

ঢাকায় মেট্রোরেলের যাত্রা শুরু হওয়ার আজ তিন বছর হলো। কিন্তু এ যাত্রা এখানেই শেষ নয়। প্রাথমিক পরিকল্পনায় মেট্রোর নেটওয়ার্কে পাঁচটি লাইনে মোট ছয়টি পথ হওয়ার কথা। এসব লাইন পরবর্তী সময়ে আরও বড় হয়ে ঢাকার আশপাশের জেলাগুলোতেও যুক্ত করার পরিকল্পনা ছিল। সেই ভাবনা এখন অনেকটা মাটি চাপা পড়েছে। ঢাকার ভেতরে যে ছয়টি পথ ২০৩০ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল, তা যে হচ্ছে না, এখন অনেকটাই নিশ্চিত। স্বস্তির যাত্রার প্রিয় বাহন হিসেবে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠা চলমান মেট্রোর রক্ষণাবেক্ষণেও ঘাটতি দেখা দিয়েছে। আর বাকি প্রকল্পগুলোর কাজ আশানুরূপ অগ্রসর হচ্ছে না।
প্রথম চালু হওয়া উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত এমআরটি লাইন-৬ চলতি বছরেই কমলাপুর পৌঁছানোর কথা ছিল। কিন্তু এতে আরও অন্তত দুই বছর সময় লাগবে। আপাতত ২০২৭ সালকে লক্ষ্য রেখে কাজ চলছে। এমআরটি লাইন-১ ও লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পের কাজ অনেকটাই স্থবির। এই দুটি প্রকল্পের কাজের দর পুনর্মূল্যায়নের জন্য সরকার ব্যস্ত। দর কমাতে গিয়ে ঠিকাদারদের সঙ্গে একাধিক প্যাকেজ বাতিলের উদ্যোগও নিয়েছে সরকার। প্রকল্প কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থাকে (জাইকা) চিঠি দিয়েছে। জাইকার জবাবে প্যাকেজ বাতিলের বিরোধিতা করা হয়েছে। ফলে এই দুই প্রকল্পের কাজ কাগজে চললেও বাস্তবে কোনো অগ্রগতি নেই।
এমআরটি লাইন-৫ (দক্ষিণ) প্রকল্প নির্মাণ করা হবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পরিকল্পনা কমিশনে এই পথটি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এখনো লাইন-২ ও লাইন-৪-এর অর্থায়ন চূড়ান্ত হয়নি। এমআরটি লাইন-২ এখন সম্ভাব্যতা যাচাই, বিশদ নকশা প্রণয়ন ও দরপত্র প্রস্তুতির পর্যায়ে রয়েছে। আর লাইন-৪ এখনো সম্ভাব্যতা যাচাই পর্যায়ে রয়েছে। সব মিলিয়ে ঢাকার মেট্রোরেল বাস্তবায়নে স্থবিরতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এতে মেট্রোকেন্দ্রিক মহাপরিকল্পনা পথ হারিয়ে ফেলেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে ২০৩০ সালের মধ্যে মেট্রোর মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এর জন্য রাজনৈতিক ভিশন অপরিহার্য। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অরাজনৈতিক হওয়ায় অনেক কাজ থেমে আছে। এই সরকার বড় কোনো ঝুঁকি নিতে চায় না। রাজনৈতিক সরকার এলে প্রকল্প বাস্তবায়নে স্পষ্টতা আসবে। তখন কাজ হলে সেটি দৃশ্যমান হবে, আর না হলে তা স্পষ্টভাবে বাতিল হবে বলে তাদের মত।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান কালবেলাকে বলেন, ‘মেট্রোর কাজ স্থবির হয়ে আছে, এটা ঠিক। আমরা চেয়েছি, কাজগুলো আমরাও করতে পারতাম। কিন্তু আমাদের আপত্তি ছিল দামের বিষয়ে। আমরা জাইকাকে চিঠি দিয়েছি। প্রত্যাশিত জবাব পাইনি। জাইকা একটি সাধারণ বিবৃতি দিয়েছে। আমরা চেয়েছিলাম নির্দিষ্ট জবাব। এই সরকারের সময় খুব বেশি নেই। এখানে জাইকাও কৌশলগত অবস্থান নিতে পারে।’
মেট্রোরেলে যাত্রী ও আয় বাড়লেও দৈনন্দিন খরচ চালাতে প্রকল্পের অর্থ ব্যবহার করা হচ্ছে। যদিও এই অর্থ অবকাঠামো নির্মাণে বরাদ্দ ছিল, সেখান থেকে বিদ্যুৎ বিল, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা এবং ঋণের সুদ পর্যন্ত পরিশোধ করা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রকল্পের অর্থ ধার হিসেবে নিয়ে খরচ করা হচ্ছে, যা পরে ফেরত দেওয়া হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা এটিকে অনিয়ম বলেই উল্লেখ করছেন।
গত দুই অর্থবছরে রাজধানীতে মেট্রোরেল চালাতে খরচ হয়েছে ২৯৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে খরচ হয় ১২৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়ায় ১৭৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকায়। এক বছরে খরচ বেড়েছে ৫১ কোটি ২৬ লাখ টাকা। এই দুই বছরে মোট ব্যয়ের মধ্যে ১৪৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা এসেছে প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে। ডিএমটিসিএল প্রথম বছরে খরচ করে ৫৩ কোটি ৮১ লাখ টাকা এবং দ্বিতীয় বছরে ৯৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
মেট্রোরেল লাইন-৬-এর মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত বর্ধিত অংশে চলতি বছরের ডিসেম্বরে যাত্রী পরিবহন শুরুর কথা থাকলেও ঠিকাদার নিয়োগে জটিলতার কারণে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ দিয়ে প্রায় ৭০ শতাংশ বেশি দরে চুক্তি করা হয়। পণ্যের দাম বৃদ্ধি, ডলারের সংকট, কাঁচামাল সরবরাহে জটিলতা ও পরিবহন ব্যয়ের কারণে পুরোনো ঠিকাদার নির্ধারিত দরে কাজ করতে রাজি হননি।
