শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭ মাঘ ১৪৩৩
নূর মোহাম্মদ
প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:৪৪ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছায়া

অধ্যাদেশের খসড়া অনুমোদন
ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছায়া

অবশেষে ঢাকার সাত সরকারি কলেজ নিয়ে ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’ স্থাপনে অধ্যাদেশের খসড়া অনুমোদন দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কার্যালয়ে তার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। এখন রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষর করলেই শুরু হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম। তবে শুরুতে যে কাঠামোতে বিশ্ববিদ্যালয়টি পরিচালনার কথা ছিল সেখান থেকে ‘ইউটার্ন’ নিয়েছে সরকার। বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশের পরিমার্জিত খসড়ায় সরকার চেষ্টা করেছে—শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও শিক্ষা ক্যাডার সব পক্ষের স্বার্থ রক্ষার একটি সমঝোতামূলক মডেল দাঁড় করাতে। যেখানে আধুনিক ও মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাত কলেজের ঐতিহ্য রক্ষার চেষ্টাও হয়েছে। ফলে নতুন একটি বিশ্ববিদ্যালয় হলেও তা অনেকটা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মতোই হবে—এমনটাই বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজধানীর সাতটি বড় সরকারি কলেজ নিয়ে প্রস্তাবিত ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি গঠনের উদ্যোগ শুরু থেকেই বিতর্কের মুখে পড়ে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও শিক্ষা ক্যাডার—তিন পক্ষের আপত্তিতে দানা বাঁধে বড় আন্দোলন। সেই প্রেক্ষাপটে শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রাথমিক খসড়া থেকে সরে এসে অধ্যাদেশের কাঠামোয় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে।

শুরুর খসড়া এবং গতকাল পাস হওয়া খসড়া বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রথম খসড়ায় চারটি অনুষদে ২৩টি বিষয়ে স্নাতক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করানোর কথা বলা হলেও এখন সেখান থেকে সরে এসে যে কলেজ যেভাবে আছে, তা ঠিক রেখেই নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হবে। অনুষদের পরিবর্তে স্কুলভিত্তিক একাডেমিক ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। এতে সাত কলেজের নিজস্ব পরিচয়, বৈশিষ্ট্য, অবকাঠামো এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি অক্ষুণ্ন থাকবে। কলেজগুলোর শিক্ষা কার্যক্রমও চলবে বর্তমানে যেভাবে চলছে অনেকটা সেভাবেই। প্রথম খসড়ায় সাত কলেজকে কার্যত ইন্টিগ্রেটেড ক্যাম্পাস বা এক ক্যাম্পাসে সব ধরনের ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছিল। চূড়ান্ত অধ্যাদেশে—কলেজগুলোকে ‘সংযুক্ত কলেজে’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।

প্রথম খসড়ায় একেকটি কলেজকে নিয়ে আলাদা স্কুলভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনা ছিল। যেমন ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ ও বেগম বদরুন্নেসা মহিলা কলেজ ক্যাম্পাসে ‘স্কুল অব সায়েন্সের’ কার্যক্রম চালুর কথা বলা হয়েছিল। সরকারি বাঙলা কলেজে ‘স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ’, সরকারি তিতুমীর কলেজে ‘স্কুল অব বিজনেস স্টাডিজ’ এবং কবি নজরুল সরকারি কলেজ ও সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ থেকে ‘স্কুল অব ল অ্যান্ড জাস্টিস’ পরিচালিত হবে বলে বলা হয়েছিল। তবে নতুন খসড়ায় সে ব্যবস্থা বাদ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, যেখানে যে বিভাগ আছে সেখানে সেভাবে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে। আগের খসড়ায় সাত কলেজকে চারটি ‘স্কুলে’ ভাগ করে পাঠদান ও গবেষণা পরিচালনার পরিকল্পনা ছিল। নির্দিষ্ট কলেজে নির্দিষ্ট স্কুলের কার্যক্রম স্থায়ীভাবে পরিচালনার প্রস্তাব ছিল। শিক্ষক নিয়োগ সম্পূর্ণভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেকশন বোর্ডের মাধ্যমে করার কথা বলা হয়েছিল। এতে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের প্রায় দেড় হাজার পদ বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। কলেজগুলোর প্রশাসনিক ও একাডেমিক স্বাতন্ত্র্য হারানোর অভিযোগ তোলেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এই কাঠামোর বিরোধিতা করে শিক্ষার্থীরা রাজপথে নামেন। পাশাপাশি শিক্ষা ক্যাডারভুক্ত শিক্ষকরা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে ধারাবাহিক আন্দোলন শুরু করেন। সেই প্রেক্ষাপটে খসড়ায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়েছে। এগুলো হলো—সাত কলেজ ‘সংযুক্ত কলেজ’ হিসেবে থাকবে, কলেজগুলোর অভ্যন্তরীণ প্রশাসন আগের মতোই অধ্যক্ষের অধীনে পরিচালিত হবে। আগের খসড়ার মতো কলেজভিত্তিক স্কুল চাপিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব বাদ দিয়ে এখন স্কুল থাকবে বলে বলা হয়েছে। মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক সমন্বয় কাঠামো হিসেবে পরামর্শমূলক সংস্থা হিসেবে কাজ করবে বিশ্ববিদ্যালয়। খসড়া আইনে সরাসরি ক্যাডার পদ সংরক্ষণের ঘোষণা নেই, তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে শিক্ষা ক্যাডারের পদ যাতে বিলুপ্ত না হয় তা বিবেচনায় রাখা হয়েছে।

