কালবেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৫ নভেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০২৫, ০৮:০৬ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

রাজনৈতিক দলগুলো না চাইলেও সাংবাদিকরা পকেটে ঢুকে যায়

বিজেসির মতবিনিময় সভায় রাজনীতিকরা
রাজনৈতিক দলগুলো না চাইলেও সাংবাদিকরা পকেটে ঢুকে যায়

আগামীতে ক্ষমতায় এলে একটি স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠনের অঙ্গীকার করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, তার দল স্বাধীন গণমাধ্যম দেখতে ও তৈরি করতে চায়। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো কাউকে পকেটে নিতে চায় না; কিন্তু তারা যদি পকেটে ঢুকে যায়, সেটা বড় সমস্যা। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, গণসংহতি আন্দোলন, এবি পার্টিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতারাও দেশের গণতন্ত্র সুসংহত করতে স্বাধীন গণমাধ্যমের গুরুত্ব তুলে ধরেন।

গতকাল সোমবার দুপুরে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টার (বিজেসি) আয়োজিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় এমন বক্তব্য ও অঙ্গীকারের কথা উঠে আসে। বিজেসির চেয়ারম্যান রেজোয়ানুল হকের সভাপতিত্বে ও সদস্য সচিব ইলিয়াস হোসেনের সঞ্চালনায় মতবিনিময় সভায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা ছাড়াও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং গণমাধ্যমের উন্নয়নে কাজ করা দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিজেসির নির্বাহী মিলটন আনোয়ার। অনুষ্ঠান আয়োজনে সহায়তা করে বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশন।

বিএনপি স্বাধীন গণমাধ্যম দেখতে ও তৈরি করতে চায় মন্তব্য করে মতবিনিময় সভায় দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমাদের কমিটমেন্ট খুব পরিষ্কার। আপনারা দেখেছেন যে, আমরা ৩১ দফায় খুব পরিষ্কার করেই বলেছি, আমরা একটি স্বাধীন গণমাধ্যম দেখতে চাই এবং আমরা সেটাকে তৈরি করতে চাই।

তিনি বলেন, ক্ষমতায় গেলে গণমাধ্যম সংস্কারে কমিশন করার পরিকল্পনা ছিল বিএনপির। এরই মধ্যে সেই কমিশন করা হয়েছে। তবে কমিশনের প্রতিবেদন তৈরি হলেও সেটি নিয়ে পরবর্তীকালে কোনো আলোচনা হয়নি। আমরা আশা করি, সরকার পরিচালনার দায়িত্ব যদি জনগণের মাধ্যমে পাই, তাহলে আমরা নিঃসন্দেহে এটাকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেখব। সংস্কার যদি হৃদয়ে ধারণ না করা হয়, মনের মধ্যে না নেওয়া হয়, পরিবর্তন করতে না চাওয়া হয়, তাহলে কতটুকু সংস্কার করা সম্ভব হবে, সেটি জানা নেই।

মির্জা ফখরুল বলেন, ১৯৭৫ সালে একদলীয় শাসনব্যবস্থা বাকশাল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। সব পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। চারটি পত্রিকা ছিল যেগুলো সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলেছে। জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে একটি মুক্ত ও স্বাধীন সংবাদপত্রের ব্যবস্থা করেছেন। পরবর্তীকালে বিএনপি যখনই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসেছে, তখনই গণমাধ্যমকে উন্নত বা উপযোগী করে তোলার জন্য অনেক ব্যবস্থা নিয়েছিল।

মির্জা ফখরুল আরও বলেন, সাংবাদিকদের অনেক ইউনিয়ন আছে। আবার দুদলের দুই-তিন ভাগ আছে। তারা নিজেরাই দলীয় হয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলো কাউকে পকেটে নিতে চায় না; কিন্তু তারা যদি পকেটে ঢুকে যায়, সেটা বড় সমস্যা। গত ১৫ বছর অনেক সাংবাদিক নিজেরা উদ্যোগী হয়ে ফ্যাসিবাদকে সমর্থন করেছেন। সাংবাদিকদেরও অঙ্গীকারের প্রয়োজন আছে, তারা সেই জায়গা থেকে নিজেরা বাইরে থাকবেন এবং স্বাধীন সাংবাদিকতা করবেন।

অনুষ্ঠানে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় সংকট হলো কারা সাংবাদিক, তা সুস্পষ্ট নয়। প্রচুর সিটিজেন জার্নালিস্ট হয়েছেন, যার কারণে পেশাদার সাংবাদিকদের সঙ্গে নতুন সাংবাদিকদের মধ্যে মর্যাদাগত বিস্তর পার্থক্য তৈরি হয়েছে। তাই সাংবাদিকতার মানদণ্ড থাকা অত্যন্ত জরুরি। কেননা, গণমাধ্যম কার্যালয়ের ভেতরে বড় ধরনের রাজনীতি বিদ্যমান। নিজেদের মতাদর্শ অনুযায়ী লোক নিয়োগের প্রথা আছে। এই অভ্যন্তরীণ কলুষতা দূর করতে কাজ করতে হবে। জনগণের পক্ষে কাজ করতে রাজনীতিবিদ এবং গণমাধ্যম একসঙ্গে কাজ করবে।