এ কারণে এমআরটি লাইন-৬ প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করার প্রস্তাব এসেছে। মূলত এক দশমিক ১৬ কিলোমিটার বর্ধিত অংশ নির্মাণে এই সময় বাড়ানো হয়েছে। ২০২৬ সালের অক্টোবর মাসে মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত পরীক্ষামূলকভাবে মেট্রোরেল চালু হবে এবং ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রী চলাচল শুরু হবে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ অংশের কাজের অগ্রগতি হয়েছে ৬৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
২০২২ সালের ডিসেম্বরে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত মেট্রোর চলাচল শুরু হয়। ২০২৩ সালের শেষে মতিঝিল পর্যন্ত সব স্টেশন চালু করা হয়।
পাতাল মেট্রোরেল নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে। ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার লক্ষ্য থাকলেও এখন পর্যন্ত কার্যত কোনো অগ্রগতি নেই। সরকার এখনো সব চুক্তি সম্পন্ন করতে পারেনি। খরচ কমানোর কথা বলা হলেও কীভাবে তা করা হবে, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্টতা নেই। ফলে এ প্রকল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে এবং যাত্রীসেবা চালু হতে আরও অন্তত ১০ বছর সময় লাগতে পারে।
ডিএমটিসিএল সূত্রে জানা গেছে, আগের সরকারের কিছু চুক্তি নিয়ে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার সংশয়ে রয়েছে। এজন্য অনেক প্যাকেজে ঠিকাদার নিয়োগ হলেও চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। কর্তৃপক্ষ চায়, সব চুক্তি সম্পন্ন করে একসঙ্গে কাজ শুরু করতে। ব্যয় কমাতে হলে জাপানের সঙ্গে ঋণচুক্তি বাতিলের কথাও ভাবা হচ্ছে এবং নতুন অর্থায়নের পথ খোঁজা হচ্ছে।
ডিএমটিসিএলের এক সভার কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, এমআরটি লাইন-১ এবং লাইন-৫ (উত্তর ও দক্ষিণ) কার্যক্রম সংকুচিত হয়েছে। এমআরটি লাইন-১-এর কাজ ২০২৬ সালে এবং লাইন-৫ (উত্তর)-এর কাজ ২০২৮ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ৩০ আগস্ট পর্যন্ত ডিপোর ভূমি উন্নয়নসংক্রান্ত প্যাকেজ ছাড়া অন্য কোনো কাজ শুরু হয়নি।
ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুখ আহামেদ কালবেলাকে বলেন, ‘আগে নির্ধারিত সময়টি ছিল অযৌক্তিক। মেট্রোর নির্মাণ বাস্তবায়নে অন্তত সাত বছর সময় লাগে। শুরুর আগে অনেক ধাপের কাজ থাকে। আগেরবার জোর করে চালু করা হয়েছিল।’
কাঞ্চন সেতু থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ৩১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার পথ এমআরটি লাইন-১ নামে পরিচিত হবে। এর মধ্যে ১৯ দশমিক ৮৭ কিলোমিটার মাটির নিচ দিয়ে এবং ১১ দশমিক ৩৭ কিলোমিটার উড়ালপথে চলবে। এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে জাইকা দেবে ৩৯ হাজার ৪৫০ কোটি ৩২ লাখ এবং সরকার দেবে ১৩ হাজার ১১১ কোটি ১১ লাখ টাকা।
এদিকে হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে ২৯ হাজার ১১৭ কোটি ৫ লাখ টাকা দেবে জাইকা, বাকি অংশ সরকার বহন করবে।
এমআরটি লাইন-২, ৪ ও ৫ (দক্ষিণ) এখনো পরিকল্পনার স্তরেই রয়েছে। গাবতলী থেকে আফতাবনগর পর্যন্ত ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার পথ নিয়ে নতুন করে ভাবছে পরিকল্পনা কমিশন। এমআরটি লাইন-২ প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন নিশ্চিত করেছে, যার মাধ্যমে ডিএমটিসিএল জনবল প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালাবে।
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ১০০ জন কর্মীকে ছয় থেকে নয় মাস মেয়াদে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এমআরটি লাইন-৪ প্রকল্পে সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন হয়েছে। গত ১৭ ডিসেম্বর প্রকৌশলীরা চূড়ান্ত নকশা উপস্থাপন করেছেন। এখন বিস্তারিত নকশা, প্যাকেজ নির্ধারণ ও দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি চলছে।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান কালবেলাকে বলেন, ‘এমন বড় প্রকল্পের ভিত্তি রাজনীতি। যে দল ক্ষমতায় থাকবে, প্রকল্পও সেই অনুযায়ী এগোবে। এখন প্রকল্প থেমে আছে। নির্বাচনের পর গতি কতটা বাড়বে, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক সরকারের ওপর।’