আদর শর্মা ও এ কে বাবর, রাউজান (চট্টগ্রাম)
প্রকাশ : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৭:২৯ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

রাউজানে রাতে দরজা আটকে একের পর এক ঘরে আগুন

নতুন করে আগুন ঠেকাতে রাত জেগে দল বেঁধে পাহারা
রাউজানে রাতে দরজা আটকে একের পর এক ঘরে আগুন

মধ্যরাত পেরিয়ে তখন প্রায় ভোর। পরিবারের সদস্যরা সবাই তখনো গভীর ঘুমে। এরই মধ্যে কিছুটা বাড়তি উত্তাপ আর কেরোসিনের কটু গন্ধে ঘুম ভাঙে এক গৃহবধূর। আড়মোড়া ভেঙে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াতেই বুঝতে পারেন তাদের দুই ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে আগুন। তার চিৎকার-চেঁচামেচিতে ক্ষণিকের মধ্যে ঘুম ভাঙে বাড়ির অন্য বাসিন্দাদেরও। আগুন লাগার বিষয়টি বুঝতে পেরে তারা সবাই ঘর থেকে হুড়াহুড়ি করে বের হওয়ার চেষ্টা করলেও দরজার হুক বাইরে থেকে বন্ধ পান। চোখের সামনে যেন সাক্ষাৎ দাঁড়িয়ে যমদূত। কোনো দিশা না পেয়ে দা-বঁটি দিয়ে কুপিয়ে টিন ও বাঁশের বেড়া কেটে কোনোমতে বের হন ঘর থেকে। এতে অল্পের জন্য পুড়ে মরার হাত থেকে বাঁচেন দুই পরিবারের ৯ জন। যদিও চোখের সামনেই দাউ দাউ করে জ্বলে কয়েক মিনিটেই পুড়ে ছাই হয়ে যায় তাদের মাথা গোঁজার সামান্য ঠাঁইটুকু। কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে সবাই হয়ে পড়েন গৃহহীন।

ফলে এই শীতেও খোলা আকাশের নিচে দিনরাত পার করতে হচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বী এই মানুষগুলোকে। পাশাপাশি আগুনের ঘটনার পর থেকে প্রতিটি মুহূর্ত তাদের পার করতে হচ্ছে মৃত্যুর ভয় নিয়ে। এ চিত্র চট্টগ্রামের রাউজান পৌর এলাকার একটি জনপদের। গত মঙ্গলবার ভোরের দিকে পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম সুলতানপুর গ্রামের দুবাই প্রবাসী মিঠুন শীল ও দিনমজুর সুখ শীলের ঘরে আগুন লাগার এ ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন আলামত ও পারিপার্শ্বিকতায় আগুন পরিকল্পিতভাবে লাগানো বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মঙ্গলবার ভোরের ওই আগুনে সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবার দুটির টিন ও বাঁশের বেড়া দিয়ে বানানো বসতবাড়ি মুহূর্তের মধ্যেই ভস্মীভূত হয়। দুবেলা দুমুঠো খেয়ে, দিনের শেষে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু এখন শুধুই স্মৃতি। সেই ছোট্ট স্বপ্ন চোখের সামনেই বিলীন হয় আগুনে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার দুটির সদস্যদের দুচোখে জল, আর বুকের গহিনে যেন জ্বলছে আগুন। পাশাপাশি তাদের সঙ্গে কথা বললে স্পষ্টতই চোখে-মুখে ভেসে ওঠে একরাশ আতঙ্ক ও অসহায়ত্ব।

ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুবাই প্রবাসী মিঠুন শীলের ঘরের ভেতরে পরিবারের মোট আটজন সদস্য ঘুমাচ্ছিলেন। রাত সোয়া ৩টা থেকে ৪টার মধ্যে হঠাৎ আগুনের তাপে ঘুম ভেঙে গেলে তারা ঘর থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু বাইরে থেকে দরজায় ছিল হুক লাগানো। বাধ্য হয়ে টিন ও বাঁশের বেড়া কেটে তারা নিজেদের রক্ষা করেন।

ক্ষতিগ্রস্ত অনিল শীলের ছেলে দুবাই প্রবাসী মিঠুন শীল কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমি তিন মাস আগে দেশে এসে বিয়ে করেছি। পাসপোর্ট, বিমান টিকেট, আসবাবপত্র আর ৮০-৯০ হাজার টাকা—সবই আগুনে পুড়ে গেছে। আমাদের প্রায় ১৪-১৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এখন আমরা থাকছি খোলা আকাশের নিচে। নিরাপত্তা চাই, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

সুখ শীল, পেশায় দিনমজুর। তার শেষ সম্বল টিন ও বাঁশের ঘরটিও আগুনে পুড়ে গেছে। অসহায় কণ্ঠে তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘এটি আমাদের শেষ আশ্রয় ছিল। এখন আমরা কোথায় যাব?’

