

চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে বর্তমানে বন্দির সংখ্যা কমপক্ষে ছয় হাজার। এই বন্দিদের জন্য পানির ব্যবস্থা করতে কারাগারে রয়েছে ১১টি সাবমার্সিবল পাম্প। এসব পাম্পের পানি কারাবন্দিরা পান করার পাশাপাশি অন্যান্য কাজে ব্যবহার করেন। সম্প্রতি কারা কর্তৃপক্ষ ইন্টারন্যাশনাল রেড ক্রসের সহযোগিতায় এসব পাম্পের পানি পরীক্ষা করে। পরীক্ষায় কয়েকটি পাম্পের পানিতে ক্ষতির কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়াসহ বিভিন্ন জীবাণুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা কারাগারের বন্দিদের জন্ডিস, হেপাটাইটিসসহ নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে ফেলছে।
কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, মাসখানেক আগে ইন্টারন্যাশনাল রেড ক্রসের সহযোগিতায় কয়েকটি সাবমার্সিবল পাম্পের পানি পরীক্ষা করে মিলেছে জীবাণু। এর মধ্যে কারাগারের পদ্মা ওয়ার্ডের একটি, যমুনা ওয়ার্ডের একটি ও প্রশাসনিক ভবনের সামনের একটি পাম্পের পানিতে মিলেছে কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া। প্রশাসনিক ভবনের ওই পাম্পের পানি কারাগারের আবাসিকেও ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া দুটি পাম্পের পানিতে কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়ার পাশাপাশি মিলেছে ‘হার্ডনেস’ বা খরতা।
এক কারা কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, কারাগারের স্যুয়ারেজের সংযোগের সঙ্গে পানির সংযোগ একাকার হয়ে যাওয়া পাম্পের পানিতে এই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতির কারণ হতে পারে। সাবমার্সিবল পাম্পের পাইপ মাটির নিচে থাকে। সেখানে পাইপ লিকেজ হয়ে থাকতে পারে।
মানবদেহের অন্ত্রে থাকা কিছু ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়াকে কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া বলা হয়। এদের মধ্যে প্রধানতম হলো ই-কোলাই। একে জনস্বাস্থ্যের ভাষায় ইন্ডিকেটর ব্যাকটেরিয়াও বলা হয়। স্তন্যপায়ী প্রাণীর অন্ত্র এই ব্যাকটেরিয়ার উৎস। যদিও প্রকৃতিতে বা মাটিতে এ ধরনের ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি খুব স্বাভাবিক; কিন্তু পানিতে এ রকম ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি ঘটলে বুঝতে হবে সেই পানিতে প্রাণিজ বর্জ্যের মিশ্রণ ঘটেছে। এ পানি পানের মাধ্যমে ডায়রিয়া, আমাশয়, রক্ত আমাশয়, কলেরা, টাইফয়েড ছাড়াও ভাইরাল হেপাটাইটিস (জন্ডিস) রোগের সৃষ্টি হতে পারে।
এই কারাগারে থাকা কয়েকজন বন্দি, যারা জামিনে বের হয়েছে, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা যায়, কারাগারে বন্দিদের ঠাসাঠাসি করে রাখা হয়। প্রতিদিনই কারাগারে নতুন বন্দি ঢুকছে। তবে কারাগারের ভেতরটা তেমন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন নয়। বন্দিদের বেশিরভাগের জ্বর, ডায়রিয়া লেগে থাকে। কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে কারাগারে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি ঘটলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়। কারাগারে সরবরাহ করা পানি কতটুকু বিশুদ্ধ কোনো বন্দিরই জানা নেই। বন্দিদের জন্য মিনারেল ওয়াটার কিংবা ফোটানো পানির ব্যবস্থা নেই। ফলে পাম্পের পানিই পান করা থেকে শুরু করে সব কাজে ব্যবহার করতে হয়।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ইকবাল হোসেন কালবেলাকে বলেন, কারাগারে থাকা ১১টি পানির পাম্পের মধ্যে ১০টি সাবমার্সিবল পাম্পের পানির নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। কয়েকটি সাবমার্সিবল পাম্পের পানিতে জীবাণুর উপস্থিতি মিলেছে। এর মধ্যে তিনটির পানিতে মিলেছে কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া। দুটিতে মিলেছে ‘হার্ডনেস’ বা খরতা। আমরা কারাবন্দিদের এসব সাবমার্সিবল পাম্পের পানি খেতে নিষেধ করেছি। ওয়াসার পাম্পগুলো ঠিক আছে।
পাম্পের পানির সঙ্গে স্যুয়ারেজ লাইনের বর্জ্য মিশে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে নিশ্চিত না হয়ে কিছু বলতে পারছি না। পানি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। এর সমাধান এবং করণীয় সম্পর্কে অধিদপ্তর থেকে জানানো হবে। তবু আমরা সতর্ক আছি। জীবাণু পাওয়া সাবমার্সিবল পাম্পের পানি কারাবন্দিদের খেতে দেওয়া হচ্ছে না।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম কালবেলাকে বলেন, যেসব পাম্পের পানিতে কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি মিলেছে, সেগুলোর পানি দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে জন্ডিস, হেপাটাইটিস-এ, ডায়রিয়াসহ নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ওই পাঁচ পাম্পের পানি পান ও ব্যবহার থেকে বিরত থাকার জন্য আমরা কারা কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছি। পাশাপাশি পাম্পগুলো সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণের জন্য চট্টগ্রাম জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকেও চিঠি দিয়েছি। পানির লাইন ও টয়লেটের স্যুয়ারেজ লাইন কোথাও ছিদ্র হয়ে গেছে। যার কারণে পানিতে মল মিশে একাকার হয়ে গেছে। এ কারণে কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি মিলেছে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের টিমের কারাগার পরিদর্শন অব্যাহত রয়েছে। কারাগারের ভেতরের স্বাস্থ্য নিরাপত্তার বিষয়টি জেলা সিভিল সার্জন এবং স্যানিটেশনের বিষয়টি জেলা স্যানিটারি ইন্সপেক্টর তদারকের দায়িত্বে রয়েছেন। বিষয়টি দ্রুত সমাধান করার জন্য তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে কারাগারে একজন স্যানিটেশন ইন্সপেক্টর নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি বন্দিদের খাবার পানিসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে খোঁজখবর রাখবেন।