

চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা আসছিল ‘ঢাকা মেইল’। আর চুয়াডাঙ্গা থেকে লক্ষ্মীপুরের পথে ছিল মামুন স্পেশাল পরিবহনের একটি বাস। কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে রেললাইন পার হওয়ার সময় সজোরে ট্রেনটি বাসে ধাক্কা দেয়। মূল দুর্ঘটনাস্থল থেকে মাইলখানেক দূরে গিয়ে ট্রেনটি থামে। এতে দুমড়েমুচড়ে যায় যাত্রীবাহী বাসটি। ততক্ষণে নিভে যায় তিন শিশুসহ ১২টি প্রাণ। ঈদের এ আনন্দযাত্রা পরিণত হয় এক ভয়াবহ মৃত্যুযাত্রায়।
গত শনিবার পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন রাত ২টা ৫৫ মিনিটে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পদুয়ার বাজার লেভেল ক্রসিং এলাকায় ঘটে মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনা। অভিযোগ রয়েছে, ঘটনার সময় গেটম্যান ছিলেন না এবং ক্রসিংয়ে গেট না ফেলার কারণে দুর্ঘটনায় এত প্রাণ ঝরেছে। ঘটনার পরপরই দায়িত্ব অবহেলার কারণে দুই গেটম্যান হেলাল উদ্দিন ও মেহেদী হাসানকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার প্রধান আসামি গেটম্যান হেলালকে মঙ্গলবার রাতে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব।
রেলের লেভেল ক্রয়িংয়ে এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনা নতুন নয়। ২০২৩ সালের ২৩ অক্টোবর কিশোরগঞ্জের ভৈরব রেলস্টেশনের আউটার পয়েন্টে ঢাকাগামী এগারসিন্দুর এক্সপ্রেসের সঙ্গে একটি মালবাহী ট্রেনের সংঘর্ষে ১৯ জনের মৃত্যু হয়। আহত হন অন্তত ৫০ জন। একই বছর ১৬ এপ্রিল কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে সোনার বাংলা এক্সপ্রেস পেছন থেকে পণ্যবাহী একটি ট্রেনকে ধাক্কায় আহত হন অন্তত ৫০ জন। যদিও এ দুর্ঘটনায় কারও মৃত্যু হয়নি। আগের বছর অর্থাৎ ২০২২ সালের ২৯ জুলাই চট্টগ্রামের মিরসরাই বড়তাকিয়া রেলস্টেশনের কাছে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী মহানগর প্রভাতী ট্রেন পর্যটকবাহী একটি মাইক্রোবাসকে ধাক্কা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই ১১ জন মারা যান। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও দুজনের মৃত্যু হয়। ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় মন্দবাগ স্টেশনে সংঘর্ষ হয় চট্টগ্রামগামী উদয়ন এক্সপ্রেস ও ঢাকাগামী তূর্ণা নিশিতার। এতে ১৬ যাত্রী প্রাণ হারান।
এসবই ছিল আলোচিত দুর্ঘটনা। গত বছর রেল মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, গত ১০ বছরে লেভেল ক্রসিংয়ে মারা গেছেন ২৬৩ জন। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাব মতে, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রেল দুর্ঘটনায় ১ হাজার ২৬৯ জনের প্রাণ গেছে। রেলওয়ে পুলিশের তথ্যমতে, গত ১০ বছরে রেল দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৯ হাজার ২৩৭ জন। কিন্তু দুর্ঘটনা কমাতে স্থায়ী কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, কোনো দুর্ঘটনা আলোচিত হলেই প্রাথমিকভাবে দায়সারা একটি তদন্ত কমিটি করা হয়। সেই কমিটি কী তদন্ত করে, ফল কী হয়, তদন্তের ভিত্তিতে কোন কোন পদক্ষেপ নেওয়ায় হয়—সেগুলো কিছুই বাস্তবে দৃশ্যমান হয় না। প্রথাগতভাবে শুরুতেই লেভেল ক্রয়িংয়ের দায়িত্বে থাকা গেটম্যানকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে তাকেই শাস্তি দেওয়া হয়। নিম্নপদের এসব কর্মীর দায় ছাড়া কখনো বড় পদের কোনো কর্মকর্তার দায় খুঁজে পায় না রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। তদন্ত-পরবর্তী উচ্চপদের কোনো কর্মকর্তা শাস্তি পেয়েছেন—এমন নজির নেই।
