মৃত্তিকা সাহা
প্রকাশ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০১:৪৪ এএম
আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০৮:২১ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

ডলার নিয়ে ব্যবসায় ব্যাংক, বাজারে কাটছে না সংকট

আরও বাড়ার শঙ্কা
মার্কিন ডলার। ছবি : সংগৃহীত
মার্কিন ডলার। ছবি : সংগৃহীত

ব্যাংকগুলোর হাতে পর্যাপ্ত ডলার থাকার পরও বাজারে সংকট কাটছে না। মাঝে কিছুদিন ডলারের বাজার স্থিতিশীল থাকলেও এখন আবার তৈরি হয়েছে তীব্র সংকট। ফলে একদিকে এলসি খুলতে সমস্যায় পড়ছেন ব্যবসায়ীরা, অন্যদিকে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন শিক্ষা, চিকিৎসা বা অন্য প্রয়োজনে বিদেশগামীরা। এর মধ্যে আবার কমেছে প্রবাসী আয়। রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধিও নিম্নমুখী। এসব কারণে আগামীতে ডলার সংকট আরও বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ব্যাংকগুলোর হাতে সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলার রয়েছে। বর্তমান বাজার চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত হওয়ার কথা। সেইসঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশ ব্যাংক এখনো ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে।

এর পরও কেন ব্যাংকে ব্যাংকে ডলারের সংকট হচ্ছে—এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত মুখপাত্র জাকির হোসেন চৌধুরী কালবেলাকে বলেন, ‘সবাই যদি ব্যবসায়ী হয়ে যায় তাহলে তো ডলারের দাম বাড়বেই। রপ্তানিকারকরাও ডলারের ব্যবসা শুরু করেছে। আর সবাই যদি সেই ডলারের পেছনে ছুটে ডলার সংকট তো হবেই। এটা আসলে সুস্থ পরিস্থিতি না।’

তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী ব্যাংকে এখন প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন নগদ ডলার রয়েছে। এ কারণে সংকট তৈরির কোনো কারণ নেই। ব্যাংকগুলো সঠিকভাবে ডলারের ব্যবহার করছে কি না, সেই বিষয়ে যাচাই-বাছাই করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি রাখায় গত রোববার ১৩টি ব্যাংকের কাছে প্রাথমিকভাবে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। ব্যাংকগুলোর ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হলে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতদিন বাজারে ডলারের অনেক দর প্রচলিত ছিল। গতকাল মঙ্গলবার থেকে সব ক্ষেত্রে একক দর কার্যকর হয়েছে। ফলে এখন রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে ডলারের একই দর হবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শে এই ব্যবস্থা কার্যকর করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলারস অ্যাসোসিয়েশন (বাফেদা) এবং ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন এবিবির সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, রপ্তানি ও প্রবাসী আয় থেকে আসা ডলারের দর হবে ১০৯ টাকা ৫০ পয়সা। আগে ব্যাংকগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতি ডলারের জন্য প্রবাসীদের ১০৯ টাকা এবং রপ্তানিকারকদের ১০৮ টাকা ৫০ পয়সা দিত। অন্যদিকে ব্যাংকগুলো এখন আমদানিকারকদের কাছে ১১০ টাকায় ডলার বিক্রি করবে। আগে আমদানি দায় মেটাতে ব্যাংকগুলো আমদানিকারকদের কাছে প্রতি ডলার ১০৯ টাকা ৫০ পয়সায় বিক্রি করত।

গত জুলাই মাসে ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে নির্ধারিত দর না মানার অভিযোগ দেয় বাফেদা ও এবিবি। সংগঠন দুটির যৌথ স্বাক্ষরে গত ৩ জুলাই ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করে লেখা চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ‘বিনিময় হারের একক দর নির্ধারণে বাফেদা ও এবিবি ডলারের যে দর নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল গত ২৬ জুন, তা ২ জুলাই থেকে কার্যকর হয়। কিছু ব্যাংক নির্ধারিত সীমার বেশি দরে ডলার কেনাবেচা করছে। যেসব ব্যাংক এটি করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে বলা হবে।’