রাউজান থানার ওসি সাজেদুল ইসলাম জানান, ভোররাত ৪টার দিকে আগুনের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। দুর্বৃত্তরা ঘরের দরজায় বাইরে থেকে হুক লাগিয়ে আগুন দেয়। বাসিন্দারা বেড়া কেটে বের হন। এ ঘটনায় জড়িতদের শনাক্তে পুলিশ কাজ করছে।

রাউজানের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস. এম. রাহাতুল ইসলাম বলেন, ‘সবাইকে সতর্ক করেছি। পাড়া-মহল্লায় কমিটি করে পাহারা দেওয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সরাসরি সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’

এদিকে মঙ্গলবারের ঘটনা শুধু নয়, চলতি সপ্তাহে আরও অন্তত তিনটি পরিবারের ঘর পুড়েছে আগুনে। গত ১৮ ডিসেম্বর রাউজান সদর ইউনিয়নের জয়নগর গ্রামের বড়ুয়াপাড়ায় দিনমজুর সাধন বড়ুয়ার বসতঘর ও গোয়ালঘরে আগুন দেওয়া হয়। পরিবারের সদস্যদের ভেতরে আটকে রেখে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরানো হয়েছিল। পাশের আরও তিনটি পরিবারের ঘরে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। প্রতিবেশীরা এগিয়ে এলে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়। সাধন বড়ুয়া কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়। পরিকল্পিতভাবে আমাদের পরিবারকে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। আমরা সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

পরদিন শনিবার রাউজান পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ঢেউয়াপাড়া এলাকায় আরও দুটি হিন্দু পরিবারের বাসভবনে আগুন দেওয়া হয়। প্রথমে বিমল তালুকদার ও রুবেল দাশের ঘরে আগুন লাগানো হয়। বাসিন্দারা বের হতে গিয়ে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ দেখতে পান। বাঁশের বেড়া ভেঙে তারা প্রাণে রক্ষা পান। একই এলাকায় অমল তালুকদারের ঘরে আগুন দেওয়ার চেষ্টা চালানো হয়। এ ঘটনায় লিটন দাশ নামে একজন আহত হন।

এই তিনটি ঘটনার প্রতিটিতেই দুর্বৃত্তরা কেরোসিন বা পেট্রোল লাগানো কাপড় ব্যবহার করেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতনদের নাম, মোবাইল ফোন নম্বরসহ হাতে লেখা কাগজও উদ্ধার হয়েছে। সর্বশেষ ঘটনায় একটি ব্যানার উদ্ধার করা হয়, যাতে এসব আগুনের ঘটনায় বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ও সক্রিয় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে দায়ী করা হয়। স্থানীয়রা বলছেন, এই ব্যানার দেখে আতঙ্ক আরও বেড়ে গেছে।

রাউজান উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অরুণ পালিত বাসু বলেন, ‘ঘটনাগুলো গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। আমরা আইন নিজ হাতে তুলে নেব না। প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তরা যেন একা বোধ না করে, আমরা তাদের পাশে আছি।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রাউজান থানার ওসি সাজেদুল ইসলাম বলেন, ‘দুর্বৃত্তদের শনাক্ত করে এ পর্যন্ত ৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দুটি ঘটনায় মামলা হয়েছে। সর্বশেষ ঘটনায়ও মামলা দ্রুত দায়ের করা হবে।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস. এম. রাহাতুল ইসলাম বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকে বসে কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য সমাধান আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। নিরাপত্তা ও ন্যায্য সহায়তা নিশ্চিত করা হবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে আর এমন নৃশংস পরিস্থিতি না ঘটে।’

