

ব্রাজিলের বেলেমে জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনে (কপ৩০) জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজনের চাহিদা এবং ন্যায্য পরিবর্তনের বিষয়ে উত্তপ্ত বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি অংশ নেন। গত বুধ ও বৃহস্পতিবার কিছু অগ্রগতির খবর পাওয়া গেলেও, উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের মধ্যকার বিভাজনে তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি।
এই বিতর্কে বাংলাদেশ বৈশ্বিক জলবায়ু কূটনীতিতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তার নেতৃত্বের ভূমিকা পুনর্ব্যক্ত করে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা ফরিদা আখতারের নেতৃত্বে দেশের প্রতিনিধিদল ন্যায্য জলবায়ু কর্মকাণ্ডের প্রতি বাংলাদেশের অব্যাহত প্রতিশ্রুতি তুলে ধরে।
কপ৩০ সম্মেলনস্থলের বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নে অনুষ্ঠিত ‘হিট স্ট্রেস ইন ঢাকা: ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স সলিউশন’ শীর্ষক সেমিনারে ফরিদা আখতার বলেন, বাংলাদেশ ন্যায়সংগত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জলবায়ু কর্মকাণ্ড এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত। এ সময় তিনি ক্ষয়ক্ষতি, অভিযোজন এবং জলবায়ু অর্থায়নের বিষয়ে ঢাকার দীর্ঘদিনের অবস্থান তুলে ধরেন।
পরিবেশ অধিদপ্তরের আন্তর্জাতিক কনভেনশন শাখার পরিচালক ও বাংলাদেশের অন্যতম আলোচক মির্জা শওকত আলী বলেন, বিভিন্ন গোষ্ঠীর বিতর্কে মতপার্থক্য ও দ্বন্দ্ব রয়েছে। আমরা অভিযোজন অর্থায়ন তিনগুণ বৃদ্ধির ওপর জোর দিচ্ছি এবং ক্ষয়ক্ষতির প্রতিক্রিয়া জানাতে তহবিল ব্যবস্থাপনাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি।
সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (সিপিআরডি) প্রধান নির্বাহী মো. শামসুদ্দোহা বলেন, অভিযোজন অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা কখনো পূরণ হয়নি। গত বছর কপ২৯-এ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ২০২৫ সাল থেকে বার্ষিক ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার সংগ্রহের প্রস্তাব থাকলেও তা সিদ্ধান্তে পরিণত হয়নি। যদিও ২০৩৫ সালের মধ্যে ৩০০ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়; কিন্তু যদি কপ৩০-এ প্রতিশ্রুত অর্থায়নের জন্য একটি স্পষ্ট রোডম্যাপ ও স্বচ্ছ প্রতিবেদন ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তবে সেটিও অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
আফ্রিকান গ্রুপ ও এলএমডিসি (সমমনা উন্নয়নশীল দেশগুলো) উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে স্পষ্ট ও পরিমাপযোগ্য প্রতিশ্রুতি দাবি করেছে। তারা বলেছে, বিদ্যমান প্রতিশ্রুতি অপর্যাপ্ত এবং এখনো পূরণ হয়নি।
ল্যাটিন আমেরিকান জোট AILAC বলেছে, জলবায়ু সহযোগিতা সদিচ্ছার নয়, এটি একটি আইনি বাধ্যবাধকতা। এই অঞ্চলের প্রতিনিধিরা ধনী দেশগুলোর প্রতি বিশেষ করে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য পূর্বাভাসযোগ্য ও জবাবদিহিমূলক অর্থায়ন প্রদানের আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলেছে, লিঙ্গ সমতা, সম্মুখসারির জনগোষ্ঠী এবং স্থানীয়ভাবে পরিচালিত অভিযোজনের সমর্থনে প্রতিষ্ঠিত অভিযোজন তহবিল এখনো অত্যন্ত অপ্রতুল।
আফ্রিকান গ্রুপ এবং অ্যালায়েন্স অব স্মল আইল্যান্ড স্টেটস (AOSIS) দুর্বল দেশগুলোর জন্য সরাসরি তহবিল প্রবেশাধিকারের এবং স্বীকৃত জাতীয় ও আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পারস্পরিক স্বীকৃতির দাবি জানিয়েছে। আফ্রিকান ও আরব রাষ্ট্রগুলো অভিযোজন অর্থায়নের ব্যবধান নিয়ে গভীর হতাশা প্রকাশ করেছে।
অন্যদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং সুইজারল্যান্ড তাদের আর্থিক অবদান বৃদ্ধির আগে আরও শক্তিশালী স্বচ্ছতা ও আর্থিক নিরাপত্তার দাবি করেছে।
‘ইয়ুথনেট গ্লোবাল’-এর নির্বাহী সমন্বয়কারী সোহানুর রহমান বলেন, মাঠ পর্যায়ের মানুষ যখন কিছুই পায় না, তখন একে অভিযোজন সহায়তা বলা যায় না। অভিযোজন অর্থায়ন দাতব্য নয়, এটি লাখ লাখ মানুষের বেঁচে থাকার বিষয়। বেলেম অ্যাকশন মেকানিজমকে স্থানীয় সম্প্রদায়ের জন্য বাস্তব, অ্যাক্সেসযোগ্য ও পূর্বানুমানযোগ্য তহবিল নিশ্চিত করতে হবে।