জানতে চাইলে বাফেদার চেয়ারম্যান ও সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আফজাল করিম কালবেলাকে বলেন, ‘প্রতি মাসে বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে ডলারের যে দর নির্ধারণ করা হয়, প্রতিটি ব্যাংক সেই দর মেনে চলবে বলে সিদ্ধান্ত রয়েছে। কিন্তু অনেক ব্যাংক তা মানছে না। এ কারণেই বাজার অস্থিতিশীল হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে দেখছে। যদি সে ধরনের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যবস্থা নেবে।’

আফজাল করিম বলেন, ‘ডলারের জন্য আগে যে হাহাকার ছিল, এখন তা নেই। পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। এখন সারা বিশ্বেই ডলারের কিছুটা সংকট আছে। ফলে বাংলাদেশেও সেই সংকটের মধ্যেই আছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আগে ডলারের অনেক দর ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় যা আমরা কাটিয়ে উঠতে পেরেছি। বর্তমানে সব ক্ষেত্রেই ডলারের একক দর চালু করা হয়েছে।’

আমদানি ব্যয়ের তুলনায় প্রবাসী আয় এবং রপ্তানি আয় কাঙ্ক্ষিত হারে না বাড়ায় বাজারে ডলারের সংকট তৈরি হচ্ছে বলে মন্তব্য করছেন ব্যাংকাররা। এবিবির সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহবুবুর রহমান কালবেলাকে বলেন, ‘ডলারের সংস্থান আগের চেয়ে বেড়েছে, এটা সত্য। তবে অনেক প্রতিবন্ধকতাও আছে। যেমন আগে যেসব এলসি খোলা হয়েছিল, সেগুলোর বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে। কিন্তু সেই অনুযায়ী, ডলার আসছে না।’

ব্যাংকগুলোর হাতে যে পরিমাণ ডলার আছে, তাতে কোনোভাবেই সংকট তৈরি হওয়ার কথা নয়—বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন তথ্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি অন্য ব্যাংকের কথা বলতে পারব না। তবে আমার ব্যাংকে যে পরিমাণ বকেয়া আছে এবং যে পরিমাণ ডলার আছে, তা দিয়ে কাভার হচ্ছে না। ফলে আমাকে রেমিট্যান্সের ওপরে চাপ দিতেই হবে, আমাকে রেমিট্যান্স আনতেই হবে। মনে করেন, আমার ব্যাংকে একশ ডলারের সংস্থান আছে। কিন্তু আমি এলসি খুলেছি ১৭৩ ডলারে। তাহলে আমি তো এমনিতেই গ্যাপে পড়ে গেছি। তখন আমি কী করব?’

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রধানত পাঁচ কারণে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট আপাতত দূর হচ্ছে না। এর প্রথমটি হচ্ছে প্রচুর অনিষ্পন্ন আমদানি দায় মেটাতে হচ্ছে। পাশাপাশি ব্যাপক আমদানির চাপও রয়েছে। অন্যদিকে চলতি অর্থবছর বিদেশ থেকে নেওয়া স্বল্পমেয়াদি ঋণ পরিশোধে অনেক অর্থ ব্যয় হবে। অন্যদিকে বিদেশ থেকে বিনিয়োগ আসা কমে গেছে। কেউ কেউ মনে করেন, বিদেশে টাকা পাচারও বেড়েছে। এসব কারণে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট সহসাই দূর হচ্ছে না।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান মনসুর কালবেলাকে বলেন, ‘লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয় না বাড়লে ডলার সংকট সহসাই কাটবে না। তবে রনি ও প্রবাসী আয় সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা বাড়ায় ডলার সংকট কিছুটা প্রশমিত হতে পারে। অনেক অনিষ্পত্তিকৃত এলসি আছে, আমদানির উচ্চ দায় পরিশোধের চাপও রয়েছে, অনেক স্বল্পমেয়াদি ঋণ আছে, যেগুলো এ বছরেই পরিশোধ করতে হবে। ফলে এতে বড় অঙ্কের ডলার বাইরে চলে যাবে। এ ছাড়া আরেকটি বড় কারণ অর্থ পাচার। নির্বাচনী বছরে এর পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। বেসরকারি খাতে বৈদেশিক বিনিয়োগের জন্য যে পরিমাণ ডলার প্রতি বছর আসত, এখন তা ব্যাপকভাবে কমে গেছে।