প্রশাসনের অবহেলা দেখছেন অনেকেই: ঘরে আগুন দেওয়ার প্রথম ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ও কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ায় পরে আগুন দেওয়ার আরও একাধিক ঘটনা ঘটে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। চট্টগ্রাম জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট নিতাই প্রসাদ বলেন, ‘কলমপতি গ্রামের একটি হিন্দু পরিবারের ঘরে আগুন দেওয়ায় এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সূচনা। এরপর কেউটিয়া, সিকদাইর ও সুলতানপুর গ্রামে ধাপে ধাপে আগুনের ঘটনা ঘটেছে। আমরা প্রশাসনকে লিখিতভাবে অবগত করেছি। ঘটনাস্থলে বিএনপির নেতা এবং প্রশাসনের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু কলমপতি গ্রামে আগুন লাগার পর থানায় গেলে তারা এজাহার নেয়নি, শুধু অভিযোগ গ্রহণ করেছে। যদিও তারা জানিয়েছিল, পরের দিন ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় এমন ঘটনা অন্যান্য গ্রামেও ছড়িয়ে পড়ে।’

পূজা উদযাপন পরিষদের এই নেতা আরও বলেন, ‘পূজা কমিটির পক্ষ থেকে এখনো কোনো আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়নি। বিশেষ করে সুলতানপুরে যে ঘরগুলো আগুনে পুড়ে গেছে, তাদের পুনর্নির্মাণের জন্য আর্থিক সহায়তা করা অত্যন্ত জরুরি।’

সরেজমিন ক্ষতিগ্রস্তদের হৃদয়বিদারক চিত্র দেখা গেছে। তাদের টিন ও বাঁশের বেড়ার ঘর পুড়ে ছাই। দিনের শেষে মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়েছে পরিবারগুলো। প্রবাসফেরত মিঠুন শীল তার পাসপোর্ট, বিমান টিকেট ও নগদ অর্থসহ মূল্যবান মালপত্র হারিয়েছেন। সুখ শীলের শেষ সম্বল ঘরটুকু আগুনে পুড়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্কে রাত কাটছে রাউজানবাসীর। একের পর এক অগ্নিকাণ্ডে অনেক জনপদেই রাত জেগে দল বেঁধে পাহারা চলছে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

কটিয়াদীতে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে বৌ-শাশুড়ির মৃত্যু

ঝিনাইদহের পুলিশ সুপারকে প্রত্যাহার

প্রাইভেট পড়ানোর অজুহাতে ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ, স্কুলশিক্ষক গ্রেপ্তার

নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে ট্রাক্টর, চালকের মৃত্যু

১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে হামলা ও ভাঙচুর

আজম খানের মৃত্যুবার্ষিকী আজ, শিল্পীর স্মরণে বিশেষ আয়োজন

টকশোতে যুক্তিতর্কে না পারলে বলে রাশেদ খাঁন ‘নব্য বিএনপি’

১৭ জনকে পুশইনের চেষ্টা, শূন্য রেখায় আটকে দিল বিজিবি

কারাজীবনে ‘গাদিরে খুম’ ঘিরে আইভীর বিশেষ প্রার্থনা, কী এটি

এনএও প্রতিবেদনে তথ্য প্রকাশ / রয়্যাল লজের কটেজ সাব-লেট দিয়েছিলেন প্রিন্স অ্যান্ড্রু

১০

তিন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে ৩৩ জনকে পুশইনের চেষ্টা

১১

জন্মদিনে নির্বাচনের ঘোষণা / নায়ক থেকে নেতা হওয়ার পথে কায়েস আরজু

১২

সংস্কারের পর দ্রুত খুলে দেওয়া হবে জিয়া স্মৃতি জাদুঘর : মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রী

১৩

চুক্তি হলে মোজতবা খামেনির সঙ্গে বৈঠকে আপত্তি নেই ট্রাম্পের

১৪

ব্রেকআপের জেরে অফিসে ঢুকে নারী সহকর্মীকে ছুরিকাঘাতে হত্যা

১৫

পদ্মায় বাসডুবি / যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়ার নিয়ম বাস্তবায়নে হতাহত নেই : নৌ মন্ত্রণালয়

১৬

সাংবাদিক কাদের গণি চৌধুরীর বড় ভাই আহমদ গণি মারা গেছেন

১৭

আর্জেন্টাইন সমর্থকদের ফ্রি আইনি সেবার ঘোষণা আইনজীবীর

১৮

পুকুরে ডুবে প্রাণ গেল ভাই-বোনের

১৯

বিশ্ব পরিবেশ দিবসে সাতক্ষীরায় ব্যতিক্রমী বৃক্ষ পদযাত্রা, পরিবেশ রক্ষার শপথ

২০
X