আখতার হোসেন বলেন, ফ্যাসিবাদের উত্থান ও বিস্তার রোধে সাংবাদিকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ফ্যাসিবাদী বয়ান তৈরি করতে সাংবাদিকরা যেমন নিজেদের যুক্ত করেছেন, তেমনি নিপীড়নও সহ্য করেছেন। ফলে এক দৃষ্টিতে বিষয়টি জটিল হয়ে দাঁড়ায়। সাংবাদিকদের সম্মানী, পারিশ্রমিক ও নিরাপত্তাহীনতা একটি বড় সমস্যা। সুনির্দিষ্ট বেতন কাঠামো না থাকায় স্বাধীন সাংবাদিকতাকে ব্যাঘাতের সম্মুখীন হতে হয়। মুখাপেক্ষী অবস্থার কারণে পক্ষপাতমূলক সংবাদ প্রকাশে মানসিক চাপও পড়ে।

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, বিএনপিকে নিয়ে অনেক সমালোচনা করা হলেও শেষ পর্যন্ত মানুষ এ দলকেই ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবে। আগামী পাঁচ বছরের জন্য কারা দায়িত্ব পাবেন, বোঝা যায় তো নাকি? আমি জানি না। আপনারা হয়তো বলতে চাইবেন না। আমি বলি, আমার তো মনে হয় আমি কোনো বিএনপির পক্ষে ক্যাম্পেইন করি না, আমি তো বিএনপি করি না; কিন্তু আমার মনে হয়, অনেক ক্রিটিসিজমের (সমালোচনা) পরও শেষ পর্যন্ত মানুষ বিএনপিকেই ভোট দেবে।

সাংবাদিকদের ওয়াচডগের ভূমিকায় থাকতে হবে উল্লেখ করে মান্না বলেন, সাংবাদিকরা শুধু ওয়াচডগ নন, তারা মাঝে মধ্যে পথপ্রদর্শকও হতে পারেন। যারা সাংবাদিকদের দাবিগুলো পূরণ করার অঙ্গীকার করবে, তাদের পেছনেও সাংবাদিকদের ওয়াচডগের মতো থাকতে হবে।

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সহকারী সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন মূলত অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছে। গণমাধ্যমকর্মীরাও কিন্তু শ্রমিক। তাদের অধিকার সম্পর্কে তাদের আরও সচেতন হতে হবে। প্রিন্ট মাধ্যমে যদিও কিছুটা অধিকার আছে কিন্তু ব্রডকাস্টিংয়ে কী! গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হারালে কিন্তু মানুষের আর কোনো নাগরিক অধিকার থাকে না।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক আশরাফ আলী আকন বলেন, আমরা সম্মিলিতভাবে সাংবাদিকদের জন্য বাস্তবসম্মত, ন্যায়ানুগ ইশতেহার প্রকাশ করব। গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের-জাতির আয়নাস্বরূপ। আয়না স্বচ্ছ না হলে জাতির ছবি দেখা যায় না।

তিনি বলেন, কিছু কিছু গণমাধ্যমকর্মী অস্বচ্ছ আয়নার মতো ভূমিকা পালন করেছেন। জাতির চেহারা তাদের লেখনীর মাধ্যমে দেখা যায়নি। আমি বিশ্বাস করি সাংবাদিকদের সঠিক মূল্যবোধ ও দায়িত্ববোধ না থাকলে তারা জাতির আয়না হতে পারে না। আপনারা বৈষম্যহীন ভূমিকা পালন করবেন। সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যম ছাড়া গণতন্ত্র সুসংহত হয় না।

এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, টিভি সেক্টরকে নির্ভর করতে হয় বেসরকারি বিজ্ঞাপনের ওপর। আর পত্রিকায় কিন্তু সরকারি বিজ্ঞাপনের সুযোগ আছে। আমরা সরকারে ভূমিকা রাখার সুযোগ পেলে টিভির ক্ষেত্রেও সরকারি বিজ্ঞাপন দেওয়ার সুযোগ তৈরির চেষ্টা করব।

গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকী বলেন, প্রায় একই যোগত্য নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পাস করে কেউ আমলাতন্ত্রে যাচ্ছেন, আর কেউ গণমাধ্যমে যাচ্ছেন। আমলাতন্ত্রে একটি নিশ্চিত জীবনে ঢুকছেন; কিন্তু গণমাধ্যমে তাকে একটা অনিশ্চিত যাত্রার মধ্যে থাকতে হচ্ছে। প্রত্যেক পেশারই একটি নির্দিষ্ট চেহারা থাকে; কিন্তু একটি পেশা যদি সম্পূর্ণ অনিশ্চিত থাকে তার আয়ের প্রশ্নে কিংবা মর্যাদা ও অন্যান্য অধিকারের প্রশ্নে, তাহলে ওই ব্যক্তির কাছ থেকে পেশাদারত্ব, নিষ্ঠা ও নৈতিকতা আশা করাটা কঠিন।