জাস্ট ট্রানজিশন ওয়ার্ক প্রোগ্রামের একটি কন্টাক্ট গ্রুপ সেশনে অভিযোজন নিয়ে তীব্র বিতর্ক হয়। ন্যায্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ন্যায়সঙ্গত রূপান্তরের একটি সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি তৈরির প্রচেষ্টা দ্রুত দুটি বিপরীত বাস্তবতার মধ্যে রাজনৈতিক অচলাবস্থায় পরিণত হয়—এক দিকে ধনী দেশগুলোর জন্য ডিকার্বনাইজেশন, অন্যদিকে দরিদ্র দেশগুলোর জন্য উন্নয়নের প্রয়োজন।
উন্নত দেশগুলো—যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও নিউজিল্যান্ড—জোর দিয়ে বলেছে, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ধাপে ধাপে বন্ধ করাই টেকসই ভবিষ্যতের একমাত্র কার্যকর পথ। তারা নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার, পরিষ্কার জ্বালানির ব্যবহার এবং জীবাশ্মমুক্ত বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত আর্থসামাজিক সুবিধা ত্বরান্বিত করার ওপর জোর দিয়েছে।
উন্নয়নশীল দেশগুলো এ ব্যাপারে পিছিয়ে পড়েছে। আফ্রিকা, এলএমডিসি ও আরব অঞ্চলের প্রতিনিধিরা বলেছেন, জীবাশ্ম জ্বালানি এখনো কর্মসংস্থান, শিল্প, জ্বালানির প্রবেশাধিকার এবং দারিদ্র্য বিমোচনের ভিত্তি। তারা ধীরে, ভারসাম্যপূর্ণ রূপান্তরের আহ্বান জানিয়েছে—যেখানে জীবিকা ও জাতীয় উন্নয়নের অগ্রাধিকার রক্ষা পাবে।
তারা আরও বলেছে, এই প্রত্যাশা পূরণে ন্যায্য অর্থায়ন এবং প্যারিস চুক্তির ন্যায্যতার নীতিগুলো মানতে হবে। জাস্ট ট্রানজিশন কেবল শক্তির নয়, এটি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও আন্তঃপ্রজন্মীয় ন্যায়বিচারের বিষয়।
বাংলাদেশের প্রতিনিধি সোহানুর রহমান বলেন, জলবায়ু সমাধানের কেন্দ্রবিন্দুতে মুনাফা নয়, জনগণকে রাখতে হবে।
আর্থিক বিষয়ে কপ৩০-এ বাংলাদেশের অবস্থান: বাংলাদেশ বলেছে, ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য অভিযোজন একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে রয়ে গেছে; কিন্তু অভিযোজন অর্থায়ন এখনো বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়নের এক-তৃতীয়াংশের বেশি নয়। জলবায়ু প্রভাব মোকাবিলায় এটি কমপক্ষে ৫০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের আন্তর্জাতিক কনভেনশন শাখার পরিচালক মির্জা শওকত আলী বলেন, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (NAP) ২০২৩-২০৫০ বাস্তবায়নের জন্য প্রায় ২৩০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন, যা আন্তর্জাতিক সহায়তা ছাড়া অসম্ভব।
তিনি বলেন, স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ যেন গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (GCF) এবং অভিযোজন তহবিল (AF)-এর মতো আর্থিক ব্যবস্থায় সহজ ও ন্যায়সংগত প্রবেশাধিকার পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আয়ের শ্রেণিবিন্যাসের বাইরে জলবায়ু-প্রভাবিত দেশগুলোর দুর্বলতা স্পষ্টভাবে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত।
বাংলাদেশ কৃষি, পানিসম্পদ, উপকূলীয় সুরক্ষা, নগর অবকাঠামো এবং জলবায়ু-স্বাস্থ্য স্থিতিস্থাপকতার ক্ষেত্রে অভিযোজনকে অগ্রাধিকার দেবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
তিনি বলেন, নতুন সমষ্টিগত পরিমাণগত লক্ষ্য (NCQG) উচ্চাকাঙ্ক্ষী, পূর্বানুমানযোগ্য, চাহিদাভিত্তিক ও সহজপ্রাপ্য হওয়া দরকার। স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, সরাসরি প্রবেশাধিকারে জোর এবং ছাড় ও অনুদানভিত্তিক সহায়তার মাধ্যমে বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়নের কাঠামো পুনর্গঠন করতে হবে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, NCQG-এর বাস্তবায়নে স্ট্যান্ডিং কমিটি অন ফাইন্যান্স (SCF) কে কেন্দ্রীয় ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
ক্ষয়ক্ষতি ও ক্ষতির জন্য গঠিত তহবিল বিলম্ব ছাড়া কার্যকর করতে হবে, যাতে বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশগুলো অনুমানযোগ্য তহবিল প্রবাহের মাধ্যমে সরাসরি প্রবেশাধিকার পায়।
বাংলাদেশ ‘তহবিল ফর রেসপন্ডিং টু লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ (FRLD) অবিলম্বে কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছে। এই তহবিল অবশ্যই নতুন, পর্যাপ্ত, অনুদানভিত্তিক এবং সম্মুখসারির দেশগুলোর জরুরি চাহিদা পূরণকারী হতে হবে।
তিনি বলেন, আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি, NCQG আলোচনায় ক্ষয়ক্ষতির জন্য অনুদান বরাদ্দ নেই। দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা নিশ্চিতে একটি নির্দিষ্ট ও সুরক্ষিত বিধান গড়ে তুলতে হবে। বারবার জলবায়ু-সৃষ্ট দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।