কুমিল্লার দুর্ঘটনায়ও এর ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে না। দুর্ঘটনার পরপর রেলওয়ে থেকে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই লেভেল ক্রসিংয়ে দায়িত্বে থাকা দুই গেটম্যানকে সঙ্গে সঙ্গে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। মামলা দিয়ে তাদের একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ঈদের রাতে কুমিল্লার দুর্ঘটনা নিয়ে রেলওয়ের ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কুমিলার বিভিন্ন পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কালবেলার কথা হয়েছে। তারা জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার আগে ঢাকা মেইল নামে ট্রেনটি ক্রসিংয়ে আসার খবরটি গেটম্যানের কাছে পৌঁছানো যায়নি। পূর্ববর্তী অর্থাৎ লালমাই স্টেশন থেকে ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার খবরটি জানাতে পদুয়ার বাজার গেটম্যানকে ফোন দেওয়া হয়। কিন্তু তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি। তবে ট্রেন আসার খবর তারা পেয়েছিলেন কি না, সেটি তদন্তে বেরিরে আসবে।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামছুল হক বলছেন, বর্তমান সরকারের সময় এটাই বড় রেল দুর্ঘটনা। এখন দেখার বিষয়, তদন্তে কোনো পরিবর্তন আসে কি না। শুধু নিম্নপদের কর্মীদের শাস্তি দিয়ে দুর্ঘটনা বন্ধ করা যাবে না। যারা কয়েক মাস বেতন পান না, শাস্তি তাদেরই পেতে হয়। বড় কর্মকর্তাদের যেন কোনো দায়ই থাকে না। পৃথিবীর উন্নত কোনো দেশে এমন দুর্ঘটনা হলে কয়েকজন দায়িত্বশীল বড় পদের কর্মকর্তা এতক্ষণে পদত্যাগ করতেন।
এদিকে ক্রসিং অনুযায়ী গেটম্যানের সংকট রয়েছে। আবার বৈধ গেটে বা যেগুলো রেলওয়ের নিজেদের স্থাপিত, শুধু সেগুলোতেই রেল থেকে গেটম্যান দেওয়া হয়। আর যেসব ক্রসিংয়ের জন্য রেলওয়ে অনুমতি দিয়েছে; কিন্তু নিজেরা প্রয়োজনে স্থাপন করেনি, সেগুলোর গেটম্যান দেওয়ার দায়িত্ব রেলওয়ে নেয় না। যেগুলো পুরোপুরি অবৈধ বা যেসব গেটের খোঁজ আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত নেই, সেসব ক্রসিংয়ে গেটম্যানের খোঁজ অজানা।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, সারা দেশে তিন হাজার কিলোমিটার রেলপথে নথিভুক্ত ক্রসিং আছে তিন হাজার ৩৯৮টি। এর মধ্যে এক হাজার ৩৬১টি ক্রসিংয়ের অবৈধ। বাকিগুলো বৈধ। তবে বৈধ-অবৈধ ক্রসিংয়ের মধ্যে অরক্ষিত দুই হাজার ৫৪টি। অবৈধ ক্রসিংয়ের বেশিরভাগেই স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ (এলজিইডি) ও ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) রাস্তা। আবার বৈধ গেটগুলোতে ছয় হাজার গেটম্যান প্রয়োজন, বর্তমানে আছে দেড় হাজারের মতো।
এক প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, তদন্ত চলছে এখনই কোনো মন্তব্য করা ঠিক হবে না। তবে কোনো দুর্ঘটনাই কাম্য নয়। দায় যারই থাকুক, অনেক মানুষের প্রাণ গেছে। এটা কষ্টের। আর অনুমতি ছাড়া কেউ যেন গেট তৈরি না করে, সেটা আমরা সবসময় বলে আসছি। যারা নিজ দায়িত্বে গেট তৈরির অনুমতি নিয়েছে, সেটা রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তার দায়িত্বও তাদের।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) তথ্য বলছে, দেশের মোট অবৈধ লেভেল ক্রসিংয়ের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ ও এলজিইডির রাস্তা রয়েছে ৪২৭টি, সড়ক ও জনপথ বিভাগের ২৪, পৌরসভার ১১০, সিটি করপোরেশনের ৩২, একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের রয়েছে ২৭, জেলা পরিষদের ১৩ ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তিনটি। এ ছাড়া ১২৭টি ক্রসিং কার আওতায় আছে, তা জানা যায়নি।
জানতে চাইলে এআরআইর সাবেক পরিচালক অধ্যাপক হাদিউজ্জামান বলেন, মূলত অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ের কারণেই রেলপথে দুর্ঘটনায় মৃত্যু বাড়ছে। দুর্ঘটনা কমাতে হলে রেল গেটগুলোকে বৈধ করতে হবে। সেখানে সবসময় গেটম্যান থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। শীতে ঘন কুয়াশায় দুর্ঘটনা বেশি হয়। শীতকালে ট্রেনের লোকোমোটিভে (ইঞ্জিনে) ছোট ছোট অনেক বাতি যুক্ত করতে হবে। সড়ক আর রেলপথ সমান পর্যায়ে থাকলে এতে রেললাইনে গাড়ি আটকে যাওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে, দুর্ঘটনা কম হবে। গেটগুলোতে প্রযুক্তি বাড়াতে হবে।