

বিতর্কিত ফুলবাড়ী কয়লা খনি উন্মুক্ত পদ্ধতিতে খননে নতুন করে আশা দেখছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক কোম্পানি জিসিএম রিসোর্স পিএলসি (সাবেক এশিয়া এনার্জি)। লন্ডন শেয়ার মার্কেটে কোম্পানিটি দিনাজপুরের ফুলবাড়ী কয়লা খনি দেখিয়ে গত ১৮ বছর ধরে ব্যবসা করছে। সম্প্রতি কোম্পানিটি শেয়ারধারীদের কাছে আগামী ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বাংলাদেশের কয়লা সম্পদ উত্তোলনে সম্ভাবনার কথা জানায়। পাশাপাশি এই খনি উন্নয়নে চীনা কোম্পানির সঙ্গে করা চুক্তির মেয়াদও ২৪ মাসের জন্য বাড়িয়েছে। ফুলবাড়ী কয়লা খনির মজুত কয়লা উন্মুক্ত পদ্ধতিতে উত্তোলনে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে চুক্তি রয়েছে বলে জিসিএমের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, যদিও গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার তা অস্বীকার করে। আর বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার বিষয়টি নিয়ে নীরবতা বজায় রাখছে। এ প্রসঙ্গে সরকারের জ্বালানি বিভাগের কেউ আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
জিসিএম রিসোর্সেস গত ১৬ জানুয়ারি তাদের ওয়েবসাইটে ‘প্রায় এক মিলিয়ন পাউন্ড সংগ্রহের লক্ষ্যে শেয়ার বরাদ্দ’ শিরোনামে একটি নোটিশ প্রকাশ করে। যাতে উল্লেখ করা হয়, ‘২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে সঙ্গে, ২০২৫ সালের মার্চ মাসে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে দেশের কয়লাভিত্তিক জ্বালানি খাতের সঙ্গে সম্পর্কিত কৌশল এবং চ্যালেঞ্জগুলোর ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে শুরু হওয়া উদ্যোগগুলোর মাধ্যমে জোরালো ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, একটি নতুন সরকার তার দেশীয় কয়লা এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করবে। এটি কোম্পানির জন্য শুভ লক্ষণ।’
এর আগে গত ২৯ ডিসেম্বর ‘এমওইউ এক্সটেনশন’ শিরোনামে প্রকাশিত আরেকটি নোটিশে বলা হয়, ‘পাওয়ার কনস্ট্রাকশন করপোরেশন চায়না লিমিটেডের সঙ্গে খনি উন্নয়নে করা চুক্তির মেয়াদ ২৪ মাস বা দুই বছরের জন্য বাড়ানো হয়েছে।’ নোটিশে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের ১১ মার্চ ঘোষিত ‘ফুলবাড়ী কয়লা খনির অবকাঠামো নির্মাণ এবং ওভারবর্ডেন স্ট্রিপিং চুক্তি’র মেয়াদ ২০২৫ সালের ৬ ডিসেম্বর থেকে বাড়িয়ে ২০২৭ সালের ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে। চীনের এই কোম্পানিটি বিশ্বব্যাপী ‘পাওয়ার চায়না’ নামে পরিচিত। জিসিএমের সঙ্গে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে ফুলবাড়ী কয়লা খনি উন্নয়নে এক বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ চুক্তি করেছে পাওয়ার চায়না। বর্তমানে চীনা এই কোম্পানিটি বাংলাদেশের ২৪টি চলমান উন্নয়ন প্রকল্পে মোট ব্যয়ের ৫০ শতাংশ অর্থায়ন করছে।
জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের পক্ষ থেকে জিসিএমের সঙ্গে কোনো চুক্তি নেই বলা হলেও, সত্য হচ্ছে কোম্পানিটি ফুলবাড়ী কয়লা খনি নিয়ে লন্ডন শেয়ার মার্কেটে ব্যবসা করছে। পাওয়ার চায়নার সঙ্গে যে চুক্তি হয়েছে, তা বাংলাদেশেই হয়েছে। জিসিএম কীভাবে ফুলবাড়ী কয়লা খনি নিয়ে ব্যবসা করছে, সরকারের উচিত এখন বিষয়টি খোলাসা করা। আর চুক্তি যদি না থাকে তাহলে তাও জনসম্মুখে প্রকাশ করা দরকার।