প্রথম খসড়ায় বলা ছিল সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষা হবে ইন্টারডিসিপ্লিনারি (একাধিক শাখার মধ্যে সমন্বয়) ও হাইব্রিড (অনলাইন ও অফলাইন দুটি পদ্ধতিকে এক করে সমন্বয়) ধাঁচের, যেখানে ৪০ শতাংশ ক্লাস অনলাইন এবং বাকি ৬০ শতাংশ হবে অফলাইনে হবে। তবে সব পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে সশরীরে। শিক্ষার্থীরা প্রথম চার সেমিস্টারে নন-মেজর কোর্স এবং পরবর্তী চার সেমিস্টারে পড়বেন মেজর কোর্স। অনুমোদিত খসড়ায় সেই ধারাগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে।

গতকাল প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, নতুন অধ্যাদেশের মাধ্যমে সাত কলেজ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় হলেও কলেজগুলোর নিজস্ব পরিচয়, অবকাঠামো এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির ওপর তাদের অধিকার অক্ষুণ্ন থাকবে। অধ্যাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আচার্য, উপাচার্য, সিনেট, সিন্ডিকেট ও একাডেমিক কাউন্সিলসহ পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক কাঠামো রাখা হয়েছে। আচার্য হিসেবে রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালন করবেন এবং সিনেট মনোনীত প্যানেল থেকে উপাচার্য নিয়োগ দেবেন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) শিক্ষা, পরীক্ষা, গবেষণা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিদর্শন, মূল্যায়ন ও নির্দেশনার ক্ষমতা পাবে। কলা, বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা, আইন এবং চারুকলাসহ বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের পৃথক পৃথক স্কুল থাকবে নেতৃত্ব দেবেন একজন ‘হেড অব স্কুল’। সংযুক্ত কলেজগুলোয় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পাঠদান, পরীক্ষা ও মূল্যায়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিন্ন সময়সূচি ও মূল্যায়ন কাঠামো অনুযায়ী পরিচালিত হবে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল এবং কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষার ভিত্তিতে শিক্ষার্থীরা মূল ক্যাম্পাস বা সংযুক্ত কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাবে। কলেজগুলোয় কেন্দ্রীয়ভাবে এমফিল ও পিএইচডি প্রোগ্রাম পরিচালনার পাশাপাশি শিক্ষক উন্নয়ন ও উচ্চতর প্রশিক্ষণের সুযোগ থাকবে। কলেজগুলোয় আবাসিক হল সুবিধা, ছাত্র সংসদ নির্বাচন এবং শিক্ষার্থীদের জন্য সহপাঠ্যক্রমিক কার্যক্রম চালুর বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য স্বয়ংসম্পূর্ণ স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ক্যাম্পাস নির্মিত না হওয়া পর্যন্ত সাময়িকভাবে কার্যক্রম পরিচালনার কথা বলা হয়েছে।

সাত কলেজের সাবেক সমন্বয়ক ও ঢাকা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক আই কে সেলিম উল্লাহ খন্দকার কালবেলাকে বলেন, নতুন কাঠামোতে সবার দাবি ও মন রক্ষার একটি চেষ্টা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই এখানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছায়া রয়ে গেছে। ফলে ভবিষ্যতে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হলেও পুরোপুরি নতুনত্ব আনতে কিছুটা বাধা সৃষ্টি হয়েছে। এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও নতুন ব্যবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়টি ভবিষ্যতে ভালোভাবে চলবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ক্ষমতা নয়, দায়িত্ব চাই : ডা. ফজলুল হক

বঙ্গবন্ধু ল’ কলেজের নাম পরিবর্তন

কওমি মাদ্রাসা আমাদের হৃদয়, আমাদের কলিজা : জামায়াত আমির

কুমিল্লায় বিএনপির প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে সরে দাঁড়ালেন ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী

রোহিতের রেকর্ড ভেঙে স্টার্লিংয়ের ইতিহাস

শনিবার শুরু হচ্ছে চতুর্দশ যাকাত ফেয়ার / ‘বৈষম্যহীন, দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ বিনির্মাণে যাকাত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে’

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশকে আগামী সংসদের প্রথম অধিবেশনে পাশের আহ্বান

কারাবন্দি যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যু

ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ ঘিরে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা, কমান্ডো নামাচ্ছে শ্রীলঙ্কা

দেশ কোন দিকে পরিচালিত হবে এ নির্বাচন আমাদের দিকনিদের্শনা দেবে : তারেক রহমান

১০

নির্বাচনী প্রচারণায় সহিংসতা বন্ধ করতেই হবে

১১

চাকরিচ্যুত সেই মুয়াজ্জিনের পাশে তারেক রহমান

১২

আ.লীগ থাকলে জামায়াত থাকবে, জামায়াত থাকলে আ.লীগ থাকবে : মাহফুজ আলম

১৩

জনসভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি বিএনপি প্রার্থী

১৪

বগুড়ার জনসভা মঞ্চে তারেক রহমান

১৫

বিটিভিতে শুরু হচ্ছে বিনোদনমূলক ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান অভিনন্দন

১৬

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ / ‘শঙ্কিত’ সংখ্যালঘুরা ভোটদানে নিরুৎসাহিত হতে পারেন

১৭

প্যারাডাইস ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড হাউজিং লিমিটেডের আবাসন প্রকল্প ‘আশুলিয়া আরবান সিটি’র শুভ উদ্বোধন

১৮

সড়কে ঝরল বিএনপি নেতার প্রাণ

১৯

অতীত ভুলে শরীয়তপুরকে আধুনিক জেলা গড়ার অঙ্গীকার নুরুদ্দিন অপুর

২০
X