

চার বছরের এক শিশুকে অফিসকক্ষে আটকে শারীরিক নির্যাতনের ঘটনায় রাজধানীর শারমিন একাডেমির ব্যবস্থাপক পবিত্র কুমার বড়ুয়াকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শুক্রবার মিরপুর-৬ এলাকা থেকে পল্টন মডেল থানার পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাকে গ্রেপ্তার করে। এ মামলার অপর আসামি স্কুলটির প্রধান শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠাতা শারমিন জাহান এখনো পলাতক।
অভিভাবকদের অভিযোগ, প্রথমে স্কুল কর্তৃপক্ষ সিসিটিভি ফুটেজ দেখাতে অস্বীকৃতি জানায় এবং ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। পরে তারা স্থানীয়দের সহায়তায় সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেন। এতে ঘটনা প্রকাশ পায়। এরপর বৃহস্পতিবার শিশুটির মা পল্টন মডেল থানায় মামলা করেন। মামলা হয় শিশু আইনে, আসামি করা হয় শারমিন জাহান ও পবিত্র কুমার বড়ুয়াকে।
পুলিশ জানায়, নির্যাতনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর অভিযুক্তরা প্রাথমিকভাবে বিষয়টি অস্বীকার করে এবং তা গোপন রাখার চেষ্টা করে। তবে সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশের পর তারা ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করতে বাধ্য হয়।
ফুটেজে দেখা যায়, স্কুল ইউনিফর্ম পরা এক শিশুকে অফিসকক্ষে নিয়ে প্রথমে এক নারী চড় মারেন। এরপর সেখানে থাকা এক পুরুষ শিশুটির গলা ও মুখ চেপে ধরেন। তার হাতে ছিল স্ট্যাপলার। শিশুটি আতঙ্কে ছটফট করছিল ও কাঁদছিল। একপর্যায়ে শিশুটি নারীর শাড়িতে থুতু ফেললে সেই পুরুষ ব্যবস্থাপক শিশুটির মাথা জোরে সেখানে ঠুকিয়ে দেয়। পুরো সময় শিশুটির অসহায় কান্না ভিডিওতে স্পষ্টভাবে শোনা যায়। পুলিশ জানিয়েছে, ভিডিওতে দেখা নারীর নাম শারমিন জাহান এবং পুরুষটি তার স্বামী পবিত্র কুমার বড়ুয়া। ভুক্তভোগী শিশুটি প্লে শ্রেণিতে ভর্তির এক সপ্তাহের মাথায় নির্যাতনের শিকার হয়। শিশুটির মা জানান, ১৮ জানুয়ারি বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তিনি তাকে স্কুলে রেখে যান। দুপুরে এসে দেখেন, শিশুটিকে প্রিন্সিপালের অফিসে আটকে রাখা হয়েছে। বাসায় ফিরে শিশুটি জানায়, তাকে মারধর করা হয়েছে এবং বিষয়টি জানালে তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়েছে।
শিশুটির বাবা বলেন, ভিডিও দেখে তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। ছেলের মুখে শোনা গেছে, ‘আঙ্কেল বলেছে, বাসায় বললে গলায় পাড়া দেবে, মুখ সেলাই করে দেবে।’ নির্যাতনের ফলে শিশুটির মাথা, গলা ও কানে ব্যথা দেখা দিলে প্রথমে তাকে নয়াপল্টনের ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (মতিঝিল জোন) হুসাইন মুহাম্মদ ফারাবী বলেন, ‘গ্রেপ্তারের পরও পবিত্র কুমার বড়ুয়ার মধ্যে অনুতাপের লক্ষণ দেখা যায়নি। তারা দাবি করেছে, শিশুটি দুষ্টামি করছিল; কিন্তু কোনো পরিস্থিতিতেই এমন আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়। ঘটনার কারণ ও তা গোপন করার উদ্দেশ্য জানতে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’ তিনি জানান, পলাতক শারমিন জাহানকে ধরতে অভিযান অব্যাহত আছে।
শিশুটির মা জানান, শুরুতে নিরাপত্তার আশঙ্কায় মামলা করতে দ্বিধায় ছিলেন। পরে ন্যায়বিচারের আশায় অভিযোগ করেন। বর্তমানে শিশুটি চরম আতঙ্কে রয়েছে, বাবা-মায়ের সঙ্গেও থাকতে চাইছে না। ভয়ে এখন সে নানাবাড়িতে রয়েছে।
এদিকে, ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর থেকে শারমিন একাডেমির সব কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনায় থাকা কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। তাদের ফোন নম্বরগুলোও বন্ধ। ঘটনাস্থল পরিদর্শনে দেখা গেছে, নয়াপল্টনের ওই স্কুল প্রাঙ্গণ এখন ফাঁকা। অফিস সময়ে শিক্ষার্থী বা শিক্ষক কেউ সেখানে উপস্থিত হননি।
স্কুল ভবনের কেয়ারটেকার কামরুল হক বলেন, ‘বুধবার পর্যন্ত স্কুল খোলা ছিল। বৃহস্পতিবার থেকে কাউকে আসতে দেখা যায়নি।’ কেন হঠাৎ করে প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেননি তিনি।