

চট্টগ্রামের একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘুম কেড়ে নিয়েছে প্রশাসনের। এসব হত্যাকাণ্ডের বেশ কয়েকটিতে ‘সন্ত্রাসী’ মোহাম্মদ রায়হানের সম্পৃক্ততার তথ্য মিললেও তাকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। সর্বশেষ শুক্রবার রাতে রায়হানের কাছ থেকে হত্যার হুমকি পাওয়ার কথা জানিয়েছেন মো. একরাম নামে চট্টগ্রামের এক পাথর ব্যবসায়ী।
জানা গেছে, সন্ত্রাসী রায়হান হত্যার আগেই টার্গেটকে ফোনকলের পাশাপাশি খুদেবার্তা পাঠানোর মাধ্যমে জানিয়ে দেন মৃত্যুর ধরন, বেঁধে দেন দিনক্ষণ। সর্বশেষ ব্যবসায়ী একরামও এমন বার্তা পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। তিনি জানান, রায়হান তাকে বলেছেন, ‘তোকে গুলি করে মারব না, ব্লেড দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারব।’ হুমকি পাওয়া ব্যবসায়ীর ধারণা, গত ১৫ মার্চ ঢাকার একটি শপিংমলে ঘুরতে দেখে চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন তিনি। এ ঘটনায় সাজ্জাদের স্ত্রী তামান্না এবং বিদেশে পলাতক সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদ তাকে হুমকি দিয়ে আসছিলেন। এর অংশ হিসেবেই রায়হান তাকে হত্যার হুমকি দিয়েছেন।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, চট্টগ্রামে বিএনপির মনোনীত প্রার্থীর সঙ্গে নির্বাচনী জনসংযোগে অংশ নেওয়া ‘সন্ত্রাসী’ সরোয়ার হোসেন ওরফে বাবলা (৪৩) খুন হন গত ৫ নভেম্বর। এর তিন দিন আগে সরোয়ারকে ফোন করে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে রায়হানের বিরুদ্ধে। নিহত সরোয়ারের বাবা জানান, রায়হান সরোয়ারকে ফোন দিয়ে বলেন, ‘তোর সময় শেষ, যা খাওয়ার খেয়ে নে।’ এর আগে গত ২৫ অক্টোবর মোটরসাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফেরার সময় রাউজান পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের চারাবটতলে গুলি করে হত্যা করা হয় যুবদল কর্মী আলমগীর আলমকে। এই হত্যা মামলায়ও রায়হানকে আসামি করা হয়েছে।
তার আগে গত ২৫ জুলাই চট্টগ্রাম নগরের কালুরঘাট এলাকার এক ওষুধের দোকানিকেও মুঠোফোনে রায়হান হুমকি দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই দোকানি বলেন, মুঠোফোনে রায়হান তাকে বলেন, ‘আমি ঢাকাইয়া আকবর খুনের মামলার ২ নম্বর আসামি রায়হান, মাথার খুলি উড়ায় ফেলব। আকবর সি বিচে কীভাবে পড়েছিল তুই দেখছস? তুইও পড়ে থাকবি।’
এ ছাড়া চাঁদা না পেয়ে গত ১ আগস্ট চান্দগাঁও থানার মোহরা এলাকার এক ব্যবসায়ীকেও গুলি করার অভিযোগ রয়েছে রায়হানের বিরুদ্ধে। মো. ইউনুস নামের ওই ব্যবসায়ী নদী থেকে বালু তোলার কাজে ব্যবহৃত খননযন্ত্রের ব্যবসা করেন।
পুলিশ বলছে, হত্যাচেষ্টার একটি মামলায় কারাগারে গিয়ে চট্টগ্রামের আলোচিত সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে পরিচয় হয় রায়হানের। গত বছরের ৫ আগস্টের পর দুজন কারাগার থেকে জামিনে বের হন। এরপর ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন রায়হান। সাজ্জাদ সম্প্রতি আবারও কারাগারে গেলে রায়হান তার অস্ত্রভান্ডারের দেখভাল করছেন। এরই মধ্যে নগর ও জেলার বেশ কয়েকটি হত্যা মামলায় সন্ত্রাসী রায়হানের নাম এসেছে। তাকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে। রাজনৈতিক এই হত্যাকাণ্ডে রায়হান ভাড়াটে হিসেবে কাজ করেছেন। জীবিত অবস্থায় মুঠোফোনে রাউজানের যুবদলকর্মী আলমগীর আলমের কথোপকথনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে আলমগীরকেও রায়হানের নাম উল্লেখ করে শঙ্কা প্রকাশ করতে দেখা যায়। রায়হানের নামে গত বছরের ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রাম নগর ও জেলায় জোড়া খুনসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১৫টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সাতটি হত্যা মামলা।
এদিকে, চট্টগ্রামের পাথর ব্যবসায়ী একরাম জানান, ছোট সাজ্জাদকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার পর তাকে জীবননাশের হুমকি দেওয়ার ঘটনায় তিনি পাঁচলাইশ থানায় মামলা করেছিলেন। এর পর থেকে মামলা তুলে নিতেও তাকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। নতুন করে হুমকির বিষয়ে থানায় মামলা কিংবা জিডি করতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানান এই ব্যবসায়ী। তার পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ব্যবসায়ী একরাম এখন ঘর থেকে বের হওয়ারও সাহস পাচ্ছেন না।
পাঁচলাইশ থানার উপপরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ সাজ্জাদ কালবলোকে বলেন, হুমকির ঘটনায় থানায় মামলা নয় জিডি হতে পারে।
পাঁচলাইশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সোলায়মান কালবেলাকে বলেন, ব্যবসায়ীকে হত্যার হুমকির বিষয়টি শুনেছি। এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে মামলা বা জিডি করতে কেউ থানায় আসেননি। হুমকি পাওয়া ওই ব্যবসায়ী পূর্বে থানায় একটি মামলা করেছিলেন। তারা আসলে মামলা বা জিডি নেওয়া হবে।
মন্তব্য করুন