জিসিএম রিসোর্সেস গত ২৯ ডিসেম্বর তাদের ওয়েবসাইটে ‘এমওইউ এক্সটেনশন’ শিরোনামে প্রকাশিত নোটিশে উল্লেখ করে, জিসিএম রিসোর্স খনি উন্নয়নের জন্য পাওয়ার চায়না ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপ লিমিটেডের সঙ্গে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের চুক্তি করেছে। তবে এই চুক্তির অগ্রগতি ‘উত্তরাঞ্চলে কয়লা অনুসন্ধান এবং উত্তোলন’ চুক্তির শর্তাবলির অধীনে বাংলাদেশ সরকারের কাছে জমা দেওয়া কয়লা খনির উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন প্রাপ্তির ওপর নির্ভর করছে। খনি নির্মাণ চুক্তির কার্যপরিধির মধ্যে রয়েছে খনি অবকাঠামোর নকশা, ক্রয়, ইনস্টলেশন, নির্মাণ ও কমিশনিং এবং অতিরিক্ত মাটি, বালু, পাথরের স্তর অপসারণ ও পানি নিষ্কাশন।
কয়লার প্রথম স্তর উন্মুক্তের জন্য মাটি, বালু ও পাথরের স্তর অপসারণ করতে প্রায় দুই বছর সময়সহ খনি নির্মাণ চুক্তির মেয়াদ চার বছর। তবে কয়লা উত্তোলন ও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে খনি পরিচালনা করে ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে দৈনিক কমপক্ষে ৬ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কয়লা সরবরাহে জিসিএম এবং পাওয়ার চায়না অতিরিক্ত চুক্তি করার বিষয়ে আশাবাদী। এ বিষয়ে পাওয়ার চায়নার সঙ্গে জিসিএম একটি যৌথ প্রস্তাব শিগগির নবনির্বাচিত বাংলাদেশ সরকারের কাছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। এতে আরও বলা হয়, জিসিএম এরই মধ্যে ফুলবাড়ী কয়লা খনি থেকে কয়লা কেনার বিষয়ে এস আলমের বাঁশখালী ১৩২০ মেগাওয়াট এবং বরিশাল ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানির কাছ থেকে আগ্রহপত্র পেয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলেন, জিসিএমের বিরুদ্ধে জালিয়াতির বহু অভিযোগ রয়েছে। তারা ফুলবাড়ী নিয়ে ২০০৫ সাল থেকেই ব্যবসা করছে। সরকারের মধ্যেই তাদের লোকজন আছে। সরকারের উচিত দেশের সম্পদ দেখিয়ে বিদেশে ব্যবসা করার কারণে জিসিএমকে বিচারের সম্মুখীন করা। জিসিএম পাওয়ার চায়নার সঙ্গে চুক্তি করেছে তাদের পেশিশক্তি বাড়ানোর জন্য। পাওয়ার চায়না বাংলাদেশের বেশকিছু প্রকল্পে টাকা দিচ্ছে। এ ছাড়া পাওয়ার চায়নার সঙ্গে চুক্তি করে শেয়ার মার্কেটে জিসিএমের শেয়ার দাম বাড়াতে চাইছে। চীনা কোম্পানিগুলো অনিয়ম ও দুর্নীতিতে বিশ্বখ্যাত। তারা প্রকল্প পেতে যে কোনো ধরনের অনিয়ম করতে দ্বিধা করে না।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক এবং জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমাদের কয়লা উত্তোলন করা প্রয়োজন। এখন তারা (জিসিএম রিসোর্স) যে প্রস্তাব দিয়েছে, তা আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের দিয়ে স্বাধীনভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা দরকার। আর তাদের শর্ত দেওয়া যেতে পারে, খনি থেকে কয়লা উত্তোলনের জন্য কোনো ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয় হলে বন্ধ করে দেওয়া হবে।’
দীর্ঘদিন ধরেই এ খনি থেকে কয়লা তোলার পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক চলছে। ফুলবাড়ী খনি থেকে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলা নিয়ে এশিয়া এনার্জির বিরুদ্ধে বড় ধরনের আন্দোলন হয়। এতে হতাহতের ঘটনাও ঘটে। ২০০৬ সালের ওই আন্দোলনের পর বলা হয়েছিল, উন্মুক্ত খনি হলে ওই এলাকার কৃষিজমি ধ্বংস, ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনা নষ্ট ও পরিবেশ দূষিত হবে।
খনিজসম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ার কোম্পানি বিএইচপি মিনারেলস দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে এই কয়লাখনি আবিষ্কার করে। সেখানে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তুলতে চেয়েছিল যুক্তরাজ্যভিত্তিক কোম্পানি এশিয়া এনার্জি। ২০০৬ সালে আন্দোলনের মুখে সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসে সরকার। এই খনিতে কয়লা মজুতের পরিমাণ ৫৭ কোটি টন। যার মধ্যে উত্তোলনযোগ্য মজুত ৪৭ কোটি টন।