তিনি বলেন, ঢাকা শহরে যারা কাজ করেন, সেটা তো আমরা দেখতে পাচ্ছি। মফস্বলে তো অনেক মিডিয়ার কোনো বেতনই নেই। যেভাবে পারও জোগাড় করে নাও এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। ফলাফলটা হচ্ছে, সামাজিকমাধ্যমের কারণে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। যে কারণে ফেক নিউজের মতো একটি জিনিস সমাজে অস্থিরতা তৈরি করেছে।

জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, একটি রাষ্ট্রের উন্নতি-অগগ্রতির জন্য সংবাদমাধ্যমকে বলা হয় দর্পণ। সাংবাদিকতার দায়িত্বটি ন্যায় ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে পালন করতে হবে। কেউ কেউ বলেছেন, সাংবাদিকরা রাজনৈতিক দলে ঢুকে যান। আমি বলব, আপনারা কেউ রাজনৈতিক দলের হোন আর না হোন আপনারা দয়া করে অবশ্যই বাংলাদেশি হোন। আমরা কেউ নিরপেক্ষ নই।

বিজেসির আট দফা: তাদের আট দফা প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে—সম্প্রচারমাধ্যমের জন্য আলাদা আইন প্রণয়ন, একটি স্বাধীন জাতীয় সম্প্রচার কমিশন গঠন, টিভি চ্যানেলগুলোকে পে-চ্যানেল ঘোষণা করা ও সম্প্রচারমাধ্যমকে শিল্প ঘোষণা এবং সম্প্রচার সাংবাদিকদের জন্য জবাবদিহিমূলক ‘কোড অব এথিকস’ প্রণয়ন; টিভি লাইসেন্স নীতিমালা ও মালিকানার ধরন নির্ধারণ, পরিচালনা পর্ষদে কর্মীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা এবং দলীয় প্রভাবমুক্ত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার মতো কাঠামোগত সংস্কার, স্বাধীন অ্যাক্রেডিটেশন কর্তৃপক্ষ এবং ডিজিটাল মাধ্যমে সাংবাদিকতার নীতিমালার প্রণয়ন।

গণমাধ্যম কমিশনের সুপারিশ ও সাংবাদিকদের প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের অনিশ্চয়তায় পড়ে আছে বলে উদ্বেগ জানিয়েছে বিজেসি। তারা আশা করছে, এই সুপারিশগুলো গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে তুলে ধরবে এবং দ্রুত বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেবে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ভারতীয় নাগরিকদের পুশইনের চেষ্টা / সীমান্তে উত্তেজনা, শক্ত অবস্থানে বিজিবি 

আজ রাতে তেহরান পুড়বে : বেন-গাভির

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ইসরায়েলজুড়ে রেড অ্যালার্ট জারি

ভূমিকম্পের সময় যে দোয়া পড়বেন

বাসচালককে মারধর ও ছাত্রদল কর্মীকে কোপানোর অভিযোগ  

দেশের যেসব জেলায় ভূমিকম্প অনুভূত, উৎপত্তিস্থল যেখানে

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূমিকম্প অনুভূত

খেলতে গিয়ে প্রাণ গেল দুই শিশুর

চা শ্রমিকদের বকেয়া পরিশোধের দাবিতে ইউএনওর কাছে স্মারকলিপি

আরও বাড়ল ই-ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের সময়

১০

লেবাননে হামলা অব্যাহত থাকলে আবারও যুদ্ধে নামব : ইরান

১১

‘বিশ্ব এলপিজি দিবস-২০২৬’ উদযাপন করল ফ্রেশ এলপি গ্যাস

১২

আর্জেন্টিনা যেন মিনি হাসপাতাল!

১৩

বিশ্বকাপ এলেই রং বদলান নেইমার

১৪

রামিসা হত্যাকাণ্ডের রায়ে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ পড়লেন জামায়াত আমির

১৫

সাতক্ষীরা পৌর নির্বাচনে নতুন সমীকরণ, আলোচনায় নাসিম ফারুক খান মিঠু

১৬

বিশ্বকাপে সেদিন আবির্ভাব হয়েছিল এক ‘ফুটবল দেবতার’, নাম তার ম্যারাডোনা

১৭

লাশ নিয়ে থানা ঘেরাও, এস আই প্রত্যাহার

১৮

বাজেট ২০২৬-২৭ / মানবসম্পদ উন্নয়নের রূপরেখা চান বিশেষজ্ঞরা

১৯

সেই তিন ভাইয়ের অ্যাকাউন্টে জমা হলো ১২ লাখ টাকা

২০
X