তিনি আরও বলেন, ‘যতদিন পর্যন্ত না অর্থনীতির অন্যতম প্রধান দুই সূচক রপ্তানি আয় ও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স না বাড়বে, ততদিন ডলার এই টানাপোড়েন চলবে। দেশ থেকে যে হারে শ্রমিক পাঠানো হয়েছে, সে হারে বাড়ছে না প্রবাসী আয়। এতে ডলার সংকট আরও প্রকট হচ্ছে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ডলার সংকটের কারণে ব্যাংকগুলো চাহিদামতো ঋণপত্র খুলতে পারছে না। এ কারণে মুদ্রাবাজার স্বাভাবিক রাখতে রিজার্ভ থেকে নিয়মিত ডলার বিক্রি অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই ২২৪ কোটি ডলার বিক্রি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

মেঘনা গ্রুপের সিনিয়র জিএম তাসলিম শাহরিয়ার কালবেলাকে বলেন, ‘ডলার সংকট দূর হওয়া তো দূরের কথা, এখন আরও বেড়েছে। পর্যাপ্ত ডলার না থাকায় ব্যাংকগুলো ব্যবসায়ীদের চাহিদামতো এলসি খুলতে চায় না। এ ছাড়া এখন প্রতিটি এলসির জন্য এলসি মার্জিন রাখতে হয়।’

তবে এ ধরনের তথ্য বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, ‘ডলার সংকটের কারণে কোনো ব্যাংক এলসি খুলতে পারছে না—এমন তথ্য আমাদের কাছে নেই। কোনো ব্যাংকের কাছে বেশি ডলার থাকে, আবার কোনো ব্যাংকের কাছে কম থাকতে পারে; কিন্তু সার্বিকভাবে সংকট নেই।’

তিনি বলেন, ‘এলসি মার্জিন তো ব্যাংকের স্বার্থে রাখা উচিত। কেননা আমদানিকারক যদি তার আমদানি দায় পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয় তাহলে ব্যাংক যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।’ বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সর্বোচ্চ উদ্যোগ নিচ্ছে বলে এই কর্মকর্তা জানান।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মোজতবা খামেনির জন্য ‘বিশেষ চিঠি’ নিয়ে ইরানে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

যে কারণে চুক্তির দ্বারপ্রান্তে গিয়েও বারবার ব্যর্থ যুক্তরাষ্ট্র-ইরান

কমলো জেট ফুয়েলের দাম

রাজধানীতে ব্যবসায়ীকে গুলি করে ছিনতাই

নোয়াখালীতে আ.লীগ-ছাত্রদল সংঘর্ষ

ছাঁটাই শ্রমিকদের পুনর্বহালের দাবি ইসলামী শ্রমিক আন্দোলনের

স্ত্রীকে ভিডিও কলে রেখে স্বামীর আত্মহত্যা

সংসদে তোফায়েল আহমেদসহ সাবেক ১৬ এমপি-মন্ত্রীর মৃত্যুতে শোক প্রস্তাব

সিগারেট খেতে বাঁধা দেওয়ায় খুন

ইউরোপজুড়ে জিপিএস সংকেত বিঘ্নিত করছে রুশ স্যাটেলাইট

১০

আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রধানমন্ত্রীর ধন্যবাদ

১১

শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ না করা পর্যন্ত ককরোচ পার্টির আন্দোলন চলবে

১২

জাতীয় সংসদে পাঁচ সদস্যের সভাপতিমণ্ডলী ঘোষণা

১৩

ইরানের জব্দকৃত সম্পদ নিয়ে নতুন পরিকল্পনা সাজাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

১৪

১০ বছরের শিশুকে ‘ধর্ষণ’, অভিযুক্তকে গণপিটুনির পর পুলিশে সোপর্দ

১৫

৪ বার সঠিক পূর্বাভাস দেওয়া প্রতিষ্ঠান জানাল ২০২৬ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন কে

১৬

আদ্-দ্বীনে ৬ নবজাতকের মৃত্যু / মারা যাওয়া প্রত্যেক শিশুর পরিবার পাবে ৮০ লাখ টাকা : শিশির মনির

১৭

শাকিব বুবলীর দ্বিতীয় সন্তানের আগমন ঘটল কোথায়?

১৮

লাঠিসোঁটা নিয়ে বিএসএফকে ধাওয়া দিল এলাকাবাসী

১৯

এমপিওর দাবিতে অবস্থানরত শিক্ষকদের পানি-স্যালাইন দিলো ছাত্র জমিয়ত

২০
X