদিন। অনেক যাত্রী আহত হচ্ছেন, যানবাহনের ক্ষতি হচ্ছে, অথচ এসব মেরামতে তেমন কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা অভিযোগ করেছেন, এ সড়কের কারণে শ্রমজীবী মানুষদের জীবনযাত্রা সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হচ্ছে। টঙ্গী ও আশপাশে লাখ লাখ শ্রমিককে প্রতিদিন কারখানায় যেতে হয়। কিন্তু যানজট আর সড়কের গর্তের কারণে সময়মতো পৌঁছাতে না পারায় তাদের বেতন কেটে নেওয়া হচ্ছে, অনেক সময় কাজও হারাতে হচ্ছে।
রফিকুল ইসলাম নামে এক শ্রমিক প্রতিনিধি বলেন, ‘আমাদের জীবন যেন থেমে আছে এ মহাসড়কে। কারখানায় সময়মতো পৌঁছাতে না পারলে কর্তৃপক্ষ বেতন কেটে নেয়, অথচ এ দুর্ভোগের জন্য তো আমরা দায়ী নই।’
টঙ্গী পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক হারুনুর রশিদ বলেন, প্রকল্পের কাজ যেহেতু শেষ পর্যায়ে, তাই এটি বাতিল না করে দ্রুত শেষ করা জরুরি। দ্রুত শেষ করা হলে সুফল মিলবে, নইলে দুর্ভোগ আরও বাড়বে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন দেরিতে স্কুলে আসছে, দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।
শুধু শ্রমিক নয়, ব্যবসায়ীরাও এ দুরবস্থার শিকার হচ্ছেন। পাইকারি টঙ্গী বাজার থেকে প্রতিদিন টনকে টন পণ্য ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। কিন্তু যানজটে গাড়ি ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকার কারণে পচনশীল পণ্য নষ্ট হচ্ছে, ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। একজন ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ঢাকায় মাল নিতে গিয়ে পুরো দিন নষ্ট হয়ে যায়। গ্রাহকরা ক্ষুব্ধ হন, আমাদের লোকসান হয়। এভাবে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা মুশকিল।
এতসব সমস্যার মাঝেও বিআরটি প্রকল্পের দায়িত্বশীলরা নানা অজুহাত দেখিয়ে যাচ্ছেন। কখনো বর্ষা মৌসুমের কারণে কাজ বন্ধ, কখনো অর্থ বরাদ্দের জটিলতা, আবার কখনো প্রযুক্তিগত সমস্যার কথা বলা হচ্ছে। অথচ বছরের পর বছর ধরে এ প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ায় জনগণের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। প্রশ্ন উঠেছে, এ প্রকল্পের আসল লক্ষ্য কি মানুষকে স্বস্তি দেওয়া নাকি দুর্ভোগ বাড়ানো? স্থানীয়দের দাবি, সরকারের উচিত জরুরি ভিত্তিতে এ প্রকল্পের কাজ শেষ করা, রাস্তার খানাখন্দ ভরাট করা এবং অতিবৃষ্টিতে সৃষ্ট নতুন গর্তগুলো মেরামত করা। তারা আরও চান বিকল্প সড়কের ব্যবস্থা, যাতে অন্তত জরুরি সময়ে মানুষ বিকল্প পথে চলাচল করতে পারে।
কর্তৃপক্ষ বলছে, শিগগির জরুরি ভিত্তিতে খানাখন্দ ভরাট ও পানি নিষ্কাশনের কাজ শুরু হবে। কিন্তু স্থানীয়রা এসব আশ্বাসে আর ভরসা পাচ্ছে না। বহু বছর ধরে একই আশ্বাস তারা শুনে আসছেন, বাস্তবে অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। প্রতিদিনের ভোগান্তি পোহাতে গিয়ে মানুষ এখন অসহায়। কেউ কেউ বলছেন, রাজধানীতে ঢোকার প্রধান সড়ক যদি এমন দুরবস্থায় থাকে, তবে দেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে?
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের এ টঙ্গী অংশ যেন দেশের অব্যবস্থাপনার প্রতিচ্ছবি। উন্নয়নের নামে বড় বড় প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে; কিন্তু মানুষের জীবনে সেই উন্নয়নের ছোঁয়া পৌঁছাচ্ছে না। বরং তারা প্রতিদিন আরও দুর্ভোগে ডুবে যাচ্ছেন। স্থানীয়দের আশা, সরকার দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, বিআরটি প্রকল্পের কাজ শেষ করবে এবং অতিবৃষ্টির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো মেরামত করবে। নইলে টঙ্গী ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক দেশের অর্থনৈতিক প্রবাহের অন্যতম প্রধান শিরা থেকে ধীরে ধীরে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হবে।
টঙ্গী পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক হারুনুর রশিদ বলেন, প্রকল্পের কাজ যেহেতু শেষ পর্যায়ে; তাই এটি বাতিল না করে দ্রুত শেষ করা জরুরি। দ্রুত শেষ করা হলে সুফল মিলবে, নইলে দুর্ভোগ আরও বাড়বে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন দেরিতে স্কুলে আসছে, দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পটি শেষ করতে বিলম্বের পেছনে রয়েছে বরাদ্দ সংকট, প্রযুক্তিগত সমস্যা ও বর্ষাকালীন কাজে বিঘ্ন। তবু জনগণের দুর্ভোগ কমাতে অস্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুল বলেন, মহাসড়কটি যেহেতু বিআরটি প্রকল্পের আওতায়, আমরা ইচ্ছা থাকলেও সরাসরি কোনো কাজ করতে পারছি না। তারপরও পানি নিষ্কাশন ও কিছু অংশ মেরামতের ব্যবস্থা করেছি।
এ বিষয়ে জানতে বিআরটির প্রকল্প পরিচালক রেজাউল করিমের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিলেও রিসিভ